দোতলার একটা সাবেকি ঘরে আমাকে বসালেন কৃপানাথ। বললেন, আগে একটু চা-টা খেয়ে নিন, তারপর খেলা-টেলা হবেখন।
ঘরটা একইসঙ্গে বসবার ঘর এবং শোওয়ার ঘর। মেঝেতে যথারীতি মার্বেল পাথর। দক্ষিণের দেওয়ালে খড়খড়ি দেওয়া বিশাল দুটো জানলা। জানলার সামনে রঙিন কাচের শার্সির ভাজ করা পাল্লা সামান্য খোলা রয়েছে। খাটটাকে খাট না বলে পালঙ্ক বললেই মানায় বেশি। বোঝা যায়, কৃপানাথ এই ঘরেই বাস করেন।
ঘরটা সাজানো-গোছানো শৌখিন। তবে আলোর ব্যবস্থা পুরোনো ধাঁচের। অলিন্দ, সিঁড়ি, বারান্দা, ঘর–সব জায়গাতেই সাধারণ বৈদ্যুতিক বা, টিউব লাইটের কোনও ব্যাপার নেই।
তা হোক। এক লক্ষ টাকা সব সময়েই এক লক্ষ টাকা–তা সে যে আলোতেই গুনি না কেন!
কৃপানাথ একটা তোয়ালে নিয়ে এসে আমার হাতে দিলেন। বললেন, গা-হাত-পা-মাথা সব মুছে নিন। যা ভেজান ভিজেছেন!
আমি বৃষ্টির শব্দ শুনতে-শুনতে তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছলাম। তারপর গা-হাত-পা যতটা সম্ভব মুছে নিলাম। নাকটা সুড়সুড় করে তিনবার হাঁচি হল। কৃপানাথ তোয়ালে ফেরত নিতে নিতে বললেন, এক কাপ গরম চা খেলেই সব সেরে যাবে। আপনি একটু বসুন, আমি ভিজে জামাকাপড়গুলো ছেড়ে আসছি।
কৃপানাথ চলে যাওয়ার পর আমি একটা সিগারেট ধরালাম। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শঙ্কর ঘরে ঢুকল। হাতের ট্রে থেকে কাপ-প্লেটগুলো নামিয়ে দিল টেবিলে। কাপে সুন্দর রঙের ধোঁয়া-ওঠা চা। আর প্লেটে ডিমের বড়া, সঙ্গে টোম্যাটো সস।
আমি আর দেরি করতে পারলাম না। শীত শীত ভাবটাপ কাটাতে সিগারেটে টানের সঙ্গে-সঙ্গে চা খেতে শুরু করলাম।
একটু পরেই কৃপানাথ ঘরে এলেন। ভিজে পোশাক পালটে একটা ঘিয়ে রঙের হাফহাতা হাওয়াই শার্ট আর পাজামা পরে এসেছেন।
আমার প্রায় মুখোমুখি একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসে পড়লেন কৃপানাথ। ওঁকে সিগারেট অফার করতে হাত তুলে না বললেন। তারপর ডিমের বড়ায় কামড় দিয়ে তৃপ্তির একটা শব্দ করলেন। বললেন, শঙ্করটা বড় ভালো রান্না করে।
হঠাৎই আমার চোখ পড়ল কৃপানাথের বাঁ-হাতের দিকে। এতক্ষণ ওঁকে পাঞ্জাবি পরা অবস্থায় দেখেছি, তাই ব্যাপারটা আগে নজরে পড়েনি।
অবাক হয়ে লক্ষ করলাম, কৃপানাথের বাঁ-হাতের কবজি থেকে কনুই পর্যন্ত অনেকগুলো শুকনো ক্ষত। ক্ষতের চেহারা পুরোনো আমলের টিকের দাগের মতো–যেন চিতাবাঘের চাকা-চাকা দাগ।
আমার নজর কৃপানাথের চোখ এড়ায়নি। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে খানিকটা সময় নিলেন। তারপর শান্ত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে ঠোঁটে সামান্য হেসে জিগ্যেস করলেন, কী দেখছেন, অচিনবাবু?
আমি একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। ওঁর বাঁ হাতের দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিলাম। বললাম, না, কিছু না।
কৃপানাথ এক দুর্জ্ঞেয় হাসি ফুটিয়ে তুললেন ঠোঁটে। বললেন, একটু আগেই আপনাকে বলছিলাম না, কৌতূহলই সব কিছুর মূলে। তবে আপনার কোনও চিন্তা নেই–একটু পরেই সবকিছু জানতে পারবেন।
জানলায় বৃষ্টির শব্দ রীতিমতো বেড়ে উঠেছে। ঝোড়ো হাওয়ার দাপটে কোথায় যেন খটাস খটাস শব্দ হচ্ছে। মাথার ওপরে ফ্যান ঘুরছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও কেমন গুমোট ভাব। ঘরের মার্বেল পাথর বসানো মেঝেতে আমাদের অদ্ভুত ছায়া নড়ছে।
সিগারেট ও চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে ভাবছিলাম, কৃপানাথ কখন আবার এক লক্ষ টাকার প্রসঙ্গ তুলবেন। বুঝতে পারছি, পাগলের পাল্লায় পড়েছি। তবে বড়লোক পাগল বলেই এখনও খানিকটা আশা নিয়ে অপেক্ষা করছি।
খেতে-খেতে আমরা টুকটাক গল্প করছিলাম। আমি অনুরাধা, বুবু-টুটুর কথা বললাম। কৃপানাথ ওঁর জমিদার বাপ-ঠাকুরদার কথা বললেন। তারপর হঠাৎই বিষণ্ণ হেসে বললেন, আপনার মতো আমিও বিয়ে করেছিলাম। প্রায় তিরিশ বছর আগে। বিয়ের বছর দুয়েকের মধ্যেই বেচারি বউটা মরে গেল।
কৃপানাথের শান্ত চোখ আচমকা কেমন চঞ্চল হয়ে উঠল। চেয়ারটা পেছনে ঠেলে দিয়ে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, চলুন, আর দেরি করে লাভ নেই।
আমিও উঠে পড়লাম।
কৃপানাথ ফ্যানটা অফ করে দিলেন। তারপর ঘর ছেড়ে বেরিয়ে বারান্দা ধরে হাঁটা দিলেন। আমি ওঁকে অনুসরণ করলাম। বুকের ভিতরে কেমন যেন ঢিপঢিপ শব্দ হচ্ছিল।
বৃষ্টির ছাটে চওড়া বারান্দার অনেকটাই ভেসে গেছে। বাতাসে উড়ে আসা অসংখ্য জলকণা মিহি পাউডারের গুঁড়োর মতো আমাদের শরীরে ছড়িয়ে পড়ছিল। কেমন এক অদ্ভুত ঠান্ডা আমেজ টের পাচ্ছিলাম। কোথায় যেন কড়কড় শব্দে বাজ পড়ল।
বারান্দার রেলিঙের কাছে গিয়ে ওপরে তাকিয়ে আকাশ দেখলাম। সেখানে বোধহয় জমাট কালো মেঘ, কারণ কিছুই দেখতে পেলাম না। তারই মাঝে হঠাৎ বিদ্যুৎ ঝলসে উঠল।
কৃপানাথ আমাকে তাড়া দিলেন : কী হল! আসুন–দেরি হয়ে যাচ্ছে।
দেরি! কিসের দেরি!
প্রশ্ন না করে তাড়াতাড়ি কৃপানাথকে অনুসরণ করলাম।
বারান্দার একেবারে শেষ প্রান্তে এসে একটা ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পড়লেন কৃপানাথ। দরজার ভারী তালা ঝুলছে। পকেট থেকে চাবি বের করে তালা খুললেন। তারপর দু-হাতে ঠেলে দরজার পাল্লা দুটো খুলে দিলেন।
অন্ধকার ঘরের মধ্যেই ফুলঝুরির মতো কয়েকটা রঙিন আলোর ফুলকি হঠাৎ যেন ঝলসে উঠেই নিভে গেল। কোথা থেকে এল এই রঙিন আলো? নাকি আমার দেখার ভুল?
ঘরে ঢুকেই কৃপানাথ আলো জ্বেলে দিলেন, ফ্যান অন করলেন। ওঁকে অনুসরণ করে ভিতরে ঢুকেই কেমন একটা মিষ্টি গন্ধ পেলাম। সামান্য ঝাঁঝালো অথচ মিষ্টি গন্ধ।
