সত্যিই নন্দনাকে এত সুন্দর দেখতে যে, আমরা অনেকেই হাঁ করে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। ঈশ্বর প্রচুর অবসর নিয়ে ওকে গড়ে তুলেছেন।
নন্দনার কথায় আমি ছোট্ট করে বললাম, দাদাকে আর মা-কে চিঠি লিখছি। আমার চিঠি পেলে মা চিন্তা করবে।
তোমার লাভার নেই?
একটু অস্বস্তি পেয়ে বললাম, আছে। তবে ওকে চিঠি দেওয়া একটু অসুবিধে…
নন্দনা হাসল। সামনের তক্তপোশের এক কোণে বসে পড়ল। পায়ের ওপর পা তুলে কিছুক্ষণ পা নাচাল। নূপুরের ছমছম শব্দ হতে লাগল। তারপর একসময় বলল, আমাকে তোমার বয়ফ্রেন্ডের ডিটেইল্সটা দিয়ো, আমি চিঠি পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করব।
এর মধ্যেই জেনেছি, হস্টেল সুপার রীণাদি খুব কড়া ধাতের মানুষ–নিয়মকানুনের এদিক ওদিক মোটেই বরদাস্ত করেন না। সেইজন্যেই বোধহয় নন্দনার কথায় আমার মুখে একটু অবাক ভাব ফুটে উঠেছিল। সেটা লক্ষ করে নন্দনা চোখ মটকে মাথা নেড়ে গম্ভীরভাবে বলল, রীণাদি কিচ্ছুটি টের পাবে না। ওকে ম্যানেজ করে তোমার লাভারের চিঠি কুরিয়ার সার্ভিসে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করব। একদম নো চিন্তা…।
নন্দনা একটু পরেই হিন্দি সিনেমার গান গুনগুন করতে করতে উঠে চলে গেল।
আমি চিঠি লেখা শুরু করলাম আবার। তখনও জানি না, সে-রাতে আমাকে নিয়ে থার্ড ইয়ারের দিদিরা কী কাণ্ড করবে।
মাঝরাতে হঠাৎই আমার ঘুম ভেঙে গেল।
দেখি ঘরে আলো জ্বলছে। আর মশারিটা কারা যেন খুলে দিয়েছে। মশার কামড়ে হাতে পায়ে চাকা-চাকা হয়ে ফুলে গেছে।
আমি জেগে উঠতেই রিনরিনে হাসির হুল্লোড় উঠল। চোখ পিটপিট করে দেখলাম, সেকেন্ড ইয়ার আর থার্ড ইয়ারের ছ-সাতজন দিদি আমার বিছানা ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। ওদের সঙ্গে তখনও আমার তেমন করে পরিচয় হয়নি। ওদের মধ্যে রত্নাদিও ছিল।
আমাদের রুমে আমরা ছজন ফার্স্ট ইয়ারের মেয়ে থাকি। ওদেরই মধ্যে কেউ বোধহয় ঘরের দরজা খুলে দিয়েছে। সেটা থার্ড ইয়ারের দিদিদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করেও হতে পারে, অথবা ভয়েও হতে পারে।
আমি ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসলাম। খেয়াল করে দেখি, ওরা পাশের ঘর থেকে হস্টেলে নতুন-আসা আর-একজন মেয়েকেও ধরে নিয়ে এসেছে। শুনেছি ওর নাম শর্মিলা–নন্দনা ওর রুমমেট।
আমাকে আর শর্মিলাকে নিয়ে এরপর যা শুরু হল, পরিভাষায় তার নাম র্যাগিং।
ঘরের দরজা বন্ধ করে দুটি হরিণশিশুকে ঘিরে ধরে চলল চিতাবাঘের দঙ্গলের ছেলেখেলা। তবে সব কথাবার্তাই বেশ চাপা গলায় হচ্ছিল, যেন রীণাদি শুনতে না পয়ে। অবশ্য রীণাদি মোটাসোটা গোলগাল মানুষ–ঘুমোনো তাঁর নেশার মতন। তার ওপর তার ঘর তিনতলায়–একেবারে কোণের দিকে।
প্রথমে আমাকে আদেশ করা হল ক্যাবারে নাচ নাচার জন্যে। আর শর্মিলাকে সাজতে হল ক্যাবারে নাচের মাতাল দর্শক। সেইসঙ্গে চলল আমাদের দুজনের নাইটি ধরে দিদিদের টানাটানি।
খুশিতে আর মজায় কেউ-কেউ একেবারে গড়িয়ে পড়ছিল। আর দু-একজন লালসায় টগবগ করে ওঠা দর্শকের মতো আমার শরীরের নানা জায়গায় ছোবল মারছিল।
নাচের পালা শেষ হলে দিদিরা আমাকে আর শর্মিলাকে ঝগড়ার অভিনয়ের নির্দেশ দিল। তাও আবার যে সে ঝগড়া নয়, ফিশফিশে চাপা গলায় ননদ-ভাজের ঝগড়া।
এসব আজগুবি অভিনয় করতে করতে আমার কান্না পেয়ে যাচ্ছিল, চোখ জ্বালা করছিল। শর্মিলার অবস্থা তো আরও করুণ! কিন্তু উপায় কী!
ঝগড়ার অভিনয়ের পর মুখ ভ্যাংচানোর কম্পিটিশান, খারাপ মেয়েদের মতো কদর্য অঙ্গভঙ্গি, গর্ভবতী বউয়ের হাঁটাচলার ঢং আরও কত কী যে করতে হয়েছিল!
আর সবার শেষে এল চুমু খাওয়ার পালা। আমাকে আর শর্মিলাকে পছন্দ করবে থার্ড ইয়ারের দুই দিদি। ওদের লাভার মনে করে আমাদের আবেগজর্জর চুমু খেতে হবে ওদের ঠোঁটে।
শর্মিলা গাঁয়ের সরল সাদাসিধে রোগাসোগা মেয়ে। বেচারি তো একেবারে কেঁদেই ফেলল।
ওকে কে পছন্দ করবে তাই নিয়ে দিদিদের মধ্যে ঠেলাঠেলি চলতে লাগল। শেষ পর্যন্ত একটু পুরুষালি চেহারার তন্দ্রাদি শর্মিলার কাছে এগিয়ে গেল। এত জোড়া চোখের সামনে ঘটে গেল সেই বিচিত্র ঘটনা। সবাই হেসে আকুল হয়ে এ ওর গায়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল। শর্মিলা একেবারে মুখ ঢেকে বসে পড়ল মেঝেতে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
তারপরই আমার পালা।
রত্নাদি আমাকে পছন্দ করে নিজে থেকেই সামনে এগিয়ে এল। আমি আড়ষ্টভাবে ওর কাছে এগিয়ে গিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরলাম, ওর সুন্দর ঠোঁটে ঠোঁট রাখলাম।
আমার ভেতর থেকে একটা বিতৃষ্ণা উথলে উঠছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও আমি রত্নাদির চাপা আবেগ টের পেয়েছিলাম। ওর সুন্দর ফরসা মুখে লালচে আভা খেলে গিয়েছিল।
আমি সরে আসতেই রত্নাদি বলেছিল, তোর ঠোঁট দুটো কী মিষ্টি রে!
সঙ্গে-সঙ্গে সকলের খিলখিল হাসি।
এমন সময় একটা মেয়ে দরজার কাছ থেকে আচমকা উঁকি দিল ঘরে। বলল, অ্যাই, সুপার আসছে।
ব্যস! চোখের পলকে ঘর ফাঁকা। শুধু যাওয়ার আগে তন্দ্রাদি শাসনের ভঙ্গিতে বলে গেল, আলো নিভিয়ে সবাই শুয়ে পড়। সুপারের কাছে মুখ খুললে খোঁতা মুখ ভেঁতা করে দেব।
কে যেন ঘরের আলো নিভিয়ে দিল। আর-একজন দরজাটা বন্ধ করে দিল। কতকগুলো চঞ্চল পায়ের শব্দ মিলিয়ে গেল করিডর আর সিঁড়িতে।
বুঝলাম, দিদিরা সুপারের ঘুমের নেশার ওপরে ঠিক ভরসা করতে পারেনি। তাই ঠিকঠাক জায়গায় গুপ্তচর মোতায়েন করে এসেছিল।
