দেখি বিছানায় ও নেই।
আমি তাড়াতাড়ি উঠে বসলাম বিছানায়। আর তখনই বাঁশির সুর শুনতে পেলাম। কেউ যেন ফিসফিস করে বাঁশি বাজাচ্ছে। সেই অস্পষ্ট মিহি সুর যেন কানের ভেতর দিয়ে মরমে পৌঁছে যাচ্ছে।
বনবনিয়া এত মিষ্টি সুরে বাঁশি বাজাতে পারে তা তো জানতাম না! কিন্তু ও গেল কোথায়!
অন্ধকারে এপাশ-ওপাশ চোখ চালিয়ে ওকে খুঁজতে লাগলাম। খুঁজে না পেয়ে যখন ভাবছি বিছানা ছেড়ে উঠে দেখব দরজার ছিটকিনি খোলা কি না, ঠিক তখনই খোলা জানলা দিয়ে বাইরে নজর গেল আমার।
আকাশে প্রায়-পূর্ণিমার চাঁদ। তাকে ঘিরে কয়েক টুকরো মেঘ। আমাদের বাগানের একটা বড় জাম গাছ চাঁদের আলো আড়াল করায় উঠোনের একটা দিক গাঢ় অন্ধকারে ঢেকে গেছে। সেই গাঢ় ছায়ার পাশেই ঠিকরে পড়েছে জ্যোৎস্নার আলো। বনবনিয়াকে সেই আলো-ছায়ার মধ্যে দেখতে পেলাম।
পরনে শুধু একটা হাফপ্যান্ট। মাথায় ফেট্টি বাঁধা। হাতে প্লাস্টিকের বাঁশি। ছেলেটা অদ্ভুত নাচের ভঙ্গিতে বাঁশি বাজাতে বাজাতে একবার আলো থেকে ছায়ায় ঢুকছে, আর-একবার ছায়া থেকে আলোয়।
কেমন এক বিচিত্র আভা ছেলেটাকে জড়িয়ে ছিল। ফলে ও গাছের ছায়ার অন্ধকারে ঢুকে পড়লেও ওকে আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম।
আমি হতবাক হয়ে বাচ্চা ছেলেটাকে দেখতে লাগলাম।
একটু পরেই দেখি ও নাচ থামিয়ে জানলায় দিকে ফিরে আসছে।
আমি তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লাম বিছানায়। ঘুমের ভান করে পড়ে রইলাম।
শুয়ে-শুয়ে ভাবতে লাগলাম, বনবনিয়া জানলা লক্ষ করে আসছে কেন। আমার ঘরের দরজা দিয়ে ঢুকতে হলে তো ওকে বাড়ির দরজা দিয়ে ঢুকে তারপর আসতে হবে। আর সেই দরজাটা তো অন্য দিকে! বনবনিয়া তো সেদিকে গেল না!
একটু পরেই নাকে সুন্দর একটা গন্ধ টের পেলাম ধূপ-ধুনোর গাঢ় গন্ধ। এ-গন্ধে নেশা ধরে যায়।
সামান্য চোখ খুলে দেখি বনবনিয়া এসে গেছে ঘরের ভেতরে। অদ্ভুত আভাটা তখনও ওর গায়ে জড়িয়ে আছে। আর সুন্দর গন্ধটাও।
আমি কেমন যেন আচ্ছন্ন হয়ে গেলাম। বনবনিয়ার এইসব উদ্ভট কাণ্ড দেখে আমার তো ভয় পাওয়ার কথা। কিন্তু কেন জানি না, একটুও ভয় করছিল না। বরং ও ঘরে ফিরে আসায় যেন বেশ ভরসা পেলাম। হঠাৎই ভীষণ ঘুম পেয়ে গেল আমার। তারপরই কখন যেন গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছি।
এ-ঘটনার কথা আমি কাউকে বলিনি। পাছে বনবনিয়া আমাদের বাড়ি ছেড়ে চলে যায়, সেই ভয়ে।
কিন্তু কয়েকদিন পর রাতে শোওয়ার সময় ওকে সেই ব্যাপারে প্রশ্ন করলাম।
ও কাজল-মাখা চোখে নিষ্পাপভাবে তাকাল আমার দিকে। মিষ্টি করে হেসে বলল, কা জানে, ছোটে মালিক। হম কুছু নেহি করতা। সব হো যাতা হ্যায়।
আমি হতবাক হয়ে ওকে দেখতে লাগলাম। সেই মুহূর্তে হঠাৎই কেমন মনে হল, বনবনিয়া আমাদের বাড়িতে বেশিদিন থাকবে না।
.
চরম দিনটা এসে গেল খুব তাড়াতাড়ি।
বনবনিয়া সন্ধে সাতটা নাগাদ আমাকে বলল, ছোটে মালিক, হামার সাথ চলো। পতঙ্গ লানে যায়েঙ্গে।
অনেক চেষ্টায় জানলাম পতঙ্গ মানে ঘুড়ি। এখন ও ঘুড়ি কিনতে যাবে! ঘুড়ি ওড়ানোর নেশা আমারও আছে। কিন্তু এখন ঘুড়ি কিনতে যাওয়ার কথা শুনলে বাপি নির্ঘাত বকবেন। আর মাও নিশ্চয়ই ছেড়ে কথা বলবেন না।
সেই আশঙ্কার কথা বনবনিয়াকে বলতেই ও ছুটে গেল পাশের ঘরে–বাপি আর মায়ের কাছে। আমিও তাড়াতাড়ি বইপত্র গুছিয়ে উঠে পড়লাম পড়ার টেবিল ছেড়ে।
পাশের ঘরে গিয়ে দেখি বনবনিয়া বাপি আর মায়ের একেবারে হাতে-পায়ে ধরাধরি। ও ইনিয়েবিনিয়ে ঘুড়ি কিনতে যাওয়ার কথা বলছে, আর বারবার বলছে ওর হাতে আর সময় নেই। ওকে যাওয়ার অনুমতি দিতেই হবে। বিনা অনুমতিতে ও যেতে পারবে না।
সময় নেই মানে! কী বলতে চায় বনবনিয়া!
যাই হোক, শেষ পর্যন্ত অনুমতি পাওয়া গেল। কী ভেবে দিদি সঙ্গে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু বনবনিয়া বারণ করল : নেহি, ছোটে মালকিন, তোহার যানা ঠিক নেহি হ্যায়।
একটু পরেই আমরা পথে বেরোলাম। আকাশ মেঘলা। চাঁদের আলোর ছিটেফোঁটাও নেই।
রাস্তার আলোর হঠাৎই খেয়াল করলাম, বনবনিয়া কোন ফাঁকে যেন পোশাক পালটে নিয়েছে। ওর গায়ে প্রথম দিনের সেই লাল-সবুজ ঢোলা জামা, সঙ্গে কালো হাফ-প্যান্ট। আর হাতে প্লাস্টিকের বাঁশি তো আছেই।
এবড়োখেবড়ো পিচ-খোঁড়া রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বনবনিয়া বিড়বিড় করে বলতে লাগল, ও লোগ বহুত বদমাশ হ্যায়। বহুত আদমির সর্বনাশ করেছে।
বুঝলাম, ও নেকড়েদের কথা বলছে।
বনবনিয়ার সেদিনকার প্রতিবাদের পর নেকড়ের দল আরও দুবার এসেছে আমাদের বাড়িতে। হাবভাবে বুঝেছি, ওরা মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র সঙ্গে নিয়েই এসেছে। তবে আগের তুলনায় অনেক ভদ্রভাবে ওরা বাকি টাকার দাবি করেছে বাপির কাছে। বনবনিয়াকে মা তখন আগলে রেখেছিল–পাছে ও আগের দিনের মতো কিছু করে বসে।
ওরা চলে যাওয়ার পর বনবনিয়া আমার কাছে বসে গজগজ করছিল : পাপ কা ডালা ভর গিয়া। পাপ কা ডালা ভর গিয়া।
কাদের পাপের ডালা ভরে গেছে? ও কি নেকড়েদের কথা বলছে?
আনমনা হয়ে এইসব কথা ভাবতে-ভাবতে খেয়াল করিনি কখন যেন বাজারের মোড়ে পৌঁছে গেছি। অথচ ঘুড়ির দোকানে যেতে হলে এদিকে আসার কথা নয়। এদিক দিয়ে গেলে অনেকটা ঘুরপথ হয়।
চোখে পড়ল নেকড়ে তার পাঁচজন সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে যথারীতি হাজির। কী একটা ব্যাপার নিয়ে ওরা নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করছে।
