ঠিক তখনই কোথা থেকে এক ঝলক ঠান্ডা মিষ্টি বাতাস উড়ে এসে বাপিকে ঘিরে নেয়। বুকের জ্বালা-যন্ত্রণা কমে গিয়ে ভেতরটা কেমন শান্ত হয়ে যায়। বাপি উঠে দাঁড়াতেই কে যেন তার জামা ধরে টানে, আর হিন্দিতে বলে, এ বাবু, পইসা দেও না।
ঘুরে তাকিয়েই দেখেন ন্যাড়া মাথা একটা মিষ্টি ছেলে।
কেন, পয়সা নিয়ে কী করবি?
ছেলেটা হেসে বলে, মাখখন খায়গা।
এ কী অদ্ভুত বায়না! পয়সা নিয়ে মাখন খাবে! নাকি মাখন-রুটি বলতে চাইছে?
বাপি ওকে দুটো টাকা দিতেই বাচ্চাটা সেলাম ঠুকে বাপির সঙ্গে-সঙ্গে লাফিয়ে লাফিয়ে চলতে শুরু করে। আর হাতের প্লাস্টিকের বাঁশিটা পোঁ-পোঁ করে বাজাতে থাকে।
কথায় কথায় জানা গেল ওর নাম বনবনিয়া। মা-বাবা কেউ নেই। কুলিদের বস্তিতে একজনের কাছে আশ্রয় নিয়ে আছে। সে খুব খাটায়, আর মদ খেয়ে প্রচণ্ড মারধোর করে।
এইরকম নানা কথা বলতে বলতে বনবনিয়া হঠাৎ বাপির জামা খামচে ধরে বায়না করে বসে : এ বাবু, আমি তোহার সঙ্গে যাবে। তোহার সঙ্গে থাকবে।
বাচ্চা ছেলেটার এই অনুরোধ বাপিকে কেমন যেন আচ্ছন্ন করে দিয়েছিল। বাপি আর না বলতে পারেননি।
বাড়িতে ওর একটা দিন কাটতে না কাটতেই আমরা সকলেই বুঝে গেলাম বম্বনিয়া দারুণ কাজের ছেলে। সব কাজই করে হাসি মুখে। লাফিয়ে-লাফিয়ে চলে, গুনগুন করে দেশোয়ালি ভাষায় গান করে। আমাকে ডাকে ছোটে মালিক, দিদিকে ছোটে মালকিন, বাপিকে বাবু আর মা-কে মাজি।
নতুন জামাকাপড় ওকে পরানো গেল বটে কিন্তু মাথার ফেট্টি কিছুতেই ও খুলল না। আর কাজল লাগানোর অভ্যেস ছাড়ানো গেল না। মা কখনও কখনও কপট রাগে ওকে বলেন, গেঁয়ো ভূত।
উত্তরে বনবনিয়া খিলখিল করে হাসে।
এর মধ্যে একদিন দুপুরে নেকড়ের দল টাকা চাইতে বাড়িতে এসে হাজির হল।
দিনটা ছিল রবিবার। আমরা সবাই বাড়িতেই ছিলাম। ওদের ডাকে বাপি বাইরে বেরোতেই লোফারগুলো অশ্রাব্য গালিগালাজ শুরু করল।
বনবনিয়া আমার কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিল। ওদের কাণ্ড দেখে চাপা গলায় আমাকে জিগ্যেস করল, এসব কী ব্যাপার, ছোটে মালিক?
আমি এতদিন কোনও কথা ওকে জানাইনি–চাকরবাকরকে জানানোর কোনও মানে হয় না তাই। কিন্তু ওর প্রশ্নটা শোনামাত্রই আমার মনটা কীরকম যেন হয়ে গেল। ওকে সবকিছু খুলে বলতে ইচ্ছে করল।
সব কথা মনোযোগ দিয়ে শুনল বনবনিয়া। এবং পরমুহূর্তেই বারান্দা ছেড়ে এক ছুটে চলে গেল উঠোনে–বাপির কাছে।
টার্গেট তখন অশ্লীল ভাষায় বাপিকে হুমকি দিচ্ছিল। আর বাপি অসহায়ভাবে মুখ বুজে অপমানগুলো সহ্য করছিলেন।
নেকড়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে জাবর কাটছিল। ওর কাছাকাছি অচেনা দুজন শাগরেদ নোংরাভাবে হাসছিল।
টার্গেট হঠাৎই বাপির গলার কাছটা খামচে চেপে ধরল।
সঙ্গে-সঙ্গে বনবনিয়া চিৎকার করে উঠল, এ কোম্পানি, বাবুকো ছোড় দে! নেহি তো সব কুছু গড়বড় হয়ে যাবে।
নেকড়ে পাশ থেকে বনবনিয়াকে জোরালো এক লাথি কষাল।
আশ্চর্য! ওইটুকু পুঁচকে ছেলেটা ছিটকে পড়ে গেল না। ও সামান্য কাত হয়ে খর চোখে তাকাল নেকড়ের দিকে। ওর কাজল-টানা চোখ দিয়ে যেন আগুন বেরোচ্ছিল। ছোট-ছোট দু-হাত মাথার ওপরে তুলে অদ্ভুত কয়েকটা মুদ্রা দেখাল ছেলেটা। তারপর কোম্পানি হোশিয়ার! বলে চিৎকার করেই বাপিকে ঘিরে বনবন করে ঘুরপাক খেতে লাগল। ওর ধাক্কায় টার্গেট ছিটকে গেল, আর ছেলেটা ঘুরতেই লাগল।
ওর গতিবেগ বাড়তে বাড়তে এমন হল যে, শেষ পর্যন্ত একটা ঝাপসা কুয়াশার পিণ্ড বাপিকে ঘিরে পাক খাচ্ছিল। ভর দুপুরের কড়া রোদ তার ওপরে ঠিকরে পড়ে রামধনু তৈরি করে ফেলল।
আমরা অবাক হয়ে এসব কাণ্ড দেখতে লাগলাম।
নেকড়ের দল কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে পায়ে-পায়ে পিছিয়ে গেল।
ওরা সদর দরজা পেরিয়ে চলে যেতেই বনবনিয়া থামল। আমাদের সবার দিকে পালা করে তাকিয়ে হাসতে-হাসতে বলল, বদমাশ লোগ ভাগ গয়া।
বাপি থতমত খেয়ে জিগ্যেস করলেন, এসব তুই কী কাণ্ড করলি রে, বনবনিয়া!
বনবনিয়া হাত উলটে বলল, হম কুছু করেনি, বাবু। হম কুছু নেহি করতা। সব হো যাতা হ্যায়।
এ আবার কী ধরনের কথা! ও কিছু করে না, সব হয়ে যায়!
মা আনন্দে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, তুই গেঁয়ো ভূত, না ভগবান!
সেদিন আমরা বনবনিয়াকে ধরে কষে আদর করলাম। মা ওকে দুটো রসগোল্লা খাওয়ালেন। আমি আমার সবচেয়ে প্রিয় ভিডিয়ো গেম খেলনাটা ওকে দিয়ে দিলাম।
বাপি দুশ্চিন্তার সুরে বললেন, কাজটা বোধহয় তুই ঠিক করলি না রে, বনবনিয়া। ওরা আবার আসবে। ওরা খুব সাংঘাতিক লোক।
পাকা-পাকা কথায় দিব্যি জবাব দিল ছেলেটা, কোই চিন্তা নাই, বাবু। খতরনাক আদমির সঙ্গে খেলা করতে হামার দারুণ লাগে। আও, ছোটে মালিক, লিখাই-পঢ়াই-কা টাইম হো গয়া।
শেষ কথাটা আমাকে লক্ষ করে। যত দিন যাচ্ছে ততই দেখছি বনবনিয়া আমাকে আর দিদিকে যখন-তখন জ্ঞান দিচ্ছে। এখন যে আমার পড়তে বসার সময় সেটা আমি ভালো করেই জানি।
.
একদিন রাতে আমি একটা অদ্ভুত ব্যাপার দেখলাম।
বনবনিয়া আমার ঘরে মেঝেতে বিছানা করে শোয়। সেদিন রাতে ঘুমের ঘোরে আমি বিচ্ছিরি বিচ্ছিরি স্বপ্ন দেখছিলাম। হঠাৎই ঘুম ভেঙে গিয়ে দেখি সারা শরীর ঘামে ভিজে যাচ্ছে। একইসঙ্গে কেমন যেন ভয়-ভয় করছিল। তাই ভরসা খুঁজতে পাশ ফিরে মেঝের দিকে তাকালাম–যেখানটায় বনবনিয়া শোয়।
