তারপর চলতে লাগল আমাদের কফির কাপ আর সিগারেটে চুমুক। রেস্তোরাঁর খোলা দরজা দিয়ে দেখা যাচ্ছে টিপটিপ করে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আকাশে গুড়গুড় করে মেঘ ডাকছে। ফুটপাথের জনস্রোতে মাঝে-মাঝেই ছাতা চোখে পড়ছে। আবার কখনও বা ব্যাগ কিংবা রুমাল ছাতার বিকল্প হিসেবে কাজ করছে।
কফি আর সিগারেট শেষ হতেই কৃপানাথ মজুমদার আমার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেন। আমার স্বাস্থ্য নাকি নজর কাড়ার মতো। আমার ব্যক্তিত্ব একটু অন্য ধরনের–সাদামাঠা নয়। আমার চোখ বেশ অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে পারে। আমার সৌজন্যবোধের কোনও তুলনা নেই। এইরকম আরও কত কী!
মুখোমুখি বসে একটানা অহেতুক প্রশংসা শুনতে হচ্ছিল। সুতরাং যেই গুনগুনিয়ে একটু আধটু বিনয়ী প্রতিবাদ করতে শুরু করেছি তখনই হঠাৎ কৃপানাথ বলে উঠলেন, অচিনবাবু।
বলুন।
আমার একটা ছোট্ট অনুরোধ রাখবেন? বলেই কৃপানাথ মজুমদার আমার হাত চেপে ধরলেন। অনুনয়ের সুরে আবদার করলেন, এ অনুরোধটুকু আপনাকে রাখতেই হবে।
এই খ্যাপাটে বৃদ্ধ এবার কী অনুরোধ করবেন কে জানে! খানিকটা সতর্ক হয়েই প্রশ্ন করলাম, কী অনুরোধ?
আধঘণ্টার জন্যে আমার বাড়ি যাবেন? ঠিক আধঘণ্টা। একটুও বাড়তি সময় নেব না। চলুন, আপনাকে একটা দারুণ ইন্টারেস্টিং জিনিস দেখাব।
ওঁর বাড়ি কতদূর কে জানে! তা ছাড়া এই বৃষ্টিভেজা সন্ধের প্যাঁচপেচে পথ পেরিয়ে ওঁর ইন্টারেস্টিং জিনিস দেখার তেমন একটা আগ্রহ আমার নেই। তবে যদি…।
কৃপানাথ বোধহয় আমার মতো মধ্যবিত্তদের মন জানেন। কারণ, আমার চোখেমুখে সামান্য ইতস্তত ভাব লক্ষ করে চাপা গলায় বললেন, এবার আর একশো টাকা নয়, এক লক্ষ টাকা!
এক লক্ষ টাকা! আমি কানে ঠিক শুনছি তো!
বৃষ্টির তেজ হঠাৎই দ্বিগুণ হয়ে গেল। আর আমার কানের ভিতরে কেউ যেন তপ্ত তাওয়ায় রুটি সেঁকতে শুরু করল।
রেস্তোরাঁর রান্নাঘর থেকে চপ-কাটলেটের ম-ম গন্ধ আসছিল। আচমকা সেই গন্ধ মুছে গিয়ে একটা নেশা-ধরানো মিষ্টি গন্ধ ভেসে এল নাকে।
ওই ঝিমঝিম অবস্থার মধ্যেই কৃপানাথের চাপা অথচ স্পষ্ট গলা শুনতে পেলাম ও এক লক্ষ টাকা, অচিনবাবু! আর হেরে গেলে আপনাকে একটি টাকাও দিতে হবে না। এ একেবারে পড়ে পাওয়া চোদ্দো আনা।
আমি কোনওরকমে বাঁ-হাতের কবজি উলটে ঘড়ি দেখলাম। সাড়ে ছটা। আধঘণ্টার ব্যাপার। তা ছাড়া এক লক্ষ টাকা। ওঁর বাড়ি খুব একটা কি দূরে হবে?
আপনার বাড়ি কোথায়? প্রশ্নটা করার সময় আমার গলার স্বর সামান্য কেঁপে গেল।
এই তো, কাছেই…বাদুড়বাগান। ট্যাক্সি ধরব আর টপ করে পৌঁছে যাব।
অদ্ভুত ক্ষিপ্রতায় বিল মিটিয়ে ব্রিফকেস তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন কৃপানাথ। আমাকে হাত নেড়ে তাড়া দিলেন : চলুন, চলুন, বৃষ্টি আরও জোরে এসে গেলেই মুশকিল।
খুশিতে ডগমগ শিশুর মতো কাফে ডি মোনিকো থেকে ফুটপাথে নেমে পড়লেন কৃপানাথ। বৃষ্টিকে ভ্রূক্ষেপ না করেই তড়িঘড়ি পায়ে এগিয়ে গেলেন রাস্তার দিকে। আমি ওঁর কাছে গিয়ে পৌঁছোতে না পৌঁছোতেই ট্যাক্সি পেয়ে গেলেন। কারণ, এবারেও সেই একশো টাকার নোট। তেমন ওজর-আপত্তি তোলার আগেই তিনি একটা একশো টাকার নোট ধরিয়ে দিয়েছেন ট্যাক্সি-ড্রাইভারের হাতে। লোকটার মুখ দেখেই বোঝা গেল, আমাদের গন্তব্য যদি বাদুড়বাগান না হয়ে জাহান্নম বা দোজখ হত তা হলেও তার আপত্তি হত না।
বৃষ্টি, জল আর যানজট পেরিয়ে কৃপানাথ মজুমদারের বাড়ির সামনে এসে যখন পৌঁছোলাম, তখন সাতটা বেজে গেছে। গলিতে জমে ওঠা বৃষ্টির জল গোড়ালি ছাড়িয়ে হাঁটুর দিকে রওনা দিয়েছে। লম্বা সরু গলিতে মাত্র দুটো বাতি টিমটিম করে জ্বলছে। আলোছায়ায় যে কটি বাড়ি দেখতে পেলাম তার সবগুলোই পুরোনো আমলের। আকারে বিশাল অথচ চেহারায় জীর্ণ।
বৃষ্টির জলে ছপছপ শব্দ তুলে কৃপানাথ একটা রংচটা গোলাপি বাড়ির কাছে এগিয়ে গেলেন। বড় মাপের ভারী কাঠের দরজার নানান কারুকাজ। একটা নম্বর প্লেট বসানো থাকলেও আলো আঁধারিতে নম্বরটা ঠিক ঠাহর হল না।
শঙ্কর! শঙ্কর! বলে কৃপানাথ কাকে যেন ডাকলেন।
একটু পরেই বেশ শব্দটব্দ করে দরজা খুলে গেল। দরজার অল্পবয়েসি একটি রোগা ছেলে। বয়েস বিশ-বাইশ হবে বড়জোর। চোখগুলো ড্যাবড্যাবে। মাথায় কঁকড়া চুল। পরনে স্যান্ডো গেঞ্জি আর হাফপ্যান্ট।
কৃপানাথ আমাকে ডাকলেন? আসুন, ভিতরে আসুন, অচিনবাবু।
ভিজে জামাকাপড়ে সপসপ আওয়াজ তুলে দরজা পেরিয়ে ঢুকে পড়লাম ভিতরে।
জায়গাটা উঠোন মতো। বেশ বড়সড়ো। একপাশে বড়-বড় টবে কয়েকটা ক্যাকটাস জাতীয় গাছ। টবগুলো ইট দিয়ে ঘেরা।
উঠোন পেরিয়েই তিনতলা বাড়ি। বাড়ির কার্নিশে লতাপাতা-পরির কারুকাজ। সামনেই শান বাঁধানো সিঁড়ির তিনটে ধাপ। তার দুপাশে মার্বেল পাথর বসানো রোয়াক। রোয়াকের কিনারায় কয়েকটা নকশা কাটা লোহার থাম।
শঙ্কর দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। আমি আর কৃপানাথ তিনটে সিঁড়ির ধাপ উঠে ঢুকে পড়লাম বাড়ির ভিতরে। যেতে যেতে পেছনদিকে মুখ ফিরিয়ে শঙ্করকে লক্ষ্য করে কৃপানাথ বললেন, ওঁকে দোতলার ঘরে বসাচ্ছি। তুই চায়ের ব্যবস্থা কর।
বাড়িটার অলিন্দ, সিঁড়ি, বারান্দা সবকিছুর মধ্যেই যেন জমিদারি মেজাজ। কিন্তু গোটা বাড়িটা খাঁ-খাঁ করছে। মোট তিনটে প্রাণী ছাড়া আর কোনও সাড়াশব্দ নেই। কিন্তু একটু পরেই বুঝতে পারলাম, আরও একটা প্রাণী বাড়িতে আছে।
