একটু পরেই চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন কৃপানাথ। ঘরের দরজার কাছে গিয়ে বৃষ্টির আওয়াজ ছাড়িয়ে শঙ্করকে ডেকে বললেন, শঙ্কর, পিছনের বাগানে এবার একটু জায়গা তৈরি কর। আর বড় বস্তাটা এ-ঘরে দিয়ে যা।
একটা চিনচিনে ব্যথা আমার ডান হাতে শুরু হয়েছিল। সেটা এতক্ষণে পৌঁছে গেছে আমার মাথার ভিতরে। ঝাঝালো মিষ্টি গন্ধটা এখন এত বেড়ে গেছে যে, আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। দুকানে ভোঁ-ভোঁ শব্দ। আর বুকের ভিতরে ঢিপঢিপ। আটাশ বছর আগে মারা যাওয়া সেই ডাক্তারবাবুর কথা মনে পড়ল আমার। কৃপানাথের সাজিয়ে দেওয়া কৌতূহল আর লোভের ফাঁদে পা দিয়ে এ কোন পিশাচের হাতে নিজেকে তুলে দিলাম। আমার চোখ ফেটে হু-হু করে জল বেরিয়ে এল। অনুরাধা-বুবু–টুটু, তোদের ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করছে। আর যে সময় নেই!
চেতনা হারানোর মুহূর্তে আমি ঘণ্টার শব্দ শুনতে পেলাম।
বিকল্পকবি সুবল বসু
সুবলকে খুব একটা কেউ চেনে না। আমার ছেলেবেলার বন্ধু। একসঙ্গে খেলাধুলো করতাম দেশবন্ধু পার্কে। তারপর স্কুল পেরিয়ে কলেজ, ইউনিভারসিটি–এবং সবশেষে চাকরি। সুবল
আমার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারেনি সবসময়। যেমন, কলেজে আমরা একইসঙ্গে ফিজিক্স অনার্স নিয়ে পড়েছি। তারপর, নম্বর যথেষ্ট ভালো থাকা সত্ত্বেও, ও হঠাত্ একদিন জানাল, আর পড়ব না।
আমি অবাক হয়ে প্রশ্ন করেছিলাম, কেন? পড়বি না কেন?
মাথার কোঁকড়া চুলের গোছায় টান মেরে সুবল বলেছে, নাঃ, পড়াশোনার মধ্যে কোনও সিমেট্রি নেই–
আমি ঘাবড়ে গেলাম। সিমেট্রি? প্রতিসাম্য? পড়াশোনার মধ্যে আবার সিমেট্রির খোঁজ পড়ল কেন?
ওকে অনেক করে বোঝালাম। ফিজিক্সে আমার চেয়ে ওর নম্বর বেশি ছিল। সুতরাং বারবার করে বললাম, এরকম ভুল করিস না। মাসিমা মেসোমশাই কষ্ট পাবে।
সুবল কোনও কথায় কান দিল না। পশ্চিমের আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। তখন পার্কের সীমানায় ইউক্যালিপটাস গাছের মাথায় লাল সূর্য হেলে পড়েছে। পার্কের বড় মাঠে বল খেলছে। সবাই। ধুলো উড়ছে।
সুবল বলল, অতীন, একটা ব্যাপার খেয়াল করেছিস?
আমি ওর মুখের দিকে তাকালাম। শ্যামলা রং। চোখ উজ্জ্বল। সেখানে লালচে ছায়া পড়েছে। জিগ্যেস করলাম, কী?
এই রোজ সূর্য ওঠা আর অস্ত যাওয়ার মধ্যে কেমন একটা সিমেট্রি–।
সত্যিই তো, আগে তেমন করে ভাবিনি। ভোরের সূর্যও লাল, শেষবেলার সূর্যও লাল। আর দুপুরের সূর্য সবচেয়ে প্রখর। জ্বলন্ত এক হলদে চোখ।
সুবল আবার বলল, ঠিক একইরকম ব্যাপার চাঁদের মধ্যেও রয়েছে। আস্তে-আস্তে বাড়ে, আবার আস্তে-আস্তে কমে। অমাবস্যা-পূর্ণিমার সিমেট্রি–।
আমার ভারী অদ্ভুত লাগল। সূর্য বা চাঁদের আচরণে প্রতিসাম্য আছে বলেই পড়াশোনার মধ্যেও সিমেট্রি থাকতে হবে! এ কী অদ্ভুত দাবি!
সুবল বলল, অতীন, গত কয়েকমাস ধরে সিমেট্রি খোঁজাটা আমার একটা অসুখের মতো হয়ে গেছে। বিশ্বাস কর, আমি আর পারছি না।
ওর কথার মধ্যে কোথায় যেন একটা অসহ্য যন্ত্রণা লুকিয়ে ছিল। আর সেই সময়ে ওর মুখে কেমন এক অসহায় ছেলেমানুষের ভাব ফুটে উঠেছিল। আমার খুব কষ্ট হল। ছেলেটা পাগল হয়ে যাবে না তো?
সন্ধের ছায়া গাঢ় হচ্ছিল ক্রমশ। ছেলের দল খেলা শেষ করে ফিরে যাচ্ছে। পাখিরা বড় বড় কঁকড়া গাছের আস্তানায় ফিরে এসে রোজকার ঝগড়াঝাটি শুরু করে দিয়েছে। সুবলকে বললাম, ওসব আজেবাজে চিন্তা ছাড় তো। চল, ওঠ–।
পাড়ার দিকে ফিরতে ফিরতে আমি জিগ্যেস করলাম, তোর হঠাৎ করে এসব সিমেট্রির কথা মনে হল কেন?
ও একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, অতীন, তুই কখনও আমার পুরো নামটা খেয়াল করেছিস?
কেন করব না? সুবল বসু।
ও গাঢ় গলায় বলল, নামটা উলটো করে পড়লে কী হয় বল তো!
আমি বিড়বিড় করে ওর নামটা আওড়ালাম। সুবল বসু…সুবল বসু…আরে! এ যে দেখছি একই নাম ফিরে পাচ্ছি!
ওকে কথাটা বলামাত্রই ও বিষণ্ণ হাসল। বলল, আমিও প্রথমটা অবাক হয়েছিলাম। এ ধরনের শব্দ কিংবা সেনটেন্সকে ইংরেজিতে প্যালিনড্রোম বলে। গ্রিক প্যালিড্রোমাস শব্দ থেকে এসেছে। এর মানে হল, এমন কোনও শব্দ, বাক্য বা সংখ্যা যা সোজা কিংবা উলটো করে পড়লেও পালটায় না। দ্বিমুখী অবিকল
আমি একটু অবাক হয়েই ওর কথা শুনছিলাম। এতসব অ-পদার্থবিদ্যার জিনিস ও পড়ল কখন?
জিগ্যেস করতেই সুবল বলল, সাধ করে কি আর পড়েছি! এ-লাইব্রেরি সে-লাইব্রেরি ঘেঁটে সামান্য কয়েকটা লেখাপত্তর পড়তে পেরেছি। তাতেই আমার স্পষ্ট মনে হয়েছে, আমাদের বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে কোথায় যেন একটা প্যালিড্রোমের মতো সিমেট্রি রয়েছে। যেমন তোকে বললাম চঁদ আর সূর্যের কথা–
আমি কী বলব ভেবে পেলাম না।
সুবল শব্দ করে হাসল। সামনে থেকে একটা গাড়ি হেডলাইট জ্বেলে ছুটে আসছিল। ওর মুখে জোরালো আলো পড়ল। সেখানে কয়েকটা চিন্তার ভাঁজ দেখতে পেলাম।
সুবল বলল, শুধু নাম নয়। নামের ব্যাপারটা টের পাওয়ার পরও আমি এ নিয়ে এতটা ভাবিনি। কিন্তু নামের সঙ্গে জন্মতারিখটা মেলাতেই কেমন যেন হয়ে গেলাম।
কত তোর জন্ম তারিখ?
১৯ জানুয়ারি ১৯৯১–।
তাতে কী হল?
কাছাকাছি একটা পানের দোকানে আমাকে টেনে নিয়ে গেল ও। একচিলতে কাগজ আর ডট পেন চেয়ে নিয়ে লিখল : ১৯-১-৯১। তারপর বলল, শুধু জন্মসালটা যে প্যালিনড্রোমিক সংখ্যা তা নয়, ১৯১৯১ সংখ্যাটাও একটা দ্বিমুখী অবিকল।
