.
রত্নাদির ডাকে হারিয়ে যাওয়া ঘুমিয়ে পড়া বকুলফুল আবার ফিরে এল আমার ভেতরে।
কফির কাপ সামনে রেখে অদ্ভুত এক বিষণ্ণতার হাত ধরে বসে রইলাম দুজনে। অনেক অর্থহীন কথা বললাম।
রত্নাদি পুরোনো দিনের পৃষ্ঠাগুলো খুলে বকুলফুলকে লোভ দেখাল আবার। সেই বিচিত্র দাম্পত্যজীবন লাস্যময় হাতছানি দিতে চাইল আমাকে।
আমি চোখের জল মুছে নিয়ে জড়ানো গলায় বললাম, রত্নাদি, আমি বিয়ে করেছি।
রত্নাদি স্থিরচিত্র হয়ে গেল পলকে। ওর ফরসা মুখের রক্তকণা কোথায় যেন উধাও হয়ে গেল। তারপরই ওর সুন্দর মুখের জ্যামিতি ভাঙচুর হয়ে ও কান্নায় ভেঙে পড়ল। এ কান্না ঠিক একটু আগের আবেগের কান্নার মতো নয়। এ কান্না যেন সর্বহারার লজ্জাহীন কান্না। টেবিলে ঝুঁকে পড়ে ফুলে-ফুলে কাঁদতে লাগল রত্নাদি।
অনেক-অনেকক্ষণ পর নিজেদের সামলে আমরা উঠে পড়লাম। মামুলি কিছু কথা বলে যে যার পথ ধরলাম। রত্নাদির শরীরটা সন্ধের আঁধারে মিশে যেতে লাগল। আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আমার দিদিভাইয়ের চলে যাওয়া দেখলাম।
আচ্ছা, আবার যদি তিন-চার বছর পর রত্নাদির সঙ্গে আমার দেখা হয় তা হলে কি আমরা আবার এরকম বিষণ্ণ হয়ে পড়ব? আমাদের অন্যরকম ভালোবাসার এই অদ্ভুত স্মৃতি আমার বুকের ভেতরের কবর খুঁড়ে আবার বেরিয়ে আসবে নিয়তির মতো?
হয়তো আসবে। সেদিনের সেই বকুলফুল বোধহয় একেবারে মূল্যহীন নয়। আমি জানি, যতবারই বকুলফুল সামনে এসে দাঁড়াবে, ততবারই এই বকুল দু-ফোঁটা চোখের জল ফেলে ওকে সত্যিকারের ভালোবাসবে।
বনবনিয়া
আমরা যখন খুব সমস্যার মধ্যে দিন কাটাচ্ছি ঠিক তখনই বম্বনিয়া ঢুকে পড়ল আমাদের জীবনে। আর ওইটুকু পুঁচকে দশ-বারো বছরের একটা বাচ্চা ছেলের কাছে আমরা সবাই যেন নতুন করে শিখলাম : বিপদে ভয় করতে নেই।
কয়লাখনি এলাকায় আমরা থাকি। আমরা বলতে বাপি, মা, আমার দিদি মহুয়া, আর আমি। বাপি কোল ইন্ডিয়া কোম্পানির অ্যাকাউন্ট্র ডিপার্টমেন্টে চাকরি করেন। বহু বছর আগে আমরা যখন কলকাতার আলমবাজারে থাকতাম তখন মা একটা প্রাইমারি স্কুলে ইংরেজি পড়াতেন। এখন চাকরি করেন না, তবে লেখালিখি করেন–সেসব লেখা কলকাতার নানান ম্যাগাজিনে বেরোয়। এ অঞ্চলের লোকেরা মায়ের লেখালিখির কথা জানে।
অফিস থেকে আমাদের কোয়ার্টার অনেকটা দূরে ছিল বলে বাপির যাতায়াতে বেশ কষ্ট হত। তা ছাড়া আমার স্কুলটাও বেশ ঘুরপথ ধরে যেতে হত। দিদি কলেজে যেত দুটো বাস পালটে, দুবার সাইকেল রিকশা চড়ে। এইসব অসুবিধের কথা ভেবে আমরা জামতলা এলাকা ছেড়ে সাহেবপাড়ায় চলে এসেছি। সাহেবপাড়ায় এক কালে নাকি সাহেবসুবোরা থাকত। এখনও সে-আমলের কয়েকটা বাড়ি-ঘর দেখলে কথাটা যে সত্যি সেটা বোঝা যায়।
সাহেবপাড়ায় ছোট জমি কিনে বাপি সুন্দর একটা বাড়ি করেছেন। কলকাতার আমাদের আত্মীয়স্বজন খুব একটা নেই। তা ছাড়া এ-জায়গাটা মা-বাপি দুজনেরই বেশ ভালো লেগে গেছে। তাই ওঁরা চেয়েছেন বাকি জীবনটা এখানেই কাটিয়ে দিতে। আর আমার বা দিদির বন্ধুবান্ধবও তো এখানে কম নেই।
গণ্ডগোলটা শুরু হল নতুন বাড়িতে আমরা চলে আসার পর।
একদিন সন্ধেবেলা অফিস থেকে ফিরে বাপি চায়ের কাপ হাতে বাইরের উঠোনে বসে আছেন, তিনটে সাইকেল আমাদের সদরে এসে থামল।
তিনটে সাইকেল থেকে নেমে পড়ল চারজন। জিনসের প্যান্ট, মাথায় কঁকড়া চুল, কোমরে বড় বকলস লাগানো বেল্ট, দুজনের আবার এক কানে একটা করে মাকড়ি।
ওদের মধ্যে একজন সুপুরি বা জর্দা গোছের কিছু একটা চিবাচ্ছিল। শব্দ করে একদলা লাল থুতু ফেলে বাপির দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, অ্যাই, আপনি রাসমোহন মিত্তির?
বিকেল মরে এলেও সন্ধের আঁধার তখনও নামেনি। আমি বাগানে ফুলগাছগুলোর কাছে ঘোরাঘুরি করছিলাম। সেখানে কয়েকটা ফড়িং উড়ছিল। আমি ওদের ওড়া দেখছিলাম। স্কুলের সায়েন্স টিচার প্রসাদবাবু বলেছেন, ফড়িং-এর দু-জোড়া ডানা সমান তালে নড়ে না–একজোড়া খুব ধীরে নড়ে, আর একজোড়া খুব তাড়াতাড়ি। একজোড়া ওড়ার গতি নিয়ন্ত্রণ করে, অন্য জোড়া ওড়ার দিক। ঠিক যেন নৌকোর দাঁড় আর হাল।
ছেলেগুলোকে প্রথমটা আমি তেমন নজর করে দেখিনি। কিন্তু ওই নোংরা ভঙ্গিতে বাপিকে প্রশ্ন করামাত্রই আমি ফড়িং ছেড়ে ওদের দিকে তাকালাম।
বাপি কেমন যেন থতমত খেয়ে বললেন, হ্যাঁ, আমিই রাসমোহন মিত্র। কী ব্যাপার বলুন?
লাথি মেরে সদর দরজা খুলে ফেলল ছেলেটা। ইট-পাতা পথ ধরে চার-পা এগিয়ে এসে মুচকি হেসে বলল, এখানে জমি পারচেজ করে বাড়ি বানালেন, আর আমাদের পারচেজ ট্যাক্সটা দেবেন না!
চায়ের কাপ-প্লেট বাপির হাতে ঠকঠক করে নড়ছিল। বাপি সেটা মেঝেতে নামিয়ে রেখে কোনওরকমে উঠে দাঁড়ালেন।
কীসের পারচেজ ট্যাক্স?
ন্যাকা ষষ্ঠী আমার! পেছন থেকে কানে মাকড়িওয়াল একজন মন্তব্য করল, পারচেজ ট্যাক্স জানেন না!
বাড়ির নাম রেখেছেন কেকা নিকেতন! ওটা পালটি করে ন্যাকা নিকেতন করে দিন। তিন নম্বর দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে মন্তব্য করল।
কেকা আমার ঠাকুমার নাম। গতবছর ঠাকুমা মারা গেছেন।
চিৎকার-চেঁচামেচিতে মা বারান্দায় চলে এসেছিলেন। দিদি হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান করছিল হারমোনিয়াম ফেলে চলে এসেছে জানলায়। পরদা সরিয়ে অসভ্য ছোটলোকগুলোকে দেখছে।
