রাকেশ চিরিমার শুকনো ঠোঁটের ওপরে জিভ বুলিয়ে নিলেন। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, চন্দনের উত্তরে তিনি খুশি হতে পারেননি। তবে শেষ পর্যন্ত স্বীকার করলেন : হ্যাঁ, পাবলিসিটির এমন সুযোগ মাধুরী হাতছাড়া করবে না। কিন্তু কদ্দিন টিকবে আপনাদের বিয়ে? ছমাস, একবছর পাবলিসিটির ঢেউ থিতিয়ে গেলেই বিয়েতে ইতি পড়বে। তারপর আপনি আবার পথে বসবেন। আপনার মতো ভিখিরি স্বামী মাধুরীর কোনও কাজে লাগবে না।
না, ও আমাকে ছাড়বে না।
চন্দনের গলায় আস্থা ছিল। রাকেশ কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ রইলেন। তারপর বললেন, আপনি তাহলে খাল কেটে কুমির ডাকবেন বলেই ঠিক করেছেন? কী ব্যাপার বলুন তো, দাশগুপ্ত? আপনি কি ওকে বিয়ে করবেন বলে মা কালীর কাছে দিব্যি কেটেছেন?
চন্দন শান্ত গলায় বলল, ওসব ভগবানের চেয়ে আমি নিজেকে বেশি বিশ্বাস করি। কিন্তু আপনি কি এসব কথা বলার জন্যেই দেখা করতে এসেছেন?
রাকেশ চিরিমার একবার মাথা নাড়লেন। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর বললেন, না, আসলে আমি একটা অফার নিয়ে আপনার কাছে এসেছিলাম। আপনি তো এখন পৃথিবী বিখ্যাত। আপনার পাবলিসিটি আমার কোম্পানির কাজে আসবে। আমার কোম্পানির একজন ডাইরেক্টর দরকার, মাসে দু-কোটি করে আপাতত দেব। এখন তো মশাই দুনিয়ার সব মেয়ে আপনাকে বিয়ে করতে চাইবে। একবার কসমেটিক সার্জারি করালেই আপনার বয়স আবার সুড়সুড় করে পঁচিশে নেমে যাবে। তখন কাণ্ডটা দেখবেন! শুধু মাধুরীকে নিয়ে এই পাগলামি ছাড়ুন। এখানে একটা সুন্দরী মেয়ে দেখে বিয়ে-থা দিয়ে দেব। তখন দেখবেন, ওই নাইন না টেন গ্রহের সব ব্যাপার-স্যাপার দিব্যি ভুলে যাবেন।
না, আমার কোনও ইচ্ছে নেই।
মিস্টার দাশগুপ্ত, ভাববেন না আপনাকে আমি দয়া দেখাচ্ছি। আপনাকে পেলে সত্যিই আমার কোম্পানির সুবিধে হবে। তাছাড়া, এটাও সত্যি যে, মাধুরীর মতো মেয়ের খপ্পর থেকে আপনাকে বাঁচানো দরকার। আঠারো বছর আগে আমি অজান্তে আপনার ওপরে অবিচার করেছিলাম। তারও তো প্রায়শ্চিত্ত করা দরকার। সেইজন্যেই এই অফারটা–
সরি, মিস্টার চিরিমার। এখন আমার মাথায় মাধুরী ছাড়া অন্য কোনও চিন্তা নেই। আপনি অন্য লোক খুঁজুন। আপনার অ্যাডভাইসের জন্যে ধন্যবাদ।
রাকেশ চিরিমারের মুখ লাল হল। উঠে দাঁড়িয়ে কিছু একটা বলতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিলেন। তারপর ভারী গলায় বললেন, ঠিক আছে। তাহলে মাধুরীর কাছেই যান–একবার বাতি দেখতে পেলে শ্যামাপোকা কারও কথা মানে না। আমার ওপেন অফার রইল। প্লিজ হ্যাভ মাই ডিপেস্ট সিমপ্যাথি।
সেদিন বিকেলের প্রেস কনফারেন্সে মেয়েটির নাম বলল চন্দন। মাধুরী মিত্র। খবরটা পেয়ে নিউজ নেটওয়ার্ক টগবগ করে ফুটতে লাগল। একঘণ্টার মধ্যেই খবরটা ছড়িয়ে পড়ল সারা দুনিয়ায়।
পঁচিশ বছর ধরে ত্রিমাত্রিক চলচ্চিত্রের গ্ল্যামার কুইন মাধুরী মিত্রের জন্য চন্দন দাশগুপ্ত নভোটনি-নাইন-এর কলোনি থেকে ফিরে এসেছেন। চন্দন দাশগুপ্ত বলেন, আঠারো বছর আগে মাধুরীদেবী নেহাতই ছোটখাটো ভূমিকায় অভিনয় করতেন। ২৩১৯ সালে চন্দন দাশগুপ্তকে প্রত্যাখ্যান করে তিনি বম্বের প্রখ্যাত শিল্পপতি রাকেশ চিরিমারকে বিয়ে করেন। কিন্তু এইভাবে মাধুরীদেবী পাঁচবার বিয়ে করেও সংসারী হতে পারেননি।
এ-বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে চন্দন দাশগুপ্ত বলেন, আমি ওকে আঠারো বছর আগে যেমন ভালোবাসতাম, এখনও তাই বাসি। ওকে আমি বিয়ে করতে চাই।
এই প্রসঙ্গে বম্বেতে মাধুরীদেবীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনও মন্তব্য করতে চাননি।
তিনদিন মাধুরী চুপচাপ রইল। কারও সঙ্গে দেখা করল না। নিউজ মিডিয়াকে কোনও স্টেটমেন্ট দিল না। চন্দন ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে লাগল। আঠারো বছরের অপেক্ষা মানুষকে ধৈর্য ধরতে শেখায়। তাছাড়া নভোনি-নাইন-এ ও আর ডোনোই যখন বসন্তকালের বনানীর পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছিল, তখন ডোনোই বলেছিল, বন্ধু, যে তাড়াহুড়ো করে সে ইচ্ছের লড়াইয়ে বোকার মতো সব সুযোগসুবিধে জলাঞ্জলি দেয়।
একটি ভিনগ্রহী প্রজাতির শেষ যুগের প্রাণী ডোনোই। সেই প্রজাতির প্রায় সারা জীবনের অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা ছিল ডোনোই-এর মধ্যে। খুদে ভিনগ্রহীর উপদেশ মনে রেখে হোটেলের সুইট ছেড়ে বেরোল না চন্দন। ডোনোই কখনও চন্দনের ইচ্ছের ভালো-মন্দ নিয়ে মন্তব্য করেনি। শুধু দরকারি পরামর্শ দিয়েছে, উপদেশ দিয়েছে। আর শিখিয়েছে ইচ্ছেশক্তির ব্যবহার, কুশলতা।
চন্দনের সম্পর্কে আর কোনও নতুন তথ্য নিউজ মিডিয়া পেল না। চন্দনও ওদের আর কোনও নতুন খবর দিতে চায়নি। ফলে, স্বাভাবিক কারণেই, ওদের আগ্রহ গেল কমে। তৃতীয় দিন থেকেই প্রেস কনফারেন্সের আর কোনও দরকার হল না। চন্দন দাশগুপ্ত ফিরে এসেছে, বলেছে। মাধুরী মিত্রের প্রতি ওর আঠারো বছরের পুরোনো ভালোবাসার কথা। তারপর থেকেই ও বসে রয়েছে চুপচাপ শুধু অপেক্ষা করেছে।
শান্ত হয়ে বসে থাকতে চন্দনের কষ্ট হচ্ছিল। পৃথিবীতে এখন হেমন্তের শুরু। আর নভোনি নাইন-এ হিমশীতল শীতের হাহাকার। এখানে পাঁচশো কোটি মানুষের কর্মব্যস্ততা, হইচই। অথচ চন্দন একা। আঠারো বছর নিরিবিলি শান্ত জীবন কাটিয়ে ও যেন অন্যরকম হয়ে গেছে।
মাঝে মাঝে মনে হয়েছে, মাধুরীকে ফোন করলে কেমন হয়! ভিজিফোনের ডিজিটাল প্যানেলে আঙুল ছোঁয়ালেই বম্বে আর কলকাতা মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে। কিন্তু নিজেকে সংযত করেছে। চন্দন। আজ হোক, কাল হোক মাধুরী ওকে ফোন করবেই।
