কৃপানাথ মজুমদারের সঙ্গে আমার আলাপ মাত্র ঘণ্টা দুয়েকের। কিন্তু প্রথম থেকেই ভদ্রলোককে আমার কেমন একটু অদ্ভুত মনে হয়েছে।
অফিস ছুটির পর, বিকেল পাঁচটা নাগাদ, দাঁড়িয়ে ছিলাম এসপ্ল্যানেডের মোড়ে। চারপাশে মানুষজনের ভিড়। বাস, ট্যাক্সি আর গাড়ির জটলা। দূরে একটা ডবল ডেকার বাস আসছে দেখে আমি গলা উঁচিয়ে দেখতে চেষ্টা করছিলাম বাসটা কত নম্বর। এল-৯ যদি হয় তা হলে আমি নিশ্চিন্ত। এক বাসে চড়েই সোজা বাগবাজার। বাড়ি ফেরার যে খুব একটা তাড়া আছে তা নয়। তবে আকাশে সকাল থেকেই ভয়-দেখানো কালো মেঘ। গত বিশদিন ধরে একটানা যে-গরম চলেছে তাতে সবাই বলছে আজ-নয়কাল শহর ভাসানো বৃষ্টি হবেই। সেইজন্যেই ঘরে ফেরার পথে অযথা দেরি করব না ভেবেছি।
বাসটা কত নম্বর বলুন তো!
প্রশ্নটা কি আমাকে লক্ষ্য করেই? পাশে তাকিয়ে দেখি রোগা ঢ্যাঙা চেহারার এক প্রৌঢ়। মাথায় কাঁচাপাকা চুল। পরনে পাটভাঙা ধুতি-পাঞ্জাবি। চোখে মেটাল ফ্রেমের শৌখিন চশমা। ডান হাতের আঙুলে তিন-তিনটে রঙিন পাথর বসানো সোনার আংটি, বাঁ-হাতে একটা হালকা ব্রিফকেস।
ভদ্রলোকের গাল তোবড়ানো, মুখের চামড়ায় বয়েসের ভাঁজ। কিন্তু সব মিলিয়ে একটা প্রাচীন বনেদিয়ানার ছাপ রয়েছে। আর তার চোখের নজর অদ্ভুতরকম শান্ত।
আমি আবার বাসটার দিকে তাকালাম। ওটা অনেক কাছে এসে গেছে। না, এল-৯ নয়, পাঁচ নম্বর।
ভদ্রলোককে বাসের নম্বরটা বললাম। একবার দেখলাম ওঁর চোখের দিকে। চশমা পরেও কি ঠিকঠাক দেখতে পান না।
ভদ্রলোক আমার দিকে তাকিয়ে অকারণেই হাসলেন। তারপর বললেন, আমার নাম কৃপানাথ মজুমদার। ব্যবসা করি…।
অপরিচিত লোকের আত্মজীবনী শোনার কোনওরকম আগ্রহ কোনওকালেই আমার ছিল না। তাই আবার নজর ফেরালাম বাস-রাস্তার দিকে।
বলুন তো, এর পর কত নম্বর লাল রঙের বাস আসবে?
কী অদ্ভুত প্রশ্ন! একটু অবাক হয়েই তাকালাম কৃপানাথের দিকে। ভদ্রলোক প্রথমটা একটু সিঁটিয়ে গেলেন। কিন্তু তারপরই দিব্যি সামলে নিয়ে বললেন, কিছু মনে করবেন না। এটা স্রেফ একটা মজার খেলা। সারাদিনের খাটাখাটুনির পর ব্রেনটা একটু রিল্যাক্স করা আর কী! ওই দেখুন, দূরে একটা লাল বাস আসছে। বলুন তো, কত নম্বর হতে পারে?
কেমন এক দোটানার মধ্যে পড়লাম। এই বিচিত্র লোকটার বায়নায় ধরা দিয়ে কিছুক্ষণের জন্যে ছেলেমানুষ হয়ে যাব? বাড়িতে বুবু-টুটুর সঙ্গে যে মাঝেমধ্যে ছেলেমানুষি করি না এমন নয়। বুবু ফাইভে পড়ে, আর টুটু ওয়ানে। ওদের সঙ্গে হুল্লোড় করার সময় অনুরাধা এক-এক সময় ভীষণ খেপে যায়। বলে, তিন-তিনটে ছেলে নিয়ে আমার হয়েছে যত জ্বালা! তার মধ্যে একটা অবশ্য ধেড়ে! উত্তরে আমি শুধু হাসি। আর খেলা চালিয়ে যাই। টুটু তাতে মায়ের দিকে তাকিয়ে হেসে গড়িয়ে পড়ে।
কিন্তু তাই বলে এখন এরকম ছেলেমানুষি খেলা!
আরে তাড়াতাড়ি বলুন, বাসটা কাছে এসে যাচ্ছে–এরপর নম্বর স্পষ্ট দেখা যাবে…।
কৃপানাথের অধৈর্য তাড়ায় কী যে হয়ে গেল! বাসটা একতলা, তাই ফস করে আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, চোদ্দো নম্বর।
বাসটা কাছে আসতেই তার নম্বরটা পড়া গেল। চোদ্দো। কৃপানাথ হেসে উঠে বললেন, শাবাশ! আপনি জিতেছেন।
তারপরই আমাকে অবাক করে দিয়ে পাঞ্জাবির পকেট থেকে কড়কড়ে একটা একশো টাকার নোট বের করে গুঁজে দিলেন আমার হাতে।
কয়েক মুহূর্ত কোনও কথা বলতে পারলাম না। কৃপানাথ মজুমদার এখনও পর্যন্ত আমার নামও জিগ্যেস করেননি। সুতরাং সম্পূর্ণ অজানা-অচেনা একজন মানুষকে অযথা একশোটা টাকা দিয়ে দেওয়া…নাঃ, ভদ্রলোক যতই বড়লোক হোন না কেন ব্যাপারটা অস্বাভাবিক।
নাকি এটা এক ধরনের জুয়া খেলা! বাসের নম্বর না মিললে আমাকে কি একশো টাকা দিতে হত?
কৃপানাথ আমার অস্বস্তি আঁচ করে বললেন, মাপ করবেন, আপনার নামটা এখনও জিগ্যেস করা হয়নি…।
আমি বললাম, আমারই বলা উচিত ছিল। অচিন বন্দ্যোপাধ্যায়।
একশো টাকার নোটটা তখনও আমার হাতের মুঠোয় ধরা। বুঝতে পারছি না নোটটা নিয়ে এখন কী করা উচিত।
অচিনবাবু, এই সামান্য টাকাটা আপনি নিলে আমি খুব খুশি হব। না, আপনি যা ভাবছেন তা নয়। এটা জুয়া নয়। বাসের নম্বর না মিললে আপনাকে কোনও টাকা দিতে হত না। একটু থেমে উদাস চোখে কালচে আকাশের দিকে দেখলেন কৃপানাথ। তারপর বললেন, আসলে ব্যাপারটা এক বড়লোক বৃদ্ধের খেয়াল বলতে পারেন। গত বিশ-তিরিশটা বছর একা-একা আছি। সঙ্গী বলতে একটা মানুষও নেই। তাই রোজ বিকেলে, অফিস কাছারি ছুটির সময় ধর্মতলায় এসে ঘোরাফেরা করি, মানুষজনের সঙ্গে একরকম গায়ে পড়েই আলাপ করি… একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন কৃপানাথ। তারপর কিছুটা হতাশ করুণ সুরে বললেন, আশা করি এই বুড়োর ছেলেমানুষিতে আপনি কিছু মনে করেননি। ভেবেছিলাম আপনার সঙ্গে গল্প করে মজা করে খানিকক্ষণ সময় কাটাব, চা-টা খাব, কিন্তু..কপালে নেই…।
আমার মনের মধ্যে একটু-আধটু তোলপাড় চলছিল। মাসের শেষ সপ্তাহ। সুতরাং যথারীতি টাকার টানাটানি চলছে। এরকম পড়ে পাওয়া চোদ্দো আনা কি ছেড়ে দেওয়া উচিত? তা ছাড়া আমি তো খেলায় জিতেছি। আবার এই খামখেয়ালি বুড়োটার সঙ্গে গল্পগাছা করেও বেশ খানিকটা সময় নষ্ট হবে। আমার সময়ের দাম হয়তো কম, কিন্তু তবু তার দাম তো আছে!
