অন্ধকারের মধ্যে আমরা ঘন হয়েছিলাম।
আমি কাঠ হয়ে মড়ার মতো পড়ে থাকলেও রত্নাদি চঞ্চল হয়ে পড়ছিল। বারবার বোনটি, বোনটি– বলে চুমুতে-চুমুতে আমাকে ভরিয়ে দিচ্ছিল। আর ওর হাত অবাধ্যভাবে যততত্র আমাকে আদর করছিল।
প্রথম দিকে রত্নাদির আদরের মধ্যে স্নেহের ভাব থাকলেও একটু পরেই সেটা পালটে গেল। ওর স্নেহের পোশাক ছেড়ে ভালোবাসা যেন আলতো করে বেরিয়ে এল বাইরে। তারপর ক্রমেই তা বেপরোয়া প্রগলভ হয়ে উঠল। বহুদিন ধরে বাঁধ দিয়ে আটকে রাখা নদীর জল বাঁধ ভাঙার পর যেভাবে পাগলপারা ছুটে যায়, রত্নাদির অবস্থাও যেন হল অনেকটা তাই।
বকুল বকুল–বোনটি আমার…বকুলফুল.. রত্নাদি বিড়বিড় করে বলছিল।
আর আমার ভেতর থেকে একটা অবাঞ্ছিত আমি ধীরে ধীরে জেগে উঠতে লাগল। একসময় শুনতে পেলাম, আদর খেতে-খেতে আমারই গলায় আমার মুখ দিয়ে কে যেন বলছে, রত্নাদি… দিদিভাই..আরও আদর করো আমাকে…।
বকুল…বকুলফুল…।
আদরে-আদরে আমায় শেষ করে দাও, দিদিভাই…।
প্রায় সারা রাত ধরে আমরা পাগলের মতো যা করেছিলাম পরদিন ঘুম থেকে উঠে সে কথা ভেবে একটা গ্লানিবোধ আমাকে আঁকড়ে ধরেছিল। অথচ আমার পাশটিতে আলুথালু বেশে শুয়ে থাকা রত্নাদির মুখে কী সুন্দর নিষ্পপ তৃপ্তির ছাপ!
সকাল আটটায় মেয়ের দল এসে আমাদের দুজনকে হইহই করে জাগিয়ে তুলেছিল। তারপর আবার হাসি-মশকরা মন্তব্য।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার হস্টেলের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে গেল সবাই। শুধু আমার আর তেমন করে ফেরা হল না।
কিন্তু না-ফেরা জীবনটাও আমার কাছে বোধহয় খুব একটা অপছন্দের ছিল না।
আমি সবসময় রত্নাদির কাছে কাছে থাকতাম। আর রত্নাদিও চাইত আমার কাছে থাকতে। অন্যান্য মেয়ের কাছ থেকে এরকম মন্তব্যও শুনতাম, ওরা দেখছি নন্দনা আর শুক্লাদিকেও ছাড়িয়ে গেল। কিন্তু ভ্রূক্ষেপ করার কোনও প্রশ্নই ছিল না।
আমার সামান্য জ্বর হলে রত্নাদি রাত জেগে শিয়রে বসে আমার সেবা করত। দু-বেলা আমাকে নিয়ম করে হরলিক্স তৈরি করে দিত। পরীক্ষার সময় ডাব আর টিফিন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত কলেজের দোতলার বারান্দায়। কোনও কারণে কলেজ থেকে আমার ফিরতে দেরি হলে হস্টেলের দরজার কাছে চুপচাপ দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করত। আমি ছুটিতে বাড়ি গেলে ঘন-ঘন চিঠি দিত।
সব মিলিয়ে আমাকে ভালোবাসার ব্যাপারে রত্নাদি লজ্জাহীন হয়ে পড়েছিল।
রত্নাদির এই ভালোবাসা, যত্ন, আদর–সবই আমার ভালো লাগত। বাড়ি থেকে এত দুরে এসে আপন করে কাউকে পাওয়া কিছু কম নয়। আমি যেন সত্যি একটা আশ্রয় পেয়েছিলাম রত্নাদির কাছে। আমাদের রাতের ভালোবাসা যেমন মিথ্যে ছিল না, দিনের ভালোবাসাও তাই। প্রথম দিকে রাতে রত্নাদির আদরের সময় আমি ভাবতাম রতীন আমাকে আদর করছে। পরে আমি সরাসরি রত্নাদিকেই ভাবতে পারতাম।
সত্যিই বড় অদ্ভুতভাবে কেটে যাচ্ছিল দিনগুলি।
এইভাবে দেখতে-দেখতে একটা বছর পেরিয়ে গেল।
রত্নাদির হস্টেলের পালা শেষ হয়ে এল, আর আমি ফার্স্ট ইয়ার থেকে সেকেন্ড ইয়ারে উঠলাম।
কিছুদিন ধরেই মনের ওপরে একটা চাপ পড়ছিল, তার প্রকট ছাপ ফুটে উঠেছিল চোখেমুখে। আমি, নন্দনা, শুক্লাদি আর রত্নাদি আমাদের সবারই একই দশা। যেন ফাঁসির দিন শিগগিরই এগিয়ে আসছে।
একটা অদ্ভুত আতঙ্কে আমি সবসময় রত্নাদির খুব কাছাকাছি থাকতে লাগলাম। এমনিতে সপ্তাহে দু-তিনদিন ওর কাছে গিয়ে শুতাম–এখন সেটা প্রায় রোজকার ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল।
অন্ধকারে চোখের জল ফেলতে-ফেলতে রত্নাদির বলে, বকুলফুল, এখান থেকে চলে যাওয়ার আগে আমার মরে যেতে ইচ্ছে করছে।
আমি দিদিভাইয়ের চোখের জল মুছিয়ে দিতে গিয়ে কেঁদে ফেলি নিজেই ও দিদিভাই, আমাকে ছেড়ে তুমি কিছুতেই যেয়ো না।
কয়েকটা দিন এভাবে কাটতে না কাটতেই রত্নাদির দিন ফুরোল।
ওর চলে যাওয়ার দিন আমি একেবারে পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। মেয়েরা আমাকে ধরে রাখতে পারছিল না। কেঁদে চিৎকার করে আমি রত্নাদির ট্যাক্সির দরজায় আছড়ে পড়ছিলাম বারবার। আর ট্যাক্সির ভেতরে ওর বাবার কাঁধে মাথা রেখে রত্নাদি হাউহাউ করে কাঁদছিল।
ট্যাক্সিটা সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে যেতেই আমি নাকি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম।
এরপর স্বাভাবিক হয়ে উঠতে আমার প্রায় একমাস সময় লেগেছিল।
নতুন থার্ড ইয়ারে ওঠা অস্মিতা, জয়শ্রী, চন্দ্রাদিরা আমার অবস্থা দেখে অন্য কারও সঙ্গে দিদিভাই-বোনটি পাতানোর পরামর্শও আমাকে দিয়েছিল, কিন্তু আমি রাজি হইনি। নতুন করে কষ্ট পেতে আর আমি রাজি নই।
কিন্তু যতই দিন যেতে লাগল ততই আমি ভেতর থেকে বদলে যেতে শুরু করলাম। শুক্লাদি চলে যাওয়ার দিন আমি ঘর ছেড়ে বেরোইনি। নন্দনা আর শুক্লাদির হাহাকার কান্না আমাকে পাগল করে দিচ্ছিল। কিন্তু আমি কানে আঙুল চেপে পাথর হয়ে পড়েছিলাম।
এরপর একদিন মনে হল রত্নাদির সঙ্গে দিদিভাই-বোনটি ব্যাপারটা আমার নয়–অন্য কোনও বকুলের হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে-সঙ্গে আমার ভেতরের দুটো বকুল ক্রমেই দূরে সরে যেতে লাগল।
এইভাবে একসময় একটা বকুল প্রায় হারিয়ে গেল। রত্নাদির চিঠি ওকে আর উতলা করে না। রত্নাদির কথা তেমন করে আর মনে পড়ে না ওর।
যে হারিয়ে গেল তার নাম বকুলফুল।
আর আমার ভেতরে যে পড়ে রইল সে শুধু বকুল।
