আমাকে তাজ্জব করে দিয়ে বনবনিয়া সোজা এগিয়ে গেল ওদের দিকে। আমি ওকে ডেকে কিছু বলতে যাওয়ার আগেই বনবনিয়া নেকড়েকে লক্ষ করে চেঁচিয়ে উঠল, এ কোম্পানি, তোহার পাপ কা ডালা ভর গিয়া।
নেকড়ের দল সঙ্গে-সঙ্গে আমাদের খেয়াল করল। কানে-শোনা-যায়-না এমন ভাষায় গালিগালাজ করতে করতে ওরা তেড়ে এল আমাদের দিকে। ছজনকে ওইভাবে তেড়ে আসতে দেখে আমি ভয়ে চিৎকার করে উঠলাম, বনবনিয়া, পালিয়ে এসো।
বনবনিয়া আমার দিকে ফিরে হাসল, তারপর ওর প্লাস্টিকের বাঁশিতে ফুঁ দিল।
বাজারের মোড়ে লোকজন কম যাতায়াত করে না। তা ছাড়া ছোট-বড় দোকানপাটও অনেক। কিছু দোকান বন্ধ হয়ে গেলেও বেশ কিছু এখনও ভোলা।
গণ্ডগোলটা শুরু হতেই আমাদের ঘিরে লোকজনের ভিড় জমে গেছে। নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে মজা দেখছে সবাই।
বনবনিয়ার বাঁশিতে সুর উঠতেই একটা চেনা সুগন্ধ আমার নাকে এল। বনবনিয়াকে ঘিরে একটা আবছা আভাও যেন লক্ষ করলাম।
নেকড়ের দল ওর ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়তেই সংঘর্ষের বিশ্রী শব্দ আমার কানে এল। দেখি নেকড়েরা তিনজন হাত-বুক-মুখ চেপে রাস্তায় বসে পড়েছে। একজনের নাক ফেটে রক্ত পড়ছে। ওরা যেন কোনও পাথরের মূর্তির ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কারণ বনবনিয়া নিশ্চলভাবে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে।
নেকড়ে ততটা আহত হয়নি। ও এক ছুটে একটা দরমা ঘেরা দোকানে ঢুকে গেল। পরমুহূর্তেই একটা লম্বা ধারালো তরোয়াল নিয়ে বেরিয়ে এল সেখান থেকে। রাস্তা আর দোকানের আলো পড়ে তরোয়ালটা ঝিকিয়ে উঠল।
তরোয়ালটা বাগিয়ে ধরে ধীরে-ধীরে পা ফেলে বনবনিয়ার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল নেকড়ে। নোংরা গালাগাল দিয়ে বলল, তোর ন্যাড়া মাথা এক কোপে দু-ফাঁক করে দেব।
তরোয়ালটা শূন্যে ঘুরিয়ে নেকড়ে বসিয়ে দিল বস্তুনিয়ার মাথায়।
আমি ভয়ে চিৎকার করে উঠলাম। দর্শকদের কেউ-কেউ অজান্তে আর্তনাদ করে উঠল।
কিন্তু নেকড়ের তরোয়ালটা স্রেফ বাতাস কেটে বেরিয়ে গেল। ন্যাড়া মাথা বাচ্চা ছেলেটা একইভাবে নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে।
হতভম্ব নেকড়ে অন্ধ রাগে ওকে লক্ষ করে পাগলের মতো তরোয়াল চালাতে লাগল। কিন্তু তার ফল হল একই।
শেষ পর্যন্ত ও তরোয়ালে ভর দিয়ে ঝুঁকে পড়ে হাঁপাতে লাগল।
টার্গেট আর হীরালাল বস্তুনিয়ার দিকে এগিয়ে আসছিল, বম্বনিয়া ওদের দিকে তাকিয়ে খলখল করে হেসে উঠল। ওর চোখ হঠাৎই লাল টুনি বাতি হয়ে জ্বলে উঠল। বম্বনিয়া চিৎকার করে বলে উঠল, হম কুছু নেহি করতা। সব হো যাতা হ্যায়।
টার্গেট বনবনিয়ার বুক তাক করে গুলি চালাল।
গুলিটা বোধহয় বনবনিয়ার গায়ে ঠিকরে আবার টার্গেটের দিকেই ফিরে গেছে। কারণ টার্গেট রিভলভার ফেলে দিয়ে তলপেট চেপে বসে পড়ল। ওর আঙুলের ফাঁক দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসতে লাগল।
আমাদের চারপাশে ততক্ষণে শোরগোল শুরু হয়ে গেছে। হীরালাল দৌড়ে পালাতে যাচ্ছিল। আহত নগাও ওকে অনুসরণ করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু বনবনিয়া বাঁশিতে সুর তুলতেই ওরা পলকে পাথর হয়ে গেল। যেন কেউ ওদের মন্ত্রবলে অবশ করে দিয়েছে।
বনবনিয়া আমার কাছে এসে মিষ্টি করে হেসে বলল, হম যাতা হ্যায়, ছোটে মালিক। এদেরকেও নিয়ে যাচ্ছি। এরা আর কখনও ফিরে আসবে না। আর কারও সর্বনাশ করবে না।
আমাদের সবাইকে স্তম্ভিত করে দিয়ে ন্যাড়া মাথায় লাল ফেট্টি বাঁধা বাচ্চা ছেলেটা বাঁশি বাজাতে-বাজাতে নাচের ভঙ্গিতে পা ফেলে রওনা হল অন্ধকারের দিকে। আর নেকড়েরা ছজন কোন অলৌকিক নির্দেশে ওকে অনুসরণ করল। ঠিক যেন হ্যাঁমেলিনের বাঁশিওয়ালা ইঁদুরের পালকে মন্ত্রমুগ্ধ করে মৃত্যুর দিকে টেনে নিয়ে চলেছে।
অন্ধকারে মিলিয়ে যাওয়ার আগে বম্বনিয়া চেঁচিয়ে বলে গেল, যব কিসিকা পাপ কা ডালা ভর যাতা হ্যায়, তব হম আতা হ্যায়।
কারও পাপের ডালা পূর্ণ হলেই বনবনিয়া আসে! বিপদ থেকে সবাইকে বাঁচায়।
বনবনিয়াকে তারপর আমি আর কখনও দেখিনি।
যদি কখনও তোমরা ভীষণ বিপদে পড়ো, অসহায় দিশেহারা হয়ে যাও, আঁকড়ে ধরার জন্যে কোনও খড়কুটোও না থাকে তখন যদি মাথায় ফেট্টি বাঁধা ন্যাড়া মাথা টিকিওয়ালা কোনও বাচ্চা ছেলেকে দেখতে পাও, চোখে কাজল, কপালে কাজলের টিপ, হাতে বাঁশি, তোমার কাছে এসে মাখন খাওয়ার পয়সা চাইছে–তো বুঝবে ও-ই হল বনবনিয়া। তবে ওর আসল নাম বোধহয় বিপত্তারণ।
বাক্সের ভিতরে কী আছে? (নভেলেট)
প্রশ্নটা করে কৃপানাথ মজুমদার আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। প্রত্যাশায় দু-চোখ জ্বলজ্বল করছে। ময়লা হয়ে যাওয়া বাবের আলো তেরছাভাবে পড়েছে ওঁর মুখে। তোবড়ানো গাল আর চামড়ার ভঁজে ছায়া পড়ে অদ্ভুত দেখাচ্ছে।
বাইরে ঝমঝম বৃষ্টি। খোলা জানলা দিয়ে ছাট আসছে। বর্ষার প্রথম বৃষ্টি। তাই বেশ লাগছে। সেইজন্যেই বোধহয় কৃপানাথ জানলা খুলে দিয়েছেন।
কালো আকাশ চিরে গেল আঁকাবাঁকা বিদ্যুতের রেখায়। তারপর শোনা গেল গুড়গুড় শব্দ। ক্যামেরার ইলেকট্রনিক ফ্ল্যাশগানের মতো বিদ্যুতের ঝিলিক পলকের জন্যে ছুঁয়ে গেল বিশাল বাক্সটাকে। ওটা ধাতব গা চকচক করে উঠল হঠাৎ। আর তখনই একটা অদ্ভুত খচড়-খচড় শব্দ ভেসে এল বাক্সের ভিতর থেকে।
কৃপানাথ মুচকি হাসলেন। আবার প্রশ্ন করলেন, কী হল, বলুন, বাক্সের ভিতরে কী আছে?
