অন্ধকারে এক বিছানায় শুয়ে আমি আর শর্মিলা সে-রাতটা কাটিয়ে দিয়েছিলাম। আমার ভীষণ কান্না পাচ্ছিল, আর হস্টেলটাকে বন্দিনিবাস বলে মনে হচ্ছিল।
কিন্তু তারই মধ্যে রত্নাদির উষ্ণ ঠোঁটের ছোঁওয়া আমি টের পাচ্ছিলাম। আর সেইসঙ্গে তোর ঠোঁট দুটো কী মিষ্টি রে! কথাগুলো শুনতে পাচ্ছিলাম বারবার।
রতীন একবার আমার ঠোঁটে চুমু খেয়ে এইরকম কথা বলেছিল। নন্দনার ভাষায় রতীন আমার লাভার।
কিন্তু-রতীন আর রত্নাদি তো এক নয়!
দুটো-একটা মুহূর্তের জন্যেও কি এক নয়?
*
রোববার দিনটা রীণাদি কোথায় যেন চলে যান।
সেই সাতসকালে বেরোন, আর ফিরে আসেন রাত আটটা নাগাদ। ফলে রোববার দিনটা আমাদের বেশ স্বাধীনভাবে হইহুল্লোড় করে কাটে। যে যার খুশি মতো গান করি, কবিতা বলি, নিজেদের মধ্যে খারাপ কথা চালাচালি করি, এমনকী পোশাক-আশাকেও একটু বেপরোয়া হয়ে যায় কেউ কেউ।
রীণাদি চলে গেলে ওঁর ঘরের দখল থার্ড ইয়ারের দিদিদের দিয়ে যান। ওঁর ঘরে মিউজিক সিস্টেম আর কালার টিভি আছে। সেগুলো চালিয়ে একটু আমোদ করলে উনি কিছু মনে করেন না।
রীণাদি বিয়ে করেননি কিংবা ডিভোর্সি। অন্তত শুন্য সিঁথি সেই কথাই বলে। কেউ-কেউ বলে, ওঁর কোনও ভালোবাসার লোক আছে–সে আবার নাকি বিবাহিত। আবার কেউ বলে রীণাদি একটু অদ্ভুত ধরনের, পুরুষদের পছন্দ করেন না। ছোটবেলায় নাকি কী একটা হয়েছিল। থার্ড ইয়ারের মৌসুমীদি নানান আত্মীয়ের ডালপালা মারফত ব্যাপারটা আবছাভাবে শুনেছে।
রীণাদির ঘরে বসে আমরা চার-পাঁচজন টিভি দেখছিলাম। তার মধ্যে শর্মিলাও ছিল। সেই রাতের পর থেকে ও আমার খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। আমার সঙ্গে বাড়ির নানা গল্প করে, মনের সুখ-দুঃখের কথা বলে।
সিরিয়াল দেখতে-দেখতে কী একটা মজার ব্যাপার দেখে আমরা হেসে উঠেছি, এমন সময় ঘরে রত্নাদি এসে হাজির।
এখন সবে সকাল নটা, কিন্তু এর মধ্যেই রত্নাদির স্নান শেষ। শ্যাম্পু করা চুল এখনও ভিজে। জানলা দিয়ে রোদের আভা মুখে এসে পড়েছে। মুখটা কী সুন্দর টলটলে দেখাচ্ছে।
ঘরে ঢুকেই রত্নাদি আমাকে ডাকল, অ্যাই বকুল, শোন।
আমি বাধ্য শান্তশিষ্ট বোনের মতো টিভি দেখা ছেড়ে রত্নাদির কাছে গেলাম। অন্য দু-একজন আড়চোখে আমার দিকে তাকাল।
রত্নাদি স্নেহের গলায় বলল, নটা বেজে গেল, এখনও ব্রেকফাস্ট খাসনি, এই করলে শরীর থাকবে! শিগগির নীচে যা, মঙ্গলামাসি গজগজ করছে।
আমি বললাম, শর্মিলাও খায়নি।
রত্নাদি শর্মিলাকে একবার দেখে নিয়েই আমাকে বলল, যা, ওকে নিয়ে খেতে চলে যা।
শর্মিলা উঠে এল আমার কাছে। আমরা দুজনে ঘর ছেড়ে চলে যাচ্ছি, রত্নাদি পেছন থেকে ডাকল : বকুল।
আমি ঘুরে তাকালাম রত্নাদির দিকে।
দুপুরে একবার আমার রুমে আসিস তো, দরকার আছে।
আচ্ছা।
আমি আর শর্মিলা নীচে নামছি, হঠাৎই গ্রাম থেকে আসা সরল সাদাসিধে মেয়েটা মন্তব্য করল, রত্নাদি তোমাকে খুব লাইক করে।
হু সংক্ষেপে বললাম আমি।
ব্যাপারটা আমি যে লক্ষ করিনি তা নয়। এ নিয়ে আমার রুমের কৃষ্ণা আর সোনালিও আমাকে দু-চারবার খেপিয়েছে। তা ছাড়া সেই রাতের র্যাগিং-এর পর রত্নাদি একা সন্ধেবেলা আমাকে দোতলার বারান্দায় ডেকে নিয়ে গিয়ে বলেছিল, বকুল, ওই ব্যাপারটায় কিছু মাইন্ড করিস না, হস্টেলে নতুন কেউ এলে তার সঙ্গে ওরকম একটু মজা করা হয়। তুই ওসব ভুলে যাস।
রত্নাদির বলার মধ্যে এক অদ্ভুত নম্রতা ছিল। সন্ধের আঁধারে কঁঠালাপ ফুলের গন্ধ মাখা বাতাসে আমি সেই নম্রতার ছোঁয়া পেয়েছিলাম।
এইসব ভাবতে-ভাবতেই একতলার ডাইনিং হলে এসে হাজির হলাম। সেখানে দুটো বড় বড় টেবিলে আট-দশজন মেয়ে বসে আছে, নিজেদের মধ্যে হাসি-ঠাট্টা-গল্প করছে।
নন্দনা আর শুক্লাদি পাশাপাশি বসেছিল। আমাকে দেখতে পেয়েই নন্দনা চেঁচিয়ে বলল, শুক্লাদি, বকুলকে জিগ্যেস করে দ্যাখো–ওর তো বাংলায় অনার্স, ও বাংলায় আমাদের চেয়ে অনেক স্ট্রং।
এতে সেকেন্ড ইয়ার আর থার্ড ইয়ারের তিন-চারজন দিদি একেবারে হইহই করে ঠিক বলেছিস, ঠিক বলেছিস! বলে উঠল।
শুক্লাদি তখন হেসে আমাকে জিগ্যেস করল, বল তো, আমাদের দারোয়ান দুজনের নামের সন্ধিবিচ্ছেদ কী হবে?
আমাদের হস্টেলে দুজন দারোয়ান : একজনের নাম সত্যেন্দ্র, আর-একজনের নাম বালেশ্বর। একজনের দেশ বিহার, আর একজনের উড়িষ্যা।
আমি বললাম, সত্য প্লাস ইন্দ্র সত্যেন্দ্র।
আর পরেরটা?
আমি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে বললাম, জানি না।
একদফা হাসির রোল উঠল ডাইনিং হলে।
তখন সেকেন্ড ইয়ারের অস্মিতাদি জিগ্যেস করল, সন্ধি না জানিস, সমাস আর ব্যাসবাক্য পারবি?
আমি বিরক্ত হয়ে জবাব দিলাম, না, পারব না। তোমরা বরং কে. সি.-কে জিগ্যেস করে নিয়ো–।
কে. সি. আমাদের বাংলা অনার্সের ক্লাস নেন। খুব ভালো পড়ান।
এক পশলা হইচই আর হাসির মধ্যে শুনতে পেলাম কে যেন বলল, আর কিছু বলিস না মাইরি, বকুল খচে ফায়ার হয়ে গেছে।
আমি আর শর্মিলা ব্রেকফাস্ট নিতে কিচেনের দিকে গেলাম। সেখানে দুপুরের রান্নাবান্না নিয়ে হস্টেলের দুই কাজের মাসি সারদামাসি আর মঙ্গলামাসি–এলাহি হিমশিম খাচ্ছে। থার্ড ইয়ার আর সেকেন্ড ইয়ারের তিনজন দিদি ওদের সাহায্য করছে।
সোনালি ওর খাওয়া শেষ করে চলে যাওয়ার সময় আমার পিঠে একটা টোকা মেরে গেল। বলল, বকুল, তোর কেয়ো কার্পিনটা আজ একটু নেব, আমারটা ফুরিয়ে গেছে
