ডোনোই শান্ত ধীর স্বরে চন্দনকে বলেছিল, বন্ধু, তেমন করে যদি চাওয়া যায়, তাহলে ঠিক পাওয়া যায়। এই বিশ্বাস কখনও নষ্ট হতে দিও না। দ্যাখো, আমি তো বরফে চাপা পড়ে মরেই যাচ্ছিলাম। আমি মনপ্রাণ দিয়ে চেয়েছিলাম তুমি এসে আমাকে খুঁজে বের করো। ব্যস, তুমি এলে, আমাকে বাঁচালে।
চন্দন তখন প্রতিবাদ করে বলেছে, কিন্তু ডোনোই, আমি তো তোমার মতো কাপাসিয়া নই! আমার মনে এত জোর নেই। আমি ইচ্ছে করলেই অন্যের ইচ্ছে বদলে দিতে পারি না।
ভুল, বন্ধু। যে প্রাণী চিন্তা করতে পারে, তারই ইচ্ছাশক্তি আছে। দেখি, তোমার হাতটা দাও, তোমাকে দেখিয়ে দিচ্ছি–
পনেরো বছর আগের কথা মনে পড়ল চন্দনের। ও তৃপ্তির হাসি হাসল। সারাজীবনে কোনও বন্ধু ডোনোই-এর মতো করে কখনও ওর হাত ধরেনি। ওর মনে পড়ল ডোনোই-এর সরু নরম হাতটার কথা। হাড় প্রায় নেই বললেই চলে। অথচ হাতটা ধরামাত্রই একটা অলৌকিক ঝাঁকুনি টের পেয়েছিল ও। এক অদ্ভুত শক্তি চিনচিন করে প্রবাহিত হয়ে এসেছিল চন্দনের শরীরে। তার পর বহু দিন ধরে ও টের পেয়েছিল সেই আশ্চর্য অনুভূতি। কিন্তু স্পর্শের সেই ক্ষণ থেকেই চন্দন বুঝতে পেরেছিল, ও জিতবেই। মাধুরী আর কারও নয়। আর কারও হতে পারে না।
*
পরদিন সকালে চন্দনের সঙ্গে একজন ভদ্রলোক দেখা করতে এলেন।
সেদিন বিকেলে আর একটা প্রেস কনফারেন্স হওয়ার কথা ছিল। সেইজন্য চন্দন বলে রেখেছিল আলাদাভাবে আর কোনও ইন্টারভিউ দেবে না। কিন্তু যিনি দেখা করতে এসেছেন তিনি নাছোড়বান্দা। সুতরাং শেষ পর্যন্ত হোটেলের রিসেপশান থেকে চন্দনকে ফোন করে জানাল যে, জনৈক রাকেশ চিরিমার ওর সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন।
নামটা যেন চেনা চেনা ঠেকল। চন্দন ফোনে বলল, ওপরে পাঠিয়ে দিন–
কয়েক মিনিট পরই রাকেশ চিরিমার চন্দনের ঘরের বেল বাজালেন। তারপর দরজা খোলাই আছে জেনে ঢুকে পড়লেন ঘরে।
মাথায় চন্দনের তুলনায় খাটো, মোটাসোটা, ফরসা রং, দাড়ি-গোঁফ নিখুঁত করে কামানো। ডান হাতের মাঝের আঙুলে একটা সুন্দর আংটি। তার পাথরটা ভিনগ্রহের বলেই মনে হল।
রাকেশ হাত বাড়িয়ে দিলেন। চন্দন হাত মেলাল। জিগ্যেস করল, কী ব্যাপার, বলুন–।
রাকেশ তার হাতে ধরা একটা নিউজফ্যাক্স দেখালেন। তার প্রথম পাতায় ছবি দিয়ে বড় করে চন্দনের ইন্টারভিউ ছাপা হয়েছে। সেটা আঙুল ঠুকে দেখিয়ে বললেন, মিস্টার দাশগুপ্ত, এটা পড়েই আমি বুঝতে পেরেছি মেয়েটা কে। আমি আপনাকে ইয়ে মানে সাবধান করতে এসেছি– বন্ধু হিসেবে। ওর সঙ্গে আপনি জড়াবেন না।
চন্দনের চোখে হিরের কুচি ঝিলিক দিল। জিগ্যেস করল, কেন জানতে পারি?
রাকেশ জড়ানো গলায় বললেন, মেয়েটা মেয়ে নয়, ডাইনির বাচ্চা। ও শুধু ছেলে ধরে আর ছিবড়ে করে ছেড়ে দেয়। আমি তো জানি। আপনি শুধু ওকে ভালোবেসেছিলেন। আর আমি….আমি ওকে বিয়ে করেছিলাম।
হ্যাঁ, আঠারো বছর আগে আপনিই ওকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিলেন।
না, মোটেই তা নয়– রাকেশ প্রতিবাদ জানালেন ৪ ও আমাকে বিয়ে করেছিল ওর কেরিয়ারের পক্ষে সুবিধে হবে ভেবে। তা যে হয়নি তা নয়। আপনি নভোটুনি-নাইন-এ রওনা হওয়ার দিন ওকে একটা চিঠি দিয়েছিলেন। সেই চিঠিটা দেখে আমি প্রথম জানতে পারি আপনার কথা। তার আগে কিছুই জানতাম না, বিশ্বাস করুন! ও সে-চিঠি আমাকে যখন দেখায় তখন আপনার নামে বহু কথা বলেছিল। সে-সব কথা আমি উচ্চারণ করতে পারব না, মিস্টার দাশগুপ্ত। শুধু ওর তখনকার হাসিটা মনে পড়লেই আমার অস্বস্তি হয়। আর বলতে গেলে সেই মুহূর্ত থেকেই আমাদের বিয়েটাতে চিড় ধরতে শুরু করে। পুরোপুরি ফাটল ধরতে অবশ্য বছর আড়াই লেগেছিল। ওকে আমি কারও কাছ থেকে ছিনিয়ে নিইনি, মিস্টার দাশগুপ্ত। ও-ই একরকম আমার গলায় ঝুলে পড়েছিল। বিশ্বাস করুন ।
বিশ্বাস করলাম।
রাকেশ চিরিমার রুমাল বুলিয়ে নিলেন কপালে। একটু দম নিয়ে বললেন, ওর অন্য বিয়ের গল্পও সেই একই। ওর কেরিয়ারের দিকে বরাবরই আমার নজর রয়েছে। ও বাঁচে স্রেফ নিজের জন্যে-মাধুরী মিত্রের জন্যে। আমাকে ও ডিভোর্স করেছিল মোহন রসতোগিকে বিয়ে করার জন্যে। রসতোগি বেচারার বয়েস হয়েছিল। তার ওপরে হার্টের ট্রাবল ছিল। বুকে বসানো ছিল পেসমেকার। ফিলিম স্টারকে বিয়ে করার আনন্দে ওর বোধহয় মাথার ঠিক ছিল না। একদিন সকালে চা খেতে খেতে মাধুরী হঠাৎই ওকে বলে, আমি চললাম। তোমার মতো বুড়োকে বিয়ে করে কোনও মজা নেই। ব্যস… দুপাশে হাত ছড়িয়ে করুণ হাসলেন চিরিমার। বললেন, রসতোগি সঙ্গে সঙ্গে হার্টফেল করেছিল। কিন্তু মাধুরীর তাতে কোনও প্রবলেম হয়নি। রসতোগির পর একে একে এসেছে সমীরণ দাশুগুপ্ত, অনুপম মহান্তি, রঞ্জিত কাপুর। মাধুরী মইয়ের ধাপে ধাপে পা রেখে পৌঁছে গেছে খ্যাতির চূড়ায়। সেই সঙ্গে পয়সাও কামিয়ে নিয়েছে দুহাতে। শুধু ওর চলার পথে পড়ে ছিল পাঁচটা স্বামীর ছিবড়ে। তেতো হাসি হাসলেন রাকেশ। নিজের বুকে আঙুল ঠুকে বললেন, তার মধ্যে একটা ছিবড়ে আপনার সামনে দাঁড়িয়ে এখন কথা বলছে।
চন্দন কাধ আঁকিয়ে বলল, মাধুরীর পুরোনো ব্যাপার নিয়ে আমার কোনও মাথাব্যথা নেই।
আপনি কি সত্যি সত্যি ভাবছেন মাধুরী আপনাকে বিয়ে করবে?
হ্যাঁ, বিয়ের কথায় ও একেবারে লাফিয়ে উঠবে। বিশেষ করে আমাকে এখন বিয়ে করলে ও জোর পাবলিসিটি পাবে। কাগজে বড় বড় হেডলাইন ছাপা হবে : পাঁচবার ঘর-ভাঙা রমণী এবারে তার প্রথম প্রেমিকের ঘরণী হতে চলেছে।
