ঘরটার চেহারা বা চরিত্র কৃপানাথের ঘরের মতোই শুধু মাপে একটু ছোট। আর ঘরের বাঁ-দিকের দেওয়ালের খানিকটা অংশ কালো পরদা দিয়ে ঢাকা।
ঘরের জানলা মাত্র একটি। কৃপানাথ জানলার রঙিন শার্সির পাল্লা খুলে দিলেন। তারপর জানলার পাল্লাও খুলে দিলেন। বর্ষা ঘরের ভিতর ঢুকে পড়ল। সেই সঙ্গে ঠান্ডা বাতাস।
ঘরের যে জিনিসটা প্রথমেই চোখ টানে সেটা একটা প্রকাণ্ড বাক্স। বাক্সটার মাপ অন্তত ছফুট বাই ছফুট বাই আট ফুট। অ্যালুমিনিয়াম অথবা স্টেইনলেস স্টিল, ওই জাতীয় কিছু দিয়ে তৈরি। বাবের আলো পড়ে বেশ চকচক করছে। লক্ষ করলাম, বাক্সের গায়ে তিন-চার জায়গায় বেশ কয়েকটা করে ফুটো রয়েছে।
অদ্ভুত বাক্সটা আমাকে বেশ অবাক করল।
বাক্স ছাড়া ঘরের মধ্যে রয়েছে একটা টেবিল, দুটো চেয়ার আর একটা শৌখিন ক্যাবিনেট। টেবিলে কয়েকটা লেখার প্যাড আর ডট পেন রয়েছে।
কৃপানাথ একটা চেয়ারের দিকে ইশারা করে আমাকে বসতে বললেন। তারপর ক্যাবিনেটের কাছে গিয়ে চাবি ঘুরিয়ে তার পাল্লা খুলে ফেললেন।
তখনই আমার চোখে পড়ল থরে থরে সাজানো নোটের বান্ডিল।
আন্দাজেই বুঝতে পারলাম, এক লক্ষ নয়, তার অন্তত চার-পাঁচ গুণ টাকা রয়েছে ক্যাবিনেটে।
কৃপানাথ শব্দ করে দু-হাতে তালি দিয়ে হাত ঝাড়লেন। তারপর আমার মুখোমুখি চেয়ারে বসে মুচকি হেসে বললেন, অচিনবাবু, এইবারে শুরু হোক মজার খেলা। বলুন দেখি, ওই বাক্সের ভিতরে কী আছে?
প্রশ্নটা করে কৃপানাথ মজুমদার আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। প্রত্যাশায় দু-চোখ জুলজুল করছে। ময়লা হয়ে যাওয়া বাবের আলো তেরছাভাবে পড়েছে ওঁর মুখে। তোবড়ানো গাল আর চামড়ার ভঁজে ছায়া পড়ে অদ্ভুত দেখাচ্ছে।
বাইরে ঝমঝম বৃষ্টি। বাজ পড়ছে। মেঘ ডাকছে। তবু তারই ফাঁকে বাক্সের ভিতর থেকে ভেসে আসা একটা খচড়-খচড় শব্দ কানে এল।
কৃপানাথ আবার একই প্রশ্ন করলেন। তারপর বললেন, যদি ঠিক ঠিক বলতে পারেন তা হলে ওই ক্যাবিনেট থেকে ক্যাশ এক লাখ টাকা আপনাকে দিয়ে দেব।
আর যদি না পারি? মিথ্যে বলব না, আমার কেমন যেন ভয় ভয় করছিল। কী আছে ওই বাক্সের ভিতরে? কী রহস্য লুকিয়ে আছে রঙিন আলোর ফুলকি আর ঝাঝালো মিষ্টি গন্ধের পেছনে?
কৃপানাথ আবার হাসলেন। দূরে কোথাও বাজ পড়ার শব্দ হল। বৃষ্টির একটানা ঝমঝম আর আলাদা করে কানে আসছে না।
একবারে ঠিক-ঠিক বলতে হবে তা তো বলিনি! কৃপানাথ বাক্সটার দিকে শান্ত উদাস চোখে তাকিয়ে বললেন, একবার না পারলে আবার চেষ্টা করবেন। তাতেও না পারলে আবার।
মনে একটু ভরসা পেলাম। যাক, তা হলে অনেকবার সুযোগ পাওয়া যাবে। কিন্তু ঠিক কবার? সেকথাই জিগ্যেস করলাম কৃপানাথকে।
তিনি হেসে বললেন, আপনিই বলুন, কতবার চান্স দেব আপনাকে।
বুকের ভিতরে কেমন গুড়গুড় শব্দ হল। কবার সুযোগ চাইব? একশো, দুশো, তিনশো, না কি পাঁচশো?
এক হাজার এক বার। সংখ্যাটা আচমকাই মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল আমার। আর তখনই বাক্সটার ভিতর থেকে ঝটাপটির শব্দ পেলাম।
কৃপানাথ চট করে উঠে চলে গেলেন বাক্সের কাছে। বাক্সের গায়ে পরম মমতায় হাত বোলাতে বোলাতে চুকচুক শব্দ করলেন মুখ দিয়ে, তারপর আলতো করে শিস দিয়ে এক অদ্ভুত সুর ছড়িয়ে দিলেন বাতাসে।
বাক্সের ভিতরে সব শান্ত হয়ে গেল।
আমার দিকে তাকিয়ে কৃপানাথ মলিন হেসে বললেন, দেরি হচ্ছে তো, তাই বড় অধীর হয়ে উঠেছে। একটু থেমে আবার বললেন, আপনার কথাই সই। এক হাজার এক বার চান্স দেব আপনাকে। তার মধ্যে নিশ্চয়ই পেরে যাবেন। নিন, শুরু করুন।
আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে বাক্সটার কাছে এগিয়ে গেলাম।
লক্ষ করলাম, বাক্সটার একদিকে একটা ছোট্ট চৌখুপি জানলা রয়েছে। তবে জানলাটার পাল্লা ছোট্ট হাঁসকল দিয়ে আটকানো।
এটুকু বুঝতে অসুবিধে হল না, বাক্সের ভিতরে কোনও প্রাণী রয়েছে। কৃপানাথের পোষা প্রাণী।
আমি বাক্সের গায়ের ফুটোগুলোয় চোখ রাখলাম। কিন্তু ভিতরে জমাট অন্ধকারে ঠিকমতো কিছু ঠাহর করতে পারলাম না।
তখন ঝুঁকে পড়ে বাক্সের ঠান্ডা ধাতব দেওয়ালে কান পেতে মনোযোগ দিয়ে শব্দ শোনার চেষ্টা করলাম। একটা খড়খড় শব্দ, আর তার সঙ্গে জোরে-জোরে নিশ্বাস ফেলার ফেস-ফোঁস শব্দ–আর কিছু শোনা গেল না।
আমি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বললাম, শজারু?
কৃপানাথ হেসে মাথা নাড়লেন। বললেন, হল না। তারপর টেবিলের কাছে এগিয়ে গেলেন। ডট পেন তুলে নিয়ে একটা প্যাডের পাতায় খসখস করে কী লিখলেন। বললেন, আপনি কতবার চেষ্টা করলেন প্যাডের পাতায় তার হিসেব রাখছি। নিন, বলুন, আর হাজারটা চান্স রয়েছে। আপনার–।
ইঁদুর?
নাঃ, হল না। প্যাডের ওপরে পেন সক্রিয় হল আবার।
কুকুর? বেড়াল?
না
খরগোশ? বেজি?
হল না। কৃপানাথ শান্তভাবে আমার অনুমান খারিজ করে দিলেন।
শুয়োর? হায়না? না কি নেকড়ে?
উঁহু, কোনওটাই না।
বানর? হনুমান?
উঁহু–আর নশো নব্বইটা চান্স আছে আপনার। কৃপানাথ ঠান্ডা গলায় বললেন। খোলা জানলা দিয়ে বৃষ্টির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর বাক্সের একটা ফুটোর কাছে মুখ এনে সুর করে শিস দিলেন। বাক্সের ভিতর থেকে যা সামান্য কিছু অস্থির শব্দ আসছিল সব পলকে শান্ত হয়ে গেল।
আর নশো নব্বইটা চান্স বাকি! টাকার বান্ডিলগুলোর দিকে চোখ গেল আমার। আবার কান পাতলাম বাক্সের গায়ে। কোন হতচ্ছাড়া প্রাণী লুকিয়ে আছে এই বাক্সের ভিতরে? এর মধ্যেই এগারোবার আমার ভুল হয়েছে। যদি বাকি নশো নব্বইবারও ভুল হয়? তা হলে কী হবে! কৃপানাথ আমার এই প্রশ্নের উত্তর দেননি। না কি এবারও সেই আগের তিনবারের মতো একমুখো বাজি?
