মাধুরীর শরীর থেকে মিষ্টি ঘ্রাণ টের পাচ্ছিল চন্দন। ওদের দুজনের মধ্যে আর মাত্র হাত কয়েক দূরত্ব। চন্দনের বুকের মধ্যে সেই পুরোনো কষ্টটা জেগে উঠছিল। চোখের নজর ঠিকঠাক কাজ করছিল না। ওর জীবনের শান্ত হ্রদে আঠারো বছর আগে একটা ঢিল পড়েছিল। মাধুরী এসেছিল। এতে ঢিলের কোনও কষ্ট হয় না। সে অতি দ্রুত ডুবে যায় হ্রদের জলের গভীরে। কিন্তু হ্রদে জেগে ওঠা তরঙ্গমালার যে কী কষ্ট! ওরা বারবার ছুটে যায় পাড়ের দিকে। মাথা কুটে ফিরে আসে। আবার যায়। আবার ফিরে আসে। শুধু যাওয়া-আসা চলতে থাকে।
আঠারো বছর ধরে হ্রদের পাড়ে মাথা কুটে মরেছে চন্দন। কিন্তু এখন অন্তত শেষ হোক ওর তরঙ্গের যন্ত্রণার জীবন!
মাধুরী, তোমাকে আমি পায়ের নখ থেকে মাথার চুল তক, আপাদমস্তক, এখনও ভালোবাসি
তেতো হাসল মাধুরী। বলল, জানো, আমার এই শরীরটা কতবার ব্যবহার হয়েছে? বারোয়ারি পান্থনিবাসের মতো কত পথিক
চন্দনের মধ্যে কী হয়ে গেল। এক পলকে হাত কয়েকের দূরত্ব কমিয়ে ফেলে ও মাধুরীর ঠোঁটে হাত রাখল। থামিয়ে দিল ওর কথা। বলল, তোমার শরীরটাই ব্যবহার হয়েছে–মন ব্যবহার হয়নি, মাধুরী।
ঘুমিয়ে-চলা মানুষের মতো ডান হাতটা শূন্যে তুলল মাধুরী। আর চন্দন উষ্ণ হাতে সেই হাত আঁকড়ে ধরল!
মাধুরী অস্ফুট স্বরে বলল, আমার মাথা আর কাজ করছে না…
চন্দনের মনে পড়ল ডোনোই-এর কথা? তেমন করে যদি চাওয়া যায়, তাহলে ঠিক পাওয়া যায়। এই বিশ্বাস কখনও নষ্ট হতে দিয়ো না।
ডোনোই চন্দনের হাতে হাত রেখেছিল। অদৃশ্য ইচ্ছাশক্তি প্রবাহিত হয়েছিল হাত থেকে হাতে। এখন চন্দন ধরে রেখেছে মাধুরীর নরম ফরসা হাত। ও প্রাণপণে চাইছে, আর কখনও যেন এই দুটো হাতের মধ্যে কোনও দূরত্ব তৈরি না হয়।
ডোনোই বলেছিল? যে-প্রাণী চিন্তা করতে পারে, তারই ইচ্ছাশক্তি আছে।
চন্দন তীব্র আকুলভাবে মনে মনে একটাই কথা উচ্চারণ করছিল ও তোমাকে চাই।
ওর হাতের মুঠোয় মাধুরীর হাত কেঁপে উঠল। আর একই সঙ্গে মাধুরী হঠাৎ আঠারো বছরের পুরোনো স্বরে বলে উঠল, চন্দন, চলো, আমরা নভোনি-নাইন-এ চলে যাই। এখানে আমার আর কিচ্ছু ভালো লাগছে না
চন্দন মাধুরীকে কাছে টানল। কোনওরকম ভূমিকা ছাড়াই গভীর চুমু খেল ওর ঠোঁটে। তারপর অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করে বলল, আমি জানতাম, মাধুরী, আমি জানতাম
ও ভাবছিল, কাল নিউজ মিডিয়ার লোকজন নতুন এই খবরটা শুনে কী সাংঘাতিকভাবেই না চমকে উঠবে!
বকুলফুলের দিনগুলি
এক-একজনের সঙ্গে হঠাৎ করে দেখা হয়ে গেলে মনের ভেতরে এক-একরকমের ঢেউ ওঠে।
কিন্তু রত্নাদির সঙ্গে প্রায় পাঁচ বছর পর আচমকা দেখা হতেই মনের ভেতরে যে-ঢেউ উথলে উঠল সেটা আমাকে ভয় পাইয়ে দিল।
কারণ, এই ঢেউটা আমি বুকের অনেক গভীরে অনেক গোপনতায় ঢেকে রেখেছিলাম– ঠিক কবর দেওয়ার মতো।
কিন্তু ওকে দেখামাত্রই বুঝলাম, কবর দেওয়া হতচ্ছাড়া জিনিসটা এখনও মরেনি। দিব্যি নড়েচড়ে মাথাচাড়া দিয়ে উঠল।
বকুল! তুই…!
বাস স্টপে আমাকে দেখামাত্রই রত্নাদির চোখমুখ খুশিতে ভেসে গেল। চোখের পলকে ওর বয়েস পাঁচ বছর কমে গেল। বাস স্টপের অত লোকের সামনে আমাকে একেবারে জড়িয়ে ধরল। তারপর আমার দুগালে দু-হাতের আঙুল ছুঁইয়ে বলল, তুই ঠিক সেই একইরকম আছিস…
সন্ধেবেলা পার্ক স্ট্রিটের বাস স্টপে মানুষজন কিছু কম থাকে না। তাদের সবার সামনে রত্নাদির এই উচ্ছ্বাস আমাকে বিব্রত করে দিল। আলতো করে ওর হাত সরিয়ে দিয়ে বললাম, তুমি কেমন আছ?
প্রশ্নটা করে রত্নাদিকে দেখছিলাম।
পাঁচটা বছর শরীরের ওপর দিয়ে গড়িয়ে গেলেও ব্যাপারটা ততটা বোঝা যায় না। রত্নাদিকে দেখতে সেই আগের মতোই সুন্দরী। ফরসা মুখে টানা-টানা চোখ। ডান গালে ছোট্ট তিল। সুঠাম শরীরে জড়ানো কালো-গোলাপি নকশার সিনথেটিক শাড়ি। কাঁধে লম্বা স্ট্র্যাপে ঝোলানো বাদামি ব্যাগ।
রত্নাদির মুখে একটা আলগা ক্লান্তির ছাপ লক্ষ করলাম। দেখে মনে হল, সারাদিন অফিসের কাজের শেষে বাড়ি ফেরার জন্যে বাস স্টপে এসে দাঁড়িয়েছে।
আমার প্রশ্নের উত্তরে রত্নাদি পালটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল : তুই কি বাড়ি পালটেছিস? তোকে আমি পরপর চারটে চিঠি দিয়েছিলাম…।
রত্নাদির চারটে চিঠিই আমি পেয়েছি, কিন্তু কোনও উত্তর দিইনি।
সেইজন্যেই মিথ্যে কথা বললাম, হ্যাঁ, বাড়ি পালটেছি। বছর চারেক হল কেষ্টপুরের দিকে চলে গেছি।
আগে আমি হাতিবাগানে থাকতাম। গতবছর বিয়ের পর দমদমের বাসিন্দা হয়েছি। আর রত্নাদির চিঠিগুলো আমি পেয়েছিলাম আজ থেকে প্রায় তিন-চার বছর আগে হাতিবাগানের বাড়িতে।
জানিস বকুল, হস্টেলের দিনগুলো আমি কিছুতেই ভুলতে পারি না…।
আমি ছোট্ট করে বললাম, হুঁ…আমারও মনে পড়ে…।
এ কথা বললাম বটে, আসলে বোধহয় দিনগুলো আমি ভুলতে চাই। এতদিন পর কয়েক মিনিটের জন্যে রত্নাদির সঙ্গে দেখা হল–সত্যি কথা বলে ওকে আমি আর কষ্ট দিতে চাই না।
রত্নাদি আমার হাত ধরে টান মারল, বলল, চল, কোথাও বসে একটু চা খাই। কোনও তাড়া শুনছি না ।
অনিচ্ছাসত্ত্বেও কেমন একটা ঘোরের মধ্যে আমি রত্নাদির সঙ্গে হাঁটা দিলাম। সেই হস্টেলের দিনগুলোর মতো রত্নাদি আমাকে ধীরে-ধীরে অধিকার করে ফেলছিল। মনে হচ্ছিল, এমন কোনও কোনও সম্পর্ক আছে যেগুলো সহজে মরে না। বুকের ভেতরে ওরা শীতঘুম ঘুমিয়ে থাকে সময় এলেই আবার জেগে ওঠে।
