আসুন, ওটাকে দেখবেন আসুন। কৃপানাথ আমাকে বাক্সের কাছে ডাকলেন, ওই ফুটোগুলোয় চোখ রাখুন, আমি ভিতরের একটা আলো জ্বেলে দিচ্ছি।
আমি চোখ রাখলাম।
প্রথম কয়েকটা মুহূর্ত অন্ধকার। তবে তারই মধ্যে ছিটকে বেরোল কয়েকটা রঙিন আলোর ফুলকি। আর পরক্ষণেই জোরালো আলোর ভেসে গেল বাক্সের ভিতরটা। এবং অদ্ভুত প্রাণীটাকে আমি দেখতে পেলাম।
কৃপানাথ মজুমদার মিথ্যে বলেননি। এরকম বিচিত্র গা শিরশির করা প্রাণীর নাম পৃথিবীর প্রাণিজগতের তালিকায় যে নেই, একথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়।
বুলডগের মতো থ্যাবড়া মুখ। চ্যাপটা মাথার ওপরদিকে দুটো টকটকে লাল চোখ। মুখের সামনের দিকে কয়েকটা ছুঁচোলো দাঁত বিশ্রীভাবে বেরিয়ে আছে। উজ্জ্বল গোলাপি রঙের পুরু ঠোঁট। ঠোঁট আর দাঁতের ফাঁক দিয়ে মোটা পাইপের মতো একটা কালো জিভ বারবার বেরিয়ে আসছে বাইরে। লম্বায় জিভটা প্রায় হাত দুয়েক হবে। জিভটা সাপের মতো এপাশ-ওপাশ নড়ছে–যেন কিছু খুঁজে বেড়াচ্ছে।
প্রাণীটার সারা শরীর যেন এবড়োখেবড়োভাবে সিমেন্ট জমিয়ে তৈরি। কোথাও উঁচু, কোথাও নীচু। রং ধূসর, তার মাঝে কালো ছোপ-ছোপ। এ ছাড়া আঁশের মতো চাকা-চাকা কোনও জিনিস দিয়ে সারা শরীরটা ঢাকা।
কৃপানাথ ঠিকই বলেছিলেন, প্রাণীটার চারটে পা, আর একটা লেজ আছে।
তবে ঠিক বলতে শুধু ওইটুকুই। কারণ চারটে পা চার রকম মাপের এবং শরীরের বেখাপ্পা চারটে জায়গা থেকে বেরিয়ে আছে সাধারণ প্রাণীর মতো কোনও সামঞ্জস্য সেখানে নেই। তবে প্রত্যেকটা পায়েই দশ-বারোটা করে আঙুল, আর আঙুলের ডগা থেকে ছুঁচের মতো সরু-সরু নখ বেরিয়ে রয়েছে।
প্রাণীটার লেজটাও ভারি অদ্ভুত। আঁশ দিয়ে ঢাকা একটা মাংসপিণ্ড ওটার শরীরের পেছনদিকে ঝুলছে। পিটার চেহারা অনেকটা পানের মতো। আর তার রং লাল-সবুজ ডোরাকাটা।
সব মিলিয়ে প্রাণীটার দৈর্ঘ্য তিন-সাড়ে তিন ফুট হবে। অদ্ভুত ক্ষিপ্রতার সঙ্গে ওটা চলে বেড়াচ্ছে বাক্সের ভিতরে–মেঝে, দেওয়াল, সিলিং–সব জায়গায়। ক্ষিপ্রভাবে এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় চলে যাচ্ছে বুলেটের গতিতে। তারপর থামছে। ওটার চোখ নড়ছে, জিভ নড়ছে। আর সারা শরীরে লেগে রয়েছে হলদেটে সবুজ শ্যাওলার মতন লালা। ওটার মুখ থেকেই ওই আঠালো তরল বেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে বাক্সের নানা জায়গায়।
হঠাৎই ঝাঁঝালো মিষ্টি গন্ধটা পেলাম। তবে সেটা লালার গন্ধ, না ওটার শরীরের গন্ধ, তা বুঝতে পারলাম না।
আমার মুখ থেকে অস্ফুট একটা শব্দ বেরিয়ে এল। সঙ্গে-সঙ্গে ভিতরের বাতিটা অফ করে দিয়ে কৃপানাথ আমাকে জিগ্যেস করলেন, ভয় পেলেন, অচিনবাবু?
আমার মাথা ঝিমঝিম করছিল, বমি পাচ্ছিল। তবু তারই মধ্যে লক্ষ করলাম, অন্ধকার বাক্সের ভিতরে কয়েকটা রঙিন আলোর ফুলকি ঠিকরে বেরোচ্ছে। কৃপানাথের সঙ্গে এ-ঘরে ঢোকার সময় অন্ধকারে এই রঙিন আলোর ঝিলিকই আমি দেখতে পেয়েছিলাম। প্রাণীটার দেখছি গুণের শেষ নেই!
আমার কাছ থেকে কোনও উত্তর না পেয়ে কৃপানাথ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, বললেন, ওকে দেখে সবাই ভয় পায়। অথচ ও যে কী ভালো আপনাকে কী বলব! সেই জন্ম থেকেই তো ওকে দেখছি। আমিই ওর মা, আমিই ওর বাপ। আসুন, আপনাকে একটা মজার জিনিস দেখাই। বাক্সের ফুটো দিয়ে আবার দেখুন।
আমি বোধহয় সম্মোহিত হয়ে পড়েছিলাম। নইলে কৃপানাথের সব কথা সুবোধ ছাত্রের মতো শুনবই বা কেন!
ওঁর কথায় বাক্সের গর্তে আবার চোখ রাখলাম।
কৃপানাথ টিউব লাইটের মতো একটা আলো জ্বেলে দিলেন। সঙ্গে-সঙ্গে একটা বিচিত্র ব্যাপার আমার চোখে পড়ল।
প্রাণীটার সারা শরীর নানান রঙে রঙিন হয়ে গেছে। জিভটা নীলচে বেগুনি, আর মাথা বুক সব গনগনে লাল–তার মধ্যে হলদে রঙের ছিটে। ওর শ্যাওলার মতো হলদেটে সবুজ লালার রং এখন উজ্জ্বল নীল।
কৃপানাথ বাক্সের অন্য দেওয়ালের গর্ত দিয়ে প্রাণীটাকে দেখছিলেন। আমাকে উদ্দেশ করে বললেন, যে-আলোটা জ্বেলেছি সেটা আলট্রাভায়োলেট আলো। দেখেছেন, ওর গায়ের রং কেমন পালটে গেছে! খিদেয় পাগল হয়ে গেলে এই আলোর ওর চেহারাটা এরকম গনগনে লাল দেখায়।
বাক্সের ফুটো থেকে চোখ সরিয়ে কৃপানাথ মজুমদার আলো নিভিয়ে আমার কাছে এলেন। নীচু গলায় বললেন, অচিনবাবু, আপনাকে আমার বউয়ের কথা বলেছিলাম–বিয়ের দু-বছর পর মারা গেছে। ওর ছবি দেখবেন?
আমি ফ্যালফ্যাল করে কৃপানাথের দিকে তাকালাম। শেষ বাজিটায় হেরে গিয়ে আমি বোধহয় একটা মানসিক ধাক্কা খেয়েছি। অনুরাধা-বাবু-টুটু এখন যেন কত দূরের মানুষ। শুধু এই ঘোরতর বৃষ্টি, বাজ পড়ার শব্দ, সাবেক আমলের বাড়ি, কৃপানাথ মজুমদার, এই রহস্যময় বাক্স এবং তার বাসিন্দা ওই ভয়ংকর প্রাণী–শুধু এইসবই সত্যি।
কোথায় আপনার স্ত্রী-র ছবি, দেখি?
কৃপনাথ সতেজ পায়ে বাক্সের পেছনদিকের দেওয়ালের কাছে চলে গেলেন। দেওয়ালটার খানিকটা জুড়ে যে-কালো পরদা ছিল সেটা টেনে সরাতেই ধুলো উড়ল, মাকড়সার জাল-ঝুল-কালি চোখে পড়ল। আরও চোখে পড়ল মলিন দেওয়ালে টাঙানো একটা ছবি। এক মহিলার ছবি। সম্ভবত তেলরঙে আঁকা।
কিন্তু এ কেমনধারা ছবি!
লাল টকটকে বেনারসি কাপড়ে মহিলার কপাল আর চোখের বেশ খানিকটা ঢাকা। থ্যাবড়া মুখ। লালচে চোখের তারা। পুরু গোলাপি ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে কয়েকটা ছুঁচোলো দাঁত বেরিয়ে রয়েছে।
