এইসব ভাবতে-ভাবতেই মনের মধ্যে বেশ কতকগুলো জোরালো যুক্তি তৈরি হয়ে গেল। এবং একশো টাকার নোটটা দিব্যি পকেটে চালান করে দিয়ে কৃপানাথকে বললাম, চলুন, কাফে ডি মোনিকোয় বসে একটু কফি খাওয়া যাক।
কৃপানাথ মজুমদার খুশিতে একেবারে ফেটে পড়লেন। চশমার আড়ালে ওঁর ঘোলাটে চোখ পলকের জন্যে চকচক করে উঠল। তারপর আগ্রহী পা ফেলে আমার পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করলেন রাস্তা পার হওয়ার জন্যে।
ঠিক তখনই ঘটনাটা ঘটল।
কয়েকটি স্কুলের মেয়ে রাস্তা পার হচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎই ট্রাফিক সিগন্যাল বদলে যাওয়ায় গাড়ি, বাস, ট্যাক্সির মিছিল চলতে শুরু করে দিল। জনা আষ্টেক মেয়ে মাঝরাস্তায় জড়সড় হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। ওদের মুখে দিশেহারা ভাব। বোধহয় স্কুল থেকে এদিকে মিউজিয়াম বা বিড়লা প্ল্যানেটারিয়াম দেখতে এসেছিল। দেখলাম, আমাদের দিকের ফুটপাথে ওদের দলের বাকি সবাই দাঁড়িয়ে রয়েছে। হাত নেড়ে চিৎকার করে মাঝরাস্তায় আটকে পড়া বন্ধুদের ডাকাডাকি করছে।
এমন সময় গাড়িগুলোর গতি একটু কমতেই তাদের ফাঁকফোকর দিয়ে তিনটে মেয়ে ছুট লাগিয়ে চলে এল এপারে।
আর সঙ্গে-সঙ্গে কৃপানাথ আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বলে উঠলেন, বলুন তো, আর কটা মেয়ে এক্ষুনি রাস্তা পেরিয়ে এপাশে চলে আসতে পারবে?
আবার ফাটকা? নাকি কৃপানাথ মজুমদারের মজা?
আমি অবাক চোখে ভদ্রলোকের দিকে মুখ ফিরিয়ে তাকাতেই উনি অপ্রস্তুতভাবে হাসলেন, বললেন, বলুন না, মশাই। এ তো স্রেফ মজার খেলা!
আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, দুজন পারবে মনে হয়।
কিন্তু না, এবার হেরে গেলাম। এক ঝেকে আরও চারটে মেয়ে রাস্তা পেরিয়ে চলে এল। এপারে দাঁড়ানো দলবলের কাছে।
কৃপানাথ মুচকি হেসে বললেন, ব্যাড লাক, মিলল না…।
মিলে গেলে কি আবার একশো টাকা পেতাম নাকি!
বেশ বুঝতে পারছিলাম, আমার মনের মধ্যে লোভ উঁকিঝুঁকি মারছে। কিন্তু আশ্চর্য, আগে কখনও আমি জুয়া খেলিনি।
একটু পরেই ট্রাফিক সিগন্যাল বদলে গেল। আমরা দুজনে নিরাপদে রাস্তা পেরিয়ে রওনা হলাম কাফে ডি মোনিকের দিকে। ফুটপাথের ভিড়, হকারদের উৎপাত, গাড়ির হর্নের শব্দ–এইসব মিলিয়ে বাকি পথটুকু কোনও কথাই বলতে পারলাম না আমরা।
সন্ধের অন্ধকার ঘন হয়েছে। বড় বড় অট্টালিকার ওপরতলায় গ্লো-সাইনের লাল-সাদা সবুজ নকশা জ্বলছে-নিভছে। আর হঠাৎই কয়েকটা বৃষ্টির ফোঁটা ঝরে পড়ল কালো আকাশ থেকে।
রেস্তোরাঁয় ঢুকে দরজার কাছাকাছি একটা টেবিলে বসলাম আমরা। কৃপানাথ বেয়ারাকে দুটো কফি দিতে বললেন। তারপর আমার দিকে অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে গলা নামিয়ে বললেন, অচিনবাবু, প্রাণীদের মধ্যে একমাত্র মানুষেরই কৌতূহল আছে। চাঁদকে দেখে কৌতূহল হয়েছিল বলেই জ্যোতির্বিজ্ঞানের জন্ম হয়েছে। আর লেখাপড়ার মোদ্দা ব্যাপারটাই তো কৌতূহলের ভিতের ওপরে দাঁড়িয়ে রয়েছে।
আমি আর কী বলব! একটু আগেই এই ভদ্রলোক প্রায় অকারণেই আমাকে একশোটা টাকা দিয়েছেন। সুতরাং ওঁর একটু-আধটু জ্ঞান আমার শোনা উচিত।
কৃপানাথ পকেট থেকে ক্লাসিক সিগারেটের প্যাকেট বের করলেন। আমাকে অফার করলেন। তারপর নিজে একটা নিলেন। আমি মামুলি একটা লাইটার বের করে ওঁর সিগারেট ধরিয়ে দিলাম, তারপর নিজেরটা ধরালাম। প্রথম ধোঁয়া ছাড়তে না ছাড়তেই কৃপানাথ রেস্তোরাঁর কিচেনের দিকে চোখের ইশারা করে বললেন, কফি আসছে।
ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম, একজন রোগা ঢ্যাঙা উর্দি পরা বেয়ারা কফির ট্রে হাতে এগিয়ে আসছে। তার দিকে নজর রেখে চোখ ছোট করে সিগারেটে জোরালো টান দিলেন কৃপানাথ। তারপর আচমকা বলে উঠলেন, বলুন তো, বেয়ারাটা কার সামনে আগে কফির কাপ রাখবে? আপনার, না আমার?
আমি কিছু বলে ওঠার আগেই বৃদ্ধ ঝটপট তাগাদা দিলেন আমায় : কী হল, জলদি বলুন, কুইক–।
আবার ওই একশো টাকার নোট। আবার লোভ। আবার মাসের শেষ সপ্তাহের অভাব। এই তিন-তিনটে ব্যাপার মিলেমিশে সবকিছু কেমন তালগোল পাকিয়ে গেল। তার ওপর একটু আগে বলা কৃপানাথের কথাগুলো ঘুরপাক খাচ্ছিল মাথার ভিতরে। কৌতূহল। কৌতূহল থেকেই বাজি, জুয়া, সবকিছুর জন্ম। এই কৌতূহলের খপ্পরে পড়েই কৃপানাথের আজগুবি খেলায় নাম লিখিয়েছি আমি।
সুতরাং বলেই ফেললাম, আপনার সামনে আগে কাপ রাখবে।
কথা শেষ করার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই কৃপানাথের সামনে কফির কাপ রাখল বেয়ারা। তারপর আমাকে কফি দিল।
লোকটা সরে যেতেই কৃপানাথ হাসলেন। বললেন, আপনি দারুণ লাকি, অচিনবাবু। বলেই পকেট থেকে আবার একটা একশো টাকার নোট বের করে টেবিলের ওপর দিয়ে এগিয়ে দিলেন আমার সামনে।
আমি কফিতে চুমুক দেওয়া থামিয়ে আপত্তি জানালাম ও এ আপনি কী শুরু করেছেন, কৃপানাথবাবু! খেলা খেলাই–তার সঙ্গে এভাবে টাকা-পয়সা জড়ানো কি ঠিক?
ভদ্রলোক একেবারে আমার হাত চেপে ধরলেন। চাপা আন্তরিক গলায় বললেন, দয়া করে এই বুড়োটার তৃপ্তি কেড়ে নেবেন না। আমার আর টাকার দরকার নেই–শুধু একজন বন্ধু দরকার– আপনার মতো। প্লিজ, এই সামান্য টাকা কটা ফিরিয়ে দিয়ে আমাকে কষ্ট দেবেন না।
গত এক-দেড় ঘণ্টার লড়াইয়ে আমার বিবেক ক্রমশই কাহিল হয়ে পড়ছিল। সুতরাং টাকাটা নিয়ে পকেটে ঢোকাতে খুব বেশি সময় লাগল না।
