চতুর্থ দিনে ফোনটা এল।
মাধুরী ভিজি সারকিট অফ করে রেখেছিল, তাই শুধু ওর গলা শোনা গেছে–ছবি দেখা যায়নি। সুতরাং চন্দনও ওর ভিজি সারকিট অন করেনি।
অপারেটর লাইন দেওয়ামাত্রই শোনা গেল মাধুরীর গলা। কোনওরকম ভূমিকা না করেই ও বলল, এত বছর পর কেন ফিরে এলে, চন্দন?
তোমার জন্যে। তোমাকে এখনও আমি ভালোবাসি—
এখনও?
হ্যাঁ, এখনও। বিশ্বাস করো।
মাধুরী ওর নেশা ধরানো বিখ্যাত হাসি হাসল। এখন এ-হাসি শুধু চন্দনের জন্য। তারপর ঠাট্টার সুরে বলল, তোমার আই. কিউ. দেখছি আগের চেয়েও অনেক কমে গেছে, চন্দন
আই. কিউ. হয়তো কমেছে–ভালোবাসা কমেনি। চন্দন শান্ত গলায় বলতে চাইল। কিন্তু ওর বুকের ভেতরটা কীরকম যেন করছিল।
এই পাগলামির কথা প্রেসকে বলে তুমি আমাকে দারুণ পাবলিসিটি দিয়েছ। তার জন্যে ধন্যবাদ। জানোই তো, আমার এই বয়েসে এ-লাইনে পাবলিসিটি কুড়িয়ে বাড়িয়েই বাঁচতে হয়।
প্রেসকে আমি মিথ্যে কিছু বলিনি।
কী ইয়ারকি মারছ, চন্দন! তুমি কি সত্যি সত্যি আমাকে বিয়ে করতে চাও নাকি? এত বছর পরে এসবের কোনও মানে হয় না। প্রথম প্রেমের অসুখ কখনও এতদিন থাকে না।
আমার অসুখ সারেনি, মাধুরী।
বাজে কথা ছাড়ো, চন্দন। তুমি সত্যি সত্যি কী চাও বলো তো! মাধুরীর গলা তীক্ষ্ণ হয়েছে, বেড়ে যাওয়া বয়েস হঠাৎই উঁকি মেরেছে সেখানে।
চন্দন শান্ত গলায় বলল, প্রথমত আমি তোমাকে চাই। দ্বিতীয়ত আমি তোমাকে চাই। তৃতীয়ত আমি তোমাকে চাই। শেষ পর্যন্ত তোমাকে চাই।
চন্দন, কী হচ্ছে! কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল মাধুরী। তারপর গলা শক্ত করে বলল, তুমি কেমন করে ভাবলে তোমাকে আমি বিয়ে করব? এখন তোমার পুঁজিতে সস্তা পাবলিসিটি ছাড়া আর কী আছে! আঠারো বছর আগে তোমার অন্তত যৌবন ছিল। এখন তাও নেই।
মাধুরী, তোমাকে একবার দেখতে ইচ্ছে করছে—
আমার ইচ্ছে করছে না।
প্লিজ, মাধুরী, একবার–একটিবার দেখা করো আমার সঙ্গে। আমি তোমার কাছে যাব–
ও-প্রান্ত চুপচাপ।
মাধুরী, তোমাকে আমি আঠারো বছর ধরে ভালোবেসেছি। আর তুমি-তুমি আমাকে আঠারো মিনিট সময় দিতে পারবে না!
কিছুক্ষণ অস্বস্তিকর নীরবতার পর মাধুরী বলল, ঠিক আছে। এসো দেখা করতে। তবে বিয়ে আমি তোমাকে করব না।
.
মাঝরাতের কাছাকাছি কলকাতা ছেড়ে বম্বে রওনা হল চন্দন। সোলার ফেডারেশন ওর জন্য গোপনে একটা জেট প্লেনের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। সকলের নজর এড়িয়ে সেই প্লেনে চড়ে বসেছে চন্দন। রিপোর্টাররা একবার এই খবর জানতে পারলেই সর্বনাশ! চন্দন প্লেনের জানলা দিয়ে বাইরের অন্ধকার দেখছিল। ওর মনে পড়ছিল আঠারো বছর আগের দিনগুলোর কথা। সেই মিষ্টি ক্ষণগুলোর কথা। মাধুরীর সঙ্গে ওর দূরত্ব সময়ের হিসেবে আর মাত্র পনেরো মিনিট।
প্লেনটা একটু সেকেলে মডেলেরসলিড ফুয়েল পাওয়ার্ড জেট। তবুও ষোলো মিনিটের মাথায় ওকে পৌঁছে দিল বম্বে এয়ারপোর্টে। মাধুরী গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিল। রুপোলি রঙের টারবাইন পাওয়ার্ড লিমুজিন। সেই গাড়ি চন্দনকে নিয়ে বাতাসের বেগে উড়িয়ে নিয়ে গেল মাধুরীর বিলাস বাংলোয়।
কী নেই সেখানে।
কৃত্রিম হ্রদ। তার শান্ত জলে ছোট ছোট খেলনা-নৌকো ভাসছে। তাদের ঘিরে রঙিন আলোকমালা। হ্রদ থেকে সবুজ তৃণভূমি মসৃণভাবে ঢাল তৈরি করে উঠে গেছে ওপরে। সেখানে রূপসির কপালে মনোরম টিপের মতো সুন্দরী এক বাংলো। ধবধবে সাদা তার রং।
অপরূপ পথ বেয়ে গাড়ি এসে দাঁড়াল বাংলোর সামনে। চন্দন নেমে পড়ল। এবং ঢুকে পড়ল আঠারো বছর আগের এক স্বপ্নের মধ্যে।
বড় বড় ঘর আর ফিনফিনে পরদা পেরিয়ে ও দেখতে পেল মাধুরীকে। একটা সোফায় স্বচ্ছন্দ ভঙ্গিতে বসে আছে। স্বপ্নের মতো। ভীষণ দামি এক পোশাক ওর শরীর ঢেকে রেখেছে। আর পোশাকের ভেতরের মেয়েটা–সেই আগের মতোই। চোখে কটাক্ষ, ভুরু সজীব, পুরু প্রাণবন্ত ঠোঁট। সব মিলিয়ে ওর বয়েস যেন বাড়েনি।
চন্দন খানিকটা দূর থেকেই দেখছিল মাধুরীকে।
মাধুরী!
কী দেখছ?
চন্দন হাত তুলে ক্ষণিক চুপ করতে বলল ওকে। তারপর অস্ফুটে উচ্চারণ করল, আমি স্বপ্ন দেখছি, মাধুরী। প্লিজ, আমাকে জাগিয়ে দিয়ো না–
তুমি বুড়িয়ে গেছ, চন্দন।
তেতাল্লিশে কেউ বুড়িয়ে যায় না। তবে তুমি ঠিক সেই আগের মতোই রয়ে গেছ।
তার জন্যে আমার ডাক্তারদের ধন্যবাদ দিও। কে বলবে আমার বয়েস চল্লিশ! তুমিও কসমেটিক সার্জারি করিয়ে নাও। খরচ যা লাগে আমি দেব। তখন আবার তুমি পঁচিশ বছরে ফিরে যাবে।
চন্দন আরও কাছে এগিয়ে এল। মাথা নাড়ল। বলল, গত আঠারোটা বছর আমি কিছুতেই আমার জীবন থেকে মুছে ফেলতে চাই না। সেই দিনগুলো আমি যে সবসময় তোমাকে নিয়েই ভেবেছি। তাই মনে রাখতে চাই।
মাধুরী কাঁধ ঝাঁকাল। বলল, সত্যি করে বলো তো, তোমার মতলবটা কী!
তোমাকে আমি বিয়ে করতে চাই।
ও খিলখিল করে হাসল। অসংখ্য হিরের কুচি যেন কেউ ঢেলে দিচ্ছে কোনও কাচের নলের ভেতরে। একসময় থামল মাধুরী, চোখের কোণ দিয়ে তাকাল ও আঠারো বছর আগে এই জেদের হয়তো মানে ছিল, আজ আর নেই। তাছাড়া লোকে বলবে, তুমি টাকার জন্যে আমাকে বিয়ে করছ। জানো তো, আমি এখন বেশ বড়লোক।
যে যা বলে বলুক। আমি তোমার টাকা চাই না। শুধু তোমাকে চাই।
মাধুরী উঠে পড়ল সোফা ছেড়ে। অনেক দূর থেকে ভেসে আসা গলায় বলল, চন্দন, চন্দন, আমাকে এই যে ফিরে পেতে চাইছ, এ তোমার নিছকই একটা জেদ। আঠারো বছর আগে তুমি যাকে ভালোবাসতে আমি মোটেই সেই মিষ্টি মেয়ে আর নই। আমি এই আঠারো বছরে আরও লোভী হয়েছি, আরও বুড়ি হয়েছি। আমাকে তুমি সইতে পারবে না, চন্দন।
