বাস-মিনিবাস-ট্যাক্সি-প্রাইভেট কারের জটলা পেরিয়ে আমরা কিড স্ট্রিটের দিকে এগোলাম। যেতে-যেতে রত্নাদি বলল, এইদিকটা একটু নিরিবিলি…।
একটা ছোট রেস্তোরাঁয় বসলাম দুজনে। রত্নাদি খাবারের অর্ডার দিয়ে বলল, তুই কিন্তু ব্যাগ খুলবি না। এতদিন পর দেখা হল…আমি খাওয়াচ্ছি…।
আমি প্রতিবাদ করতে পারলাম না। হস্টেলের সেই দিনগুলোতেও আমি রত্নাদির ওপরে কথা বলতে পারতাম না।
রত্নাদির কথাবার্তায় বুঝতে পারলাম ও আমার সিঁদুরের চিহ্ন দেখতে পায়নি।
আমি চাকরি করি ক্যামাক স্ট্রিটের একটা অফিসে। অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, সিঁদুরের রেখা অস্পষ্ট এবং গোপন থাকলে চাকরির ক্ষেত্রে অসুবিধে কম হয়। আর পুরুষদের মেলামেশার আগ্রহও যেন বেড়ে যায়।
রত্নাদি অনেক কথা বলছিল। ওর বাড়ির কথা, মায়ের কথা, ভাইয়ের কথা। ভাইয়ের একটা চাকরির ব্যাপারে পার্ক স্ট্রিটের কোন-একটা অফিসে খোঁজখবর করতে এসেছিল রত্নাদি। নইলে অফিসপাড়ায় ওর আসাই হয় না।
নানারকম গল্প করতে করতে রত্নাদি হঠাৎই বিষণ্ণ গলায় বলল, জানিস, আমার না কিচ্ছু ভালো লাগে না। হস্টেল ছেড়ে আসার পর থেকেই চারপাশটা কেমন কঁকা-ফাঁকা লাগে। তবে আজ তোর সঙ্গে দেখা হয়ে দারুণ লাগছে। মনে হচ্ছে, পুরোনো দিনগুলো ফিরে এসেছে। এক চিলতে হাসল রত্নাদি। ওর হাসিটা দারুণ মিষ্টি।
কথা বলতে বলতে এক অদ্ভুত আবেগে আমার হাত চেপে ধরল রত্নাদি, নরম গলায় প্রায় ফিশফিশ করে বলল, কেমন আছিস, বোনটি? দিদিভাইকে তোর আর মনে পড়ে না?
আমার ভেতরটা কেমন যেন হয়ে গেল। রেস্তোরাঁর টেবিল-চেয়ার, শৌখিন-বাতি, নকশা কাটা দেওয়াল–সব বনবন করে ঘুরপাক খেতে শুরু করল লাটুর মতো। সেই দিশেহারা আচ্ছন্ন অবস্থাতেও স্পষ্ট শুনতে পেলাম আমি রত্নাদির হাত চেপে ধরে বলছি, তুমি কেমন আছ, দিদিভাই?
আর রত্নাদির চোখের কোণ বেয়ে দু-ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে। ও ফিশফিশ করে বলল, বোনটি আমার..বকুলফুল…।
বকুলফুল!
এই ম্যাজিকশব্দটা ভেতরের কী এক ঝড়ে চোখের পলকে আমাকে উড়িয়ে নিয়ে গেল বেশ কয়েক বছর পেছনে–আমার হস্টেলের দিনগুলোতে।
.
হস্টেলের কথা ভাবলেই সবার আগে আমার কাঁঠালচাপা গাছটার কথা মনে পড়ে। পাঁচিল ঘেরা কম্পাউন্ডের মাঝে গাছ বলতে তো ওই একটাই! বাকি সব ছোটখাটো এলোমেলো সাধারণ ফুলগাছ।
সদরের বড় লোহার গেটটা পেরোলেই বাঁ-দিকে রাজকীয় অহঙ্কারে দাঁড়িয়ে কাঁঠালচাপা গাছটা। তার নীচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে কয়েকটা ফুল। আমি হস্টেলে প্রথম যখন পা রাখি তখন ওই ছন্নছাড়া ফুলগুলোই আমাকে অভ্যর্থনা জানিয়েছিল।
তিনতলা পুরোনো হস্টেল বিল্ডিংটা দেখে আমার সেলুলার জেলের কথা মনে পড়েছিল। তাই দাদা-বউদির হাত ধরে খুব কান্নাকাটি করেছিলাম। কিন্তু দাদা বুঝতে পেরেছিল হস্টেলে থেকে পড়াশোনা না করলে আমার পক্ষে পড়াশোনা করা অসম্ভব। আর বউদি চায়নি আমার লেখাপড়া হোক। হস্টেলের খরচ নিয়ে আমার সামনেই দাদাকে কম কথা শোনায়নি।
সেদিন আমাকে জড়িয়ে ধরে মাতৃস্নেহে আপন করে নিয়েছিলেন রীণাদি আমাদের হস্টেল সুপার। আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দাদা-বউদিকে বলেছিলেন, কোনও চিন্তা করবেন না–আজ থেকে ও আমাদের মেয়ে।
বেশ মনে আছে। সেদিন চার-পাঁচজন মেয়ে অনেক রাত পর্যন্ত আমাকে ভরসা দিয়েছিল, আমার সঙ্গে গল্প করেছিল, মজার কথা বলে আমাকে হাসাতে চেষ্টা করেছিল। আমাকে ছেড়ে ওরা কোথাও যায়নি।
ওদের মধ্যে রত্নাদিও ছিল। রত্নাদি তখন সবে থার্ড ইয়ারে উঠেছে। আর আমি ফার্স্ট ইয়ারের পড়াশোনা শুরু করতে চলেছি।
কটা দিন পেরোতে না পেরোতেই আমার মনটা শান্ত হয়ে এল। আর তখনই সুটকেস থেকে ইনল্যান্ড লেটার বের করে দাদাকে আর মা-কে চিঠি লিখতে বসলাম। দাদা কলকাতায় থাকে, কিন্তু মা থাকে সুলুপে দেশের বাড়িতে। সেখানে রোজই নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। মায়ের কান্নাকাটিতেই দাদা আমাকে কলকাতায় পড়াতে নিয়ে এসেছে।
আমি একমনে ডেস্কে বসে চিঠি লিখছি, হঠাৎই পেছন থেকে পারফিউমের গন্ধ পেলাম। ঘুরে তাকাতেই দেখি ফার্স্ট ইয়ারের নন্দনা।
নন্দনা সবসময় খুব সেজে থাকে, দামি-দামি শাড়ি পরে, পায়ে রুপোর তৈরি ভারী নূপুর, আর ওর পারফিউমের খুব শখ। ও যখন হাঁটে তখন ছমছম করে মিষ্টি শব্দ হয়। শুনেছি ও নাকি শ্রীরামপুরের রাজপরিবারের মেয়ে। ভীষণ বড়লোক।
আমি চিঠি লেখায় এতই মগ্ন ছিলাম যে ওর নূপুরের শব্দ পাইনি।
কী, লাভারকে চিঠি লিখছ? নন্দনা প্রশ্ন করল।
নন্দনার কথাবার্তাই এইরকম। যা মনে হয় ফস করে তাই বলে দেয়। তাই অন্য বন্ধুরা ওকে সাবধান করে? হুটহাট করে যা খুশি তাই বলিস না। সেকেন্ড ইয়ার থার্ড ইয়ারের দিদিরা কোনদিন খেপে গিয়ে একটা কাণ্ড বাঁধিয়ে দেবে।
নন্দনা তাতে ঠোঁট উলটে জবাব দিয়েছিল, কী করব বল, অভ্যেস হয়ে গেছে। দিদিরা কী করবে না করবে ওসব আমি কেয়ার করি না।
তাতে আমার রুমমেট ঝরনা চাপা গলায় বলেছিল, কেয়ার করবে কেন? ওর সঙ্গে তো শুক্লাদির দিদিভাই-বোনটি আছে।
তার মানে? খানিক অবাক হয়ে ঝরনাকে প্রশ্ন করেছিলাম আমি।
ঝরনা চোখ মটকে বলেছিল, এখন না–পরে বলব। তারপর একটা কপট দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছে, আমাকে তো ভগবান ওর মতো রূপ দেয়নি, তাই আমাকে সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেন হয়েই থাকবে হবে।
