বাজারের মোড়ের কাছে ওদের দলটা সবসময় আড্ডা মারে। কাউকে ওরা ভয় পায় না, কিন্তু ওদের সবাই ভয় পায়। ওই মোড় দিয়ে যারা যাতায়াত করে তাদের সবাইকেই দেখেছি ওদের কেমন সমীহ করে।
আর-একদিন টার্গেট আমাকে দেখতে পেয়ে ডাকল, বলল, তোর দিদির নাম যেন কী?
আমার মুখ-চোখ লাল হয়ে গেল। কোনওরকমে বললাম, মহুয়া।
ওরা দল বেঁধে হাসল। তারপর নেকড়ে বলল, মহুয়া বড় মিষ্টি।
আমি অন্ধ রাগে নেকড়ের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। নেকড়ে সঙ্গে-সঙ্গে ক্যারাটের ভঙ্গিতে আমাকে সপাটে এক লাথি কষাল।
লাথিটা পেটে এসে লাগতেই আমি ওঁক শব্দ করে ছিটকে পড়ে গেলাম রাস্তায়। মাথার ভেতরে আগুন জ্বলছিল, শরীরটা কেমন ঝিমঝিম করছিল। সেই অবস্থায় ঝাপসা চোখে দেখলাম, নেকড়ে দাঁত বের করে হাসতে হাসতে আমার দিকে এগিয়ে আসছে।
আমার খুব কাছে এসে দাঁড়াল নেকড়ে। চিবিয়ে-চিবিয়ে বলল, মহুয়া বড় মিষ্টি।
তারপর বুট পরা পায়ে পাগলের মতো এলোপাতাড়ি লাথি মারতে শুরু করল আমাকে।
অনেকক্ষণ পর কোনওরকমে উঠে দাঁড়িয়ে খোঁড়াতে-খোঁড়াতে বাড়ির পথ ধরলাম।
রাস্তার বহু লোক ঘটনাটা দেখেও কোনও ভ্রূক্ষেপ করেনি। আমার ক্ষতবিক্ষত আহত শরীরটাকে রাস্তা থেকে তোলার ব্যাপারেও কেউ সাহায্য করেনি। পথে একজন চেনা রিকশাওয়ালা তার সাইকেল রিকশা করে আমাকে বাড়ির গেটের কাছে পৌঁছে দিল। একবার শুধু বিড়বিড় করে লোকটা বলল, তুমি ওইটুকু ছেলে, তুমি কখনও ওদের সঙ্গে পারো! জোয়ান মানুষগুলোই সবকিছু মুখ বুজে সহ্য করছে…।
আমাকে দেখার পর বাড়িতে চিৎকার-চেঁচামেচি কান্না শুরু হল। দিদি তখন কাঁদতে কাঁদতে জানাল কলেজে যাওয়ার পথে লুম্পেনগুলো প্রায়ই নাকি ওকে নোংরা কথা বলে, অপমান করে।
মা দিশেহারা হয়ে গেলেন, বাপি কপাল চাপড়ে কাঁদতে শুরু করলেন। বাড়ি করে তিনি নিঃস্ব হয়ে গেছেন। ওদের টাকা তিনি কেমন করে মেটাবেন!
বাপিকে কখনও আমি এভাবে কাঁদতে দেখিনি।
সেদিন অনেক রাত পর্যন্ত আমরা চারটে প্রাণী ঘর অন্ধকার করে সর্বস্বান্তের মতো বসে রইলাম। আমাদের আর কোথাও যাওয়ার নেই, কিছু করার নেই।
এইরকম একটা অবস্থার মধ্যে বনবনিয়া আমাদের বাড়িতে এল।
একদিন সন্ধের মুখে বাপির হাত ধরে ও এসে হাজির হল।
বয়েস দশ-বারো বছর। গোলগাল শ্যামবর্ণ চেহারা। মুখটা দারুণ মিষ্টি। মাথা ন্যাড়া। ন্যাড়া মাথার পেছন দিকে মোটাসোটা একটা টিকি। ছানাবড়া চোখের কোলে কাজল। গায়ে লাল-সবুজ কাপড়ের তাপ্পি মারা একটা ঢোলা জামা ঠিক যেন ফুটবল প্লেয়ারের জার্সি। জামার নীচে কালো হাফ প্যান্টের খুব সামান্যই উঁকি মারছে। ওটুকু উঁকি না মারলে মনে হত ও প্যান্ট পরেনি।
বনবনিয়ার কপালে কাজলের টিপ, মাথায় একটা লাল কাপড়ের ফেট্টি বাঁধা। আর হাতে। গোলাপি রঙের প্লাস্টিকের একটা বাঁশি।
বাপি মাকে বললেন, তুমি বহুদিন ধরে ফাঁই ফরমাশ খাটার জন্যে একটা বাচ্চা ছেলের কথা বলছিলে–তাই ওকে নিয়ে এলাম। ওর নাম বনবনিয়া। তারপর বনবনিয়ার দিকে ফিরে : এই তোর মাইজি।
ছেলেটা এক গাল হেসে লাফিয়ে চলে গেল মায়ের কাছে। ন্যাড়া মাথা হেঁট করে মায়ের পা ছুঁয়ে বলল, পায় লাগু, মাজি।
মা খানিকটা অবাক হয়ে বাপিকে বললেন, ও বাংলা বলতে পারে না?
পারে–অল্প-অল্প।
বাপি, ওকে পেলে কোথায়? দিদি জিগ্যেস করল।
বাপি বনবনিয়াকে বললেন, তুই যা–এখন বাগানে গিয়ে খেলা কর।
ছেলেটা বাঁশি বাজাতে-বাজাতে ছুটে গেল বাগানের দিকে। বাগানে পৌঁছে হঠাৎই থমকে দাঁড়িয়ে হাতছানি দিল আমাকে লক্ষ করে, ওর দেশোয়ালি ভাষায় চেঁচিয়ে ডাকল, আও না, ছোটে মালিক, একসাথ খেলো…।
কেন জানি না, ওর হাতছানি আমি উপেক্ষা করতে পারলাম না। ওর সঙ্গে খেলার জন্যে ছুটে গেলাম বাগানে।
রাতে দিদির কাছে শুনলাম বনবনিয়াকে খুঁজে পাওয়ার কাহিনি।
জামতলার পশ্চিম দিকে দুটো পুরোনো কয়লা খনি আছে। বহু বছর আগেই ওই খনি দুটো থেকে কয়লা তোলার কাজ শেষ হয়ে গেছে। সেই জোড়া খনি আর তার লাগোয়া বড়সড় মাঠটা জুড়ে বছরের এসময়টায় একটা মেলা বসে। তাতে নানান জিনিস বিক্রি হয়। লাল-নীল কাপড়ে ম্যারাপ বেঁধে হরেকরকম খাবারের দোকান তৈরি হয়। কখনও কখনও নাগরদোলাও বসে।
মেলার মাঠ পেরিয়ে গেলে কুলি-কামিনদের বস্তি, তারও ওপাশে বড়-বড় গাছের জঙ্গল।
বাপি নেকড়েদের সমস্যা মেটানোর চেষ্টায় এক কুলি সর্দারের সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিলেন। কথাবার্তা বলে হতাশ হয়ে মেলার মাঠ পেরিয়ে ফিরে আসছিলেন।
পড়ন্ত বিকেলে আনমনা পায়ে উঁচু-নিচু পথ পেরিয়ে হেঁটে আসছিলেন বাপি। মেলার কলরোল দূর থেকে শোনা যাচ্ছিল, তবে বাপির কানে ঢুকছিল না। একটা খনির পিটের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় অদ্ভুত এক কান্নার আওয়াজ বাপির কানে আসে। বোধহয় খানির ভেতরে হাওয়া ঢুকে শব্দ হচ্ছিল। কিন্তু সেদিকে কান পাততে গিয়ে বাপি পড়ে যান মাটিতে। তাঁর মাথাটা কেমন ঘুরে যায়। হাতের ছাতাটা ছিটকে পড়ে দূরে। গরম হাওয়ার তাপ তখনও চোখে-মুখে বেশ টের পাচ্ছিলেন তিনি। নিজের দুরবস্থার কথা ভেবে বাপির প্রায় কান্না পেয়ে যায়। এই বিপদে তাকে বাঁচানোর কেউ নেই! ছাতাটা মাটি থেকে তুলে নিয়ে ক্ষোভে হতাশায় সেটা পাগলের মতো মাটিতে পিটতে থাকেন বাপি।
