সবাইকে চমকে দিয়ে চন্দন নির্লিপ্ত গলায় বলল, না, বিয়ে ও করেছে—
বিয়ে করেছে! তাহলে–।
২৩২৪ সালে ওর দ্বিতীয় বিয়ের খবর আমি পাই। সেটা ডিভোর্স হয়ে যায় ২৩২৫-এ। তারপর ২৩২৭-এ আবার বিয়ে, ২৩২৯-এ ডিভোর্স। সে-বছরই আবার বিয়ে, আর ২৩৩৪-এ ডিভোর্স। ২৩৩৫-এ শেষ বিয়ে, আর চার মাস আগে সেটা ডিভোর্স হয়ে গেছে। তারপর ওর আর কোনও বিয়ের খবর পাইনি।
রিপোর্টাররা মনে মনে হিসেব কষছিল, কোন বিখ্যাত মহিলা পাঁচবার বিয়ে করে পাঁচবারই ডিভোর্স করেছেন স্বামীকে। কিন্তু হিসেবটা খুব সহজ নয়। বিয়ে আর ডিভোর্সটা এখন আর কোনও ঘটনার মধ্যে পড়ে না। নেহাতই সাদামাঠা। তা সত্ত্বেও
এই বিয়ের খবর পাওয়ার পর আপনার মনের অবস্থা কী হত? হাল ছেড়ে দিতেন?
চন্দন মাথা নাড়ল? না, আমি টাকা জমিয়েই যাচ্ছিলাম–থামিনি। কারণ আমার কেন যেন মনে হত, ওর কোনও বিয়েই টিকবে না। ওকে তো আমি চিনি। এতগুলো বছর ধরে ও শুধু আমার শূন্যস্থান পূরণের চেষ্টা করেছে। কিন্তু তাতে লাভ হয়নি। হবেও না। কারণ একটা মানুষের সঙ্গে আর একটা মানুষের কখনও হুবহু মিল থাকে না। ওর পাঁচ-পাঁচটা বিয়ে আমি সহ্য করেছি। ছনম্বর বিয়েটা আর সহ্য করতে হবে না, ওটা আমার ভালো লাগবে। কারণ ছনম্বর বিয়েটা হবে আমার সঙ্গে।
এই মহিলা কে? মানে, ওঁর নামটা আমাদের বলবেন, মিস্টার দাশগুপ্ত?
ঠান্ডা হাসি হাসল চন্দন। বলল, এখনও নাম বলার সময় আসেনি। আপনাদের আর কোনও প্রশ্ন আছে?
.
চন্দনের প্রেস কনফারেন্স যখন শেষ হল তখন সন্ধে গাড়িয়ে গেছে। সাংবাদিকদের কাছে কিছুই লুকোয়নি ও : কত কষ্ট করে টাকা জমিয়েছে; কলোনির জীবন কেমন ছিল; কত লড়াই করে বেঁচে থাকতে হয়েছে সেখানে। যার জন্য ও এত কাণ্ড করেছে শুধু তার নামটা এখনও বলেনি।
ওরা সবাই চলে যাবার পর হোটেলের বিলাসবহুল সুইটের বারান্দায় দাঁড়িয়ে অন্ধকার কলকাতা দেখছিল চন্দন। এখানে-ওখানে হাইরাইজ বিল্ডিংয়ের আলো জোনাকির মতো জ্বলছে। আকাশপথে জেট প্লেন উড়ে যাচ্ছে ঘন ঘন। তাদের তীব্র আলো থেকে থেকেই অন্ধকার চিরে দিচ্ছে খুশিমতো। কোথা থেকে ভেসে আসছে যন্ত্রের শব্দ। নভোটনি-নাইন-এর কথা মনে পড়ছিল বারবার। গ্রহটা রুক্ষ ছিল, ঠান্ডা ছিল, কিন্তু যান্ত্রিক ছিল না। প্রকৃতির উষ্ণতা ছিল সেখানে।
চন্দনের যে না ফিরে কোনও উপায় ছিল না। একটা অদৃশ্য টান ওকে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে। অনেকটা মহাকর্ষের টানের মতো–যেটানের রহস্য এখনও সকলের অজানা।
ঘরে ঢুকে এল চন্দন। একটা সুইচ টিপে জানলার কাচ অস্বচ্ছ করে দিল। আপনমনেই হাসল ও। এখন নভোটনি-নাইন-এ শীতকাল। এখন সরীসৃপদের মতো শীতঘুমে লুকিয়ে পড়ার সময় সেখানে। পাহাড়ের মতো উঁচু নীলচে-সাদা বরফের তাল তুষারঝড়ে চলে বেড়ায় সেই গ্রহের মাটিতে। এখানকার ষোলো মাসে ওখানকার একবছর। তার মধ্যে আটমাসই শীত। তখন মাটিতে সুড়ঙ্গ খুঁড়ে সেঁধিয়ে যেতে হয় ইঁদুরের মতো–একটু উষ্ণতার জন্যে। আর বাকি আটমাসের মধ্যে মোটামুটি চারমাস বাসযোগ্য আবহাওয়া থাকে। কিন্তু এত প্রতিকূল অবস্থাতেও মানুষ লড়াই করতে পারে। চন্দন পেরেছে।
সেখানে ওর বন্ধুবান্ধবও ছিল। না, পৃথিবী থেকে যাওয়া অন্যান্য কলোনিবাসী নয়। তারা পরিশ্রমী ভালোমানুষ। চন্দন ভাবছিল, কাঁপাসিয়াদের কথা–নভোটনি-নাইন-এর যারা বরাবরের বাসিন্দা।
পৃথিবী থেকে যে-সব সার্ভে প্রজেক্ট নেওয়া হয়েছিল তাতে নভোটনি-নাইন-এর কাঁপাসিয়াদের কথা জানা যায়নি। অবশ্য ওদের সংখ্যা কমতে কমতে মাত্র শপাঁচেক-এ এসে ঠেকেছিল। চন্দনের কাঁপাসিয়া বন্ধু ডোনোই সেরকমই বলেছিল ওকে। তাছাড়া চন্দনও কখনও একসঙ্গে একডজনের বেশি কাঁপাসিয়া দেখেনি। ওদের সবাকেই একই রকম দেখতে। উচ্চতায় ফুট তিনেক, রোগা ভঙ্গুর চেহারা, ছোট্ট মুখে বড় বড় দুটো বিষণ্ণ চোখ। ভীষণ ঠান্ডাতেও ওরা বিনা পোশাকে ঘুরে বেড়ায়। মাটির নিচে ছোট ছোট গুহায় ওরা বাস করে। এইরকমই একজন কাঁপাসিয়া ডোনোই চন্দনের বন্ধু হয়ে গিয়েছিল।
ডোনোই-এর কথা মনে পড়তেই চন্দন ঠোঁটে হাসল। তুষারঝড়ের মধ্যে একদিন ডোনোইকে খুঁজে পেয়েছিল ও। দেখে মনে হয়েছিল, বেঁচে নেই। কিন্তু ডোনোই বেঁচে উঠেছিল, সেরে উঠেছিল। সেবারে শীতকালটা ও চন্দনের কেবিনেই কাটিয়েছিল। খুব সামান্য কথা বলেছিল চন্দনের সঙ্গে। বরং বেশিরভাগ সময় ও চুপচাপ শুধু চন্দনের কথাই শুনত।
চন্দন ওকে সব কথাই বলেছিল। বলে মন হালকা করেছিল। বলেছিল নিজের বোকামির কথা, ওর অন্ধ বিশ্বাসের কথা যে মাধুরী এখনও ওকে ভালেবাসে, আর বলেছিল পৃথিবীতে ফিরে যাওয়ার পাগলকরা বাসনার কথা। মাধুরীকে যে কিছুতেই ও ভুলতে পারছে না।
সব শোনার পর, বোঝার পর, ডোনোই বলেছে, পৃথিবীতে তুমি ফিরে যাবে। দেখবে, মাধুরী তোমার কাছেই ফিরে আসবে আবার।
তখন মাধুরীর দ্বিতীয় বিয়ে চলছে। যেদিন টেলি-নিউজে মাধুরীর দ্বিতীয় বিয়ের খবর চন্দন জেনেছিল সেদিন ও একেবারে শেষ হয়ে গিয়েছিল। ভাগ্যিস ডোনোই ছিল কাছে! ওই ছোটখাটো কৃশকায় ভিনগ্রহীর মনে এত জোর কে জানত! ডোনোই ওকে সান্ত্বনা দিয়েছিল, আশ্বাস দিয়েছিল, ভরসা দিয়েছিল। তারপর থেকে চন্দনের প্রতিজ্ঞা একচুলও টলেনি। মাধুরী একটার পর একটা বিয়ে করেছে, বিয়ে তেতো হয়েছে, নষ্ট হয়েছে, শেষমেশ ভেঙে ছত্রখান হয়েছে কিন্তু চন্দন পরিশ্রম করে গেছে অবিচলভাবে। ওর মনে শুধু এই বিশ্বাস ছিল, ও পৃথিবীতে ফিরে এলে মাধুরীকে পাবে।
