আমার দ্বিধাগ্রস্ত মুখ দেখে কৃপানাথ হাত উলটে জানতে চাইলেন, কী ব্যাপার? কী ভাবছেন?
একটু দোনামনা করে আমি বলেই ফেললাম, যদি বাকি নশো নব্বইবারও আমার ভুল হয়, তা হলে কী হবে?
কৃপানাথ কিছুক্ষণ ঠোঁট টিপে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর এক পা এগিয়ে এলেন আমার কাছে। বাতিটা পেছনদিকে থাকায় ওঁর মুখটা অন্ধকার দেখাল। থেমে থেমে তিনি বললেন, ভয় নেই, এক লাখ টাকা চাইব না। তবে খুব সাধারণ একটা জিনিস চাইব। খুব সাধারণ–একেবারে মামুলি।
কী সাধারণ জিনিস? যদি সেটা না থাকে আমার কাছে!
আমি একটু হোঁচট খেয়ে বললাম, না, মানে…যদি সেটা আমি দিতে না পারি…।
কৃপানাথ হাসলেন। বললেন, পারবেন না মানে! একেবারে মামুলি জিনিস..আপনার সঙ্গেই আছে..।
আমার সঙ্গেই আছে! সঙ্গের জিনিস বলতে তো জামা-প্যান্ট, চশমা, কিছু খুচরো টাকা পয়সা, কৃপানাথের দেওয়া দুটো একশো টাকার নোট, একটা ছোট ডায়েরি, রুমাল, আর অফিসের আলমারির চাবি। এর মধ্যে কোন জিনিসটা কৃপানাথ মজুমদারের দরকার?
কড়কড় শব্দে বাজ পড়ল। ঝোড়ো বাতাসে বৃষ্টির ছাট তীব্র হয়ে উঠল। বাক্সের ভিতরের নাম-না-জানা প্রাণীটা আচমকা দাপাদাপি শুরু করে দিল।
কৃপানাথ চোখ থেকে চশমা খুলে নিয়ে জামার খুঁট দিয়ে কাচ মুছলেন। তারপর সেটা আবার যত্ন করে নাকের ওপরে বসিয়ে আমার খুব কাছে এসে দাঁড়ালেন। ঝাঁঝালো মিষ্টি গন্ধটা আবার হালকাভাবে ভেসে আসতে লাগল বাক্সের দিক থেকে।
কৃপানাথ বললেন, অচিনবাবু, আপনাকে প্রাণীটা সম্পর্কে কয়েকটা হিন্টস দিতে পারি– তবে নাম বলতে পারব না। আপনি আপনার খুশি মতো প্রশ্ন করতে পারেন, আমি যদূর সম্ভব উত্তর দেব।
আমি বাক্সটাকে একবার দেখলাম, তারপর বাক্সের মালিককে, আর সবার শেষে তাকালাম খোলা ক্যাবিনেটের দিকে। টাকার আকর্ষণী ক্ষমতা চুম্বকের চেয়েও বেশি। হাতে এখনও নশো নব্বইবার চান্স রয়েছে। নিশ্চয়ই তার মধ্যে পেরে যাব।
সুতরাং কিছু হিন্টস চেয়েই দেখা যাক।
প্রাণীটা কি স্থলচর?
আমি অন্তত সেরকমই জানি। কৃপানাথ মজুমদার হেঁয়ালিভরা সুরে উত্তর দিলেন।
ওটার কটা পা?
আমার হিসেবমতো চারটে।
লেজ আছে?
একটু সময় নিয়ে তারপরঃ আছে।
কটা চোখ?
বোধহয় দুটো।
নিজের পোষা প্রাণী নিয়ে কৃপানাথ কি আমার সঙ্গে মজা করছেন? আমি একটু রুক্ষভাবেই জিগ্যেস করলাম, বোধহয় দুটো মানে?
কৃপানাথ হেসে আমার কাঁধে হাত রাখলেন। বললেন, রেগে যাচ্ছেন কেন, ভাই। এই ধরুন মাছির চোখ। এমনিতে দেখলে মনে হয় দুটো, অথচ আসলে অনেক–মানে পুঞ্জাক্ষি আর কি! এই প্রাণীটারও হয়তো সেরকম হতে পারে। আমি ঠিক জানি না।
সবকিছু কেমন যেন জট পাকিয়ে যেতে লাগল। চারটে পা, একটা লেজ, স্থলচর প্রাণী– অথচ পুঞ্জাক্ষি? আমি স্বপ্ন দেখছি না তো!
কৃপানাথ এবার ছোট ছোট পা ফেলে চেয়ারে গিয়ে বসলেন। শান্ত চোখে আমাকে দেখতে লাগলেন।
আমি জিগ্যেস করলাম, টিকটিকি?
কৃপানাথ বললেন, না।
গোসাপ?
না। কোমোডো দ্বীপের ড্রাগন? আর্মাডিলো?
উঁহু।
আমি একের পর এক প্রাণীর নাম বলে যেতে লাগলাম। আর কৃপানাথ শান্ত ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে প্রত্যেকবারই জানিয়ে দিতে লাগলেন, হয়নি। একইসঙ্গে তিনি প্যাডের কাগজে পেন দিয়ে লিখে হিসেব রাখছিলেন। আমার শিশুপালের কথা মনে পড়ছিল। এক হাজার এক কখন শেষ হবে?
ক্রমেই আমার ধৈর্য কমছিল, আর কৌতূহল বাড়ছিল। আমি একের পর এক প্রাণীর নাম বলতে-বলতে কান্ত হয়ে পড়লাম। অবাক হয়ে শুনলাম, আমি বাঘ, সিংহ, গণ্ডার, হাতি, উট, জিরাফ, এমনকী জেব্রার নামও বাদ দিলাম না। তারপর একসময় সাপ, ব্যাঙ, কচ্ছপের নামও বলেছি, কিন্তু যথারীতি ঠিক হয়নি। ক্লান্ত হয়ে ভুল করে তিমি আর হাঙরের নামও উচ্চারণ করে ফেলেছি। মরিয়া হয়ে ড্রাগন আর খোকা ডাইনোসরের কথাও বলেছি। তখন কৃপানাথ হেসে বললেন, আপনার মাথা আর কাজ করছে না, অচিনবাবু। একটু ভেবেচিন্তে বলুন। এখনও আপনার সাতশো বত্রিশটা চান্স রয়েছে।
এখনও সাতশো বত্রিশ!
আমার মুখে ফেনা কাটছিল। জিভে টক স্বাদ। জানলা খোলা থাকা সত্ত্বেও কেমন দম বন্ধ হয়ে আসছিল। একসময় আর না পেরে বলে উঠলাম, আমি আর পারছি না, কৃপানাথবাবু। আর কোনও প্রাণীর নাম ভাবতে পারছি না।
কৃপানাথ প্যাড-পেন একপাশে সরিয়ে রেখে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। আপনমনেই বিড়বিড় করে বললেন, আড়াইশো নাম হতে না হতেই সব হাঁফিয়ে পড়ে। একজন মাত্র সাড়ে চারশোর মতো নাম পর্যন্ত বলতে পেরেছিল।
কৃপানাথ আমার কাছে এগিয়ে এলেন। বললেন, তা হলে এই খেলাটায় আপনি হেরে গেলেন, অচিনবাবু?
আমি ক্লান্তভাবে মাথা নাড়লাম ও নাঃ, পারলাম না। এক লাখ টাকা আমার আর জেতা হল না।
কৃপানাথ স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। ওঁর চোখেমুখে উল্লাস এখন আর লুকোনো নেই। বললেন, আপনি এবার প্রাণীটাকে দেখতে পারেন। তা হলেই বুঝতে পারবেন, কেন ওটার নাম আপনি বলতে পারেননি–কোনওদিনও পারতেন না। আসলে আমিও ওটার নাম জানি না। কী নামে ডাকি বলুন তো ওকে! কিম্ভুত?
আমি কোনও জবাব দিলাম না। আমার কেমন ভয়-ভয় করছিল। মনে হচ্ছিল, আজ বিকেলে এই অদ্ভুত মানুষটির সঙ্গে আমার দেখা না হলেই ভালো হত। বিনা পরিশ্রমে পাওয়া দুশো টাকার তৃপ্তি কখন যেন উবে গেছে মন থেকে। ঘড়িতে প্রায় নটা বাজে। অথচ তখনও বাইরের কালো আকাশে শুধু বিপর্যয়ের ছবি।
