কাকলি তখন বলল, তোকে রত্নাদির ভীষণ পছন্দ। হস্টেলের সবাই এটা জানে। তাই তোদের দুজনের মধ্যে দিদিভাই-বোনটি পাতিয়ে দেওয়া হবে। আজ সন্ধেবেলা সেই ফাংশান–সব অ্যারেঞ্জমেন্ট করা হয়ে গেছে।
কাকলির কথায় আমি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। এ কোন নতুন র্যাগিং শুরু করল থার্ড ইয়ারের দিদিরা। আমার আর রত্নাদির সম্পর্কের মধ্যে নতুন কোন মাত্রা যোগ করবে আজ সন্ধের ফাংশান?
সারাদিন আমি আর ঘর ছেড়ে বেরোলাম না। নানা কথা ঘুরপাক খেতে লাগল মনের ভেতরে।
বিকেলে দাদা আমার সঙ্গে দেখা করতে এল। দাদাকে দেখে যতটা খুশি হওয়ার কথা ততটা খুশি হতে পারলাম না। দাদা চলে গেলে পর হস্টেলের ভেতর দিকের মাঠে চলে গেলাম।
আমাদের হস্টেল বিল্ডিংটা ইংরেজি ইউ অক্ষরের ধাঁচের। তারই অন্দরের কোলে ছোট মাপের একটা সবুজ মাঠ আছে। তার চারদিকে নানান ফুলগাছ। আমরা চাঁদা তুলে ফুলগাছ কিনি। ফুলের পরিচর্যা করি। সত্যেন্দ্র এই কাজে আমাদের সাহায্য করে। আমাদের ফাইফরমাশের জিনিসপত্র আনার ব্যাপারে ও আর বালেশ্বরই আমাদের ভরসা।
সন্ধে সামান্য গাঢ় হতেই আমি মাঠের কিনারে একটা করবী গাছের গোড়ায় চুপচাপ গিয়ে বসে পড়লাম। তারপর অনিচ্ছা সত্ত্বেও নন্দনা আর শুক্লাদির কথা ভাবতে লাগলাম। ওদের নিয়ে বেশ কিছু মজা আমার কানে এসেছে। সেগুলো সব সত্যি বলে বিশ্বাস করতে মন চায় না। তবে তার মধ্যে কমবেশি রোমাঞ্চও আছে।
শুনেছি, নন্দনা নাকি প্রায়ই রাতে ওর বিছানায় থাকে না–তিনতলায় শুক্লাদির কাছে গিয়ে শোয়। সকালবেলা ঘর ঝাট দিতে গিয়ে সারদামাসি ওদের বহুবার বেআব্রু অবস্থায় দেখেছে–তবে সুপারকে কিছু বলেনি।
এও শুনেছি, থার্ড ইয়ারের ঈশিতাদি একদিন ভীষণ তাড়াহুড়োর সময় স্নান করতে গিয়ে বাথরুম বন্ধ দেখে হইচই শুরু করে দিয়েছিল। কারণ, একটা বাথরুম নাকি আধঘণ্টা ধরে বন্ধ শুক্লাদি আর নন্দনা একসঙ্গে স্নান করছে। পাশের বাথরুমে মেয়েরা তখন সবে ঢুকে দরজা দিয়েছে। তাদের চেঁচামেচি, ঈশিতাদির রাগী মন্তব্য ইত্যাদির মাঝে শুক্লাদি নাকি দরজা খুলে ঈশিতাদিকে ডেকে নিয়েছে। বলেছে, আমাদের দেরি হবে–তুই বরং আয়, চট করে চান করে চলে যা–।
ঈশিতাদি সেই বাথরুমে ঢুকে স্নান সেরে নিতে বাধ্য হয়েছিল। সেটুকু সময়ে ও দিদিভাই আর বোনটি-কে যে অবস্থায় দেখেছে তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ থার্ড ইয়ারের দিদিদের কাছ থেকে চোরাপথে চুঁইয়ে ফার্স্ট ইয়ারের আমাদের কাছে এসে পৌঁছেছিল। এবং সেটুকু খবরই আমাদের গাল এবং কান লাল করে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট ছিল।
কিন্তু তার সঙ্গে-সঙ্গে কৌতূহলও কি মনের মধ্যে উঁকি মারেনি? সাধ হয়নি অ্যাডভেঞ্চারে গা ভাসিয়ে দেওয়ার? ঝরনার ভাষায় সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেন থেকে ফার্স্ট ক্লাস সিটিজেন হতে কি ইচ্ছে করেনি?
আমাদের অনেকের মনেই বোধহয় এই গোপন ইচ্ছে উঁকিঝুঁকি মারে। তা নইলে নন্দনাকে সকলে এত হিংসে করে কেন?
মাঠে হাওয়া খেলছিল, গাছের পাতা উথালপাতাল করছিল। আর রান্নাঘরের দিক থেকে ফোড়নের ঝাঁঝ ভেসে আসছিল। একইসঙ্গে শুনতে পাচ্ছিলাম মাসিদের কথাবার্তার টুকরো, টেপরেকর্ডারে বাজানো গানের কলি।
হঠাৎই তন্দ্রাদি, কাকলি আর সোনালি আমাকে ডাকতে এল।
কী রে, তুই এখানে বসে আছিস! তন্দ্রাদি হেসে বলল, চল, চল সাড়ে ছটা বাজে। আর দেরি করলে সুপার এসে পড়বে। ওপরে সবাই রেডি হয়ে বসে আছে।
একটা দোলাচল নিয়ে উঠে পড়লাম।
হাসাহাসি করতে করতে ওরা আমাকে টেনে নিয়ে গেল তিনতলায় রত্নাদিদের ঘরে।
সেখানে গিয়ে দেখি রত্নাদির বিছানায় রজনীগন্ধা আর জুই ফুল ছড়ানো। ঘরের একপাশে ধূপকাঠি জ্বলছে। রত্নাদি কপালে চন্দনের টিপ পরে খোঁপায় ফুলের মালা লাগিয়ে বিছানায় একপাশে বসে আছে। আর বিছানা ঘিরে যথারীতি মেয়ের দঙ্গল।
আমাকে সাজাতে এগিয়ে এল সেকেন্ড ইয়ারের চন্দ্রা আর সুদক্ষিণা।
এক অদ্ভূত ঘোরের মধ্যে আচ্ছন্ন হয়ে রইলাম আমি।
সাজগোজের পর আমাকে বসিয়ে দেওয়া হল বিছানায় রত্নাদির মুখোমুখি। তারপর রজনীগন্ধার দুটো গোড়ে মালা ধরিয়ে দেওয়া হল দুজনের হাতে।
তারপর?
তারপর যা ভবিতব্য তা-ই হল। সকলের হাসি-ঠাট্টা উলুধ্বনির মধ্যে মালাবদল। রত্নাদি আমাকে বোনটি বলে ডাকল। উত্তরে আমাকে দিদিভাই বলে ডাকতে হল।
তারপর সবার শেষে, শুক্লাদি জানাল, পরস্পরকে চুমু খাওয়ার পালা।
র্যাগিং-এর দিনের ব্যাপারটা একরকম ছিল…আর আজ…অন্যরকম।
আমি কেমন যেন সঙ্কোচহীন হয়ে গেলাম। বেশ সপ্রতিভভাবেই চুমু খেলাম রত্নাদির ঠোঁটে।
সঙ্গে-সঙ্গে হইহুল্লোড় নাচ-গানের ঝড় উঠল। সেইসঙ্গে কত রসালো মন্তব্য।
ঝড় থামলে শুরু হল মিষ্টিমুখ।
সবাই মিষ্টি খেল। আমি রত্নাদিকে মিষ্টি খাইয়ে দিলাম, আর রত্নাদি আমাকে।
এইভাবে শেষ হল আমাদের ঝোলানো-র অনুষ্ঠান।
সে-রাতে, বলাবাহুল্য, রত্নাদির বিছানায় রত্নাদির সঙ্গে আমাকে শুতে হয়েছিল। ফুলশয্যার রাতের অভিজ্ঞতা আমার সেই প্রথম।
গোটা ঘরটা আমাদের ছেড়ে দিয়ে ঘর অন্ধকার করে দিয়ে অন্য মেয়েরা চলে গেল। রত্নাদি বেশ স্বচ্ছন্দ ভঙ্গিতে দরজায় খিল তুলে দিল।
আমাদের আজ রাতে খাওয়া বারণ কারণ এটাই নাকি নিয়ম। চলে যাওয়ার আগে তন্দ্রাদি হেসে বলে গেছে, আজ তোদের ডাইনিং হলে খাওয়া বারণ। যা খাওয়া-খাওয়ি সব তোদের ওই বিছানায় সারতে হবে।
