বাপি উত্তেজিত হয়ে হাত নেড়ে বলতে চাইলেন, আপনাদের সঙ্গে কোনও কথা আমি বলতে চাই না। অসভ্যতার একটা সীমা আছে। আমি…।
সামনের ছেলেটা, যে বোধহয় পান পরাগ জাতীয় কিছু একটা চিবাচ্ছিল, শব্দ করে থুতু ছুঁড়ে দিল বাপির পায়ের কাছে। অল্পের জন্যে বাপির গায়ে লাগল না। তারপর বিচ্ছিরিরকম হেসে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, আমার নাম নেকড়ে। আপনি বহুত আনপঢ় আদমি আছেন–কোনও খবর রাখেন না। এই সাহেবপাড়া এরিয়াটা আমার। আমার সঙ্গে যারা আছে– বলে ঘুরে সঙ্গীদের দিকে তাকিয়ে আঙুল তুলে তাদের পরিচয় দিতে লাগল : এ হল নগা। এ হীরালাল। আর ওই যে পেছনে দাঁড়িয়ে–ওর নাম টার্গেট। ও মেশিন চালালে গুলি সবসময় টার্গেটে গিয়ে লাগে।
বাপি ফ্যালফ্যাল করে চরিত্রগুলোকে দেখতে লাগলেন। মা এর মধ্যে কখন যেন বাপির পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন।
নেকড়ে, টার্গেট কীসব অদ্ভুত নাম!
ওরা যে কারা সেটা আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম। কিন্তু জামতলায় এ ধরনের উপদ্রব ছিল না। বোধহয় অনেক কোয়ার্টার নিয়ে ছোটখাটো টাউনশিপ ছিল বলেই।
শুনুন, মিত্তিরবাবু– নেকড়ে ঠান্ডা চোখে বাপির দিকে তাকিয়ে বলল, তিরিশ হাজার টাকা দিলেই আপনার কেস সালটে যাবে। হীরালাল কাল সন্ধেবেলা আপনার কাছে নোট নিতে আসবে। মাল রেডি রাখবেন।
এবারে মা আর চুপ করে থাকতে পারলেন না। নেকড়েকে লক্ষ করে বললেন, এ কি মগের মুল্লুক না কি! হঠাৎ আপনাদের টাকা দিতে যাব কেন?
জেন্টসের কথায় লেডিজ নাক গলালে কেস আরও ক্যাচাল হয়ে যাবে। নেকড়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, হীরালাল কাল আসবে। নোট না দিলে.. কথা থামিয়ে টার্গেটের দিকে তাকাল নেকড়ে। চোখের ইশারা করে বলল, টার্গেট, একটু স্যাম্পেল শো করে দাও।
সঙ্গে-সঙ্গে জামার নীচে হাত ঢুকিয়ে কোমরের কাছ থেকে কী একটা নিয়ে হাত বের করল টার্গেট।
একটা কালো রিভলভার। রাস্তার আলো ওটার গা থেকে ঠিকরে পড়ছে।
রিভলভারটা সামনে উঁচিয়ে বাপির খুব কাছে এগিয়ে এল টার্গেট।
বাপি ঠকঠক করে কাঁপতে শুরু করলেন। মা একটা চিৎকার করে বাপিকে জাপটে ধরলেন, কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ওঁকে কিছু কোরো না। ওঁকে কিছু কোরো না। তোমরা টাকা পেয়ে যাবে।
অব আয়া হ্যায় লাইন মে। দাঁত খুঁটতে-খুঁটতে মন্তব্য করল হীরালাল।
টার্গেট রিভলভারটা বাপির একেবারে কপালে ঠেকিয়ে ধরে বলল, আঙুলে একটু চাপ দিলেই আপনি কোল ইন্ডিয়া কেন, হোল ইন্ডিয়া থেকে রিটায়ার হয়ে যাবেন।
বাপি হঠাৎই খসে পড়ে গেলেন মাটিতে। মা চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন। দিদি ঘর থেকে বেরিয়ে ছুটে এল বারান্দায়। আমিও ছুটে গেলাম বাপির কাছে। আমার গলার ভেতরটা কেমন শক্ত হয়ে যাচ্ছিল।
বাপি পড়ে যেতেই টার্গেট কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে হাসল। নেকড়ের দিকে তাকিয়ে বলল, বস, এ তো আমুল বাটার দেখছি। শাটার টেপার আগেই ছবি হয়ে গেল।
ওরা চারজন সদর দরজার দিকে হাঁটা দিল।
গেট পেরিয়ে বেরোনোর সময় নগা বলল, কাল সাতটায় আমি আর হীরু আসব, মাল রেডি রাখবেন। থানা-পুলিশ করে কোনও লাভ নেই।
চারটে অপচ্ছায়া তিনটে সাইকেলে চড়ে চলে গেল।
আমরা ততক্ষণে মাথায়-মুখে জলের ঝাপটা দিয়ে বাপির জ্ঞান ফিরিয়ে এনেছি। নতুন বাড়িতে আসার আনন্দ আমাদের মন থেকে সেই মুহূর্তেই মুছে গেল।
.
এরপর বিপদ বাড়তেই থাকল।
বাড়ি তৈরি করার সময় বাপি কীরকম খোঁজখবর নিয়েছিলেন কে জানে! তখন বোধহয় নেকড়েদের কথা জানা যায়নি। এখন টাকা জোগাড় করার চেষ্টায় বাপি পাগলের মতো হয়ে গেলেন। বাপি আর মা মিলে কতজনকে যে ফোন করলেন তার কোনও হিসেব নেই। আমি আর দিদি লুকিয়ে লুকিয়ে ঠাকুরকে ডাকতে লাগলাম।
পরদিন ওরা এল। হীরালাল আর নগা।
বাপি ওদের হাতে পাঁচ হাজার টাকা তুলে দিয়ে করুণভাবে বললেন, এক দিনে এর বেশি জোগাড় করতে পারিনি। আমাকে আপনারা দয়া করে কটা দিন সময় দিন।
উত্তরে ওরা বাপিকে এক ধাক্কা দিয়ে যেসব ভাষা ব্যবহার করল তাতে আমার মনে হচ্ছিল দুটো শয়তানের টুটি টিপে ধরে বেধড়ক পেটাই। কিন্তু কল্পনা আর বাস্তব তো এক নয়!
ওরা যা-তা ভাষায় ওয়ার্নিং দিয়ে চলে গেল। বলে গেল সাতদিনের মধ্যে বাকি টাকা চাই। মেয়ে-বউয়ের সোনাদানা বেচে হলেও টাকাটা বাপিকে জোগাড় করতেই হবে। নইলে ওদের বস খেপে যাবে। তখন টার্গেট…।
বাপির দিকে রিভলভারের মতো করে আঙুল দেখিয়ে মুখে দুবার গুলি ছোঁড়ার নকল আওয়াজ করল হীরালাল। হেসে বলল, কেন বেফালতু খরচা হয়ে যাবেন, মশাই।
ওরা চলে যাওয়ার অনেকক্ষণ পরেও বাপি বাঁশপাতার মতো থরথর করে কাঁপছিলেন। আর মা সারাক্ষণ কোনও ভয় নেই! কোনও ভয় নেই! বলে কান্না চাপতে লাগলেন।
এলাকায় সামান্য খোঁজখবর নিতেই আমরা নেকড়ে সম্পর্কে যা জানার জেনে গেছি। অথচ আগে এসব খোঁজ পাইনি।
যখন আমি স্কুলে যাই, ওদের বাজারের মোড়ের কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। ওরা আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসে।
একদিন নগা আমাকে ডেকে বলল, অ্যাই ছোঁড়া, শোন। তোর বাপ আর নোট জোগাড় করতে পারল?
এর মধ্যে মায়ের গয়না বিক্রি করে বাপি ওদের আরও ছহাজার টাকা দিয়েছেন। তারপর কাকুতি-মিনতি করে আরও একমাস সময় পেয়েছেন।
আমি মাথা নেড়ে কোনওরকমে না বলেছি। তারপর তাড়াতাড়ি পা চালিয়ে চলে গেছি– যত তাড়াতাড়ি ওদের কাছ থেকে দুরে চলে যাওয়া যায়।
