না, কলোনি ছেড়ে কোনও মানুষের ফিরে আসাটা যে তত্ত্বগতভাবে অসম্ভব তা নয়। তবে খুব কম লোকই ফিরে আসতে চায়। আর যেকজনের মনে সে-ইচ্ছে জাগে, শর্তের কথা শুনলেই তারা পিছিয়ে যায়। শুধু চন্দন দাশগুপ্ত পিছিয়ে যায়নি।
ফিরে আসতে গেলে প্রথমেই সরকারি ঋণ মেটাতে হবে। সেই ঋণের একটা মোটামুটি হিসেব এইরকম : যাতায়াতের খরচ আট লক্ষ টাকা, জমির জন্য দু-লাখ টাকা, আর যন্ত্রপাতির জন্যও তাই–মোট বারো লক্ষ টাকা। এ ছাড়া রয়েছে দশ পার্সেন্ট হারে সুদ।
পৃথিবীতে যে দিব্যি সুখে-শান্তিতে আছে, যার পয়সাকড়ি সম্পত্তি আছে, সে কখনও কলোনিতে যাওয়ার জন্য নাম লেখাবে না। আর নিঃস্ব যে-মানুষটি ভিনগ্রহের কলোনিতে গিয়ে বাস করবে সে কী করে এত টাকা জোগাড় করবে! সেই কারণেই বন্ডের টাকা মিটিয়ে কলোনির কোনও মানুষ ফিরে আসতে পারেনি পৃথিবীতে।
চন্দনই প্রথম পারল। নভোটনি-নাইন-এ গিয়ে ঘড়ির কাঁটা ধরে ও পরিশ্রম করেছে, ঘাম ঝরিয়েছে। প্রতিবেশীদের চেয়ে অনেক বেশি ফসল ফলিয়েছে, যন্ত্রপাতি তৈরি করেছে তারপর বাড়তি জিনিস বিক্রি করেছে তাদের কাছে। সঞ্চয়ের টাকা কেন্দ্র করে পাঠিয়েছে পৃথিবীতে। টেলি ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে শেয়ার বাজারে লাগিয়েছে সেই টাকা। জুয়া খেলেছে ও। প্রাণপণ শ্রম দিয়ে কান্না-ঘাম-রক্ত দিয়ে জুয়া খেলেছে চন্দন। ওকে যে ফিরতেই হবে। ভালোবাসার মানুষের কাছে ওকে ফিরতেই হবে। তা সে যতদিন পরই হোক।
এইভাবে কেটে গেছে আঠারো বছর। বারো লক্ষ টাকা চুক্তিপণ দিয়ে চন্দন ফিরে এসেছে।
এখন সারা দুনিয়ার মানুষ জানতে চায়, ও কেন ফিরে এল, কার জন্য ফিরে এল।
ফিরে আসার পরদিনই হোটেলের ঘরে প্রেস কনফারেন্স ডাকল ও। সোলার ফেডারেশন ওর জন্য হোটেলের সেরা সুইট ব্যবস্থা করে দিয়েছে। এ ছাড়া ওর নিরাপত্তার জন্য রয়েছে স্পেশাল সিকিওরিটি গার্ডের দল। কর্তৃপক্ষ বাছাই করে কুড়িটি প্রথম সারির সংবাদ সংস্থার প্রতিনিধিকে চন্দনের সঙ্গে দেখা করার অনুমতি দিয়েছে।
চন্দন দাশগুপ্ত রিপোর্টারদের সামনে এল। পরনে জিক্স-এর জামা, জিল্স-এর প্যান্ট। পায়ে ছাইরঙের স্পোর্টস শু। আচরণের প্রতিটি কণায় আভিজাত্যের ছাপ। মুখে স্থির প্রতিজ্ঞা। বলিষ্ঠ হাতের শিরা-উপশিরা চেয়ে আছে। মাথার চুলে সাদাকালো ছবি। এখনকার আধুনিক প্রসাধন-পদ্ধতির যুগে কারও বয়েস বাড়ে না। কিন্তু চন্দনের যে প্রসাধন দরকার নেই। ওর চলাফেরার ভঙ্গিতে সেই ঔদ্ধত্য নজরে পড়ছে। আর চোখ দুটো যেন লাইটহাউসের তীব্র আলো, ঘুরে বেড়াচ্ছে ঘরের চারদিকে, প্রত্যেককে একবার করে খুঁটিয়ে দেখে নিচ্ছে।
ওর দিকে তাকিয়ে সকলেই অস্বস্তিতে পড়ল। মানুষের চোখে এমন দৃষ্টি ওরা আগে কখনও দেখেনি। কিন্তু কলোনি থেকে ফিরে আসা কোনও মানুষকেও তো ওরা আগে দেখেনি।
যান্ত্রিক হাসি হাসল চন্দন। বলল, গুড আফটারনুন। বলুন, আপনারা কী জানতে চান–
খুবই সাধারণ প্রশ্ন দিয়ে রিপোর্টারদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হল।
নভোনি-নাইন কীরকম গ্রহ, মিস্টার দাশগুপ্ত?
ঠান্ডা। টেমপারেচার কখনও পনেরো ডিগ্রির ওপরে ওঠে না। আর মাটি ভীষণ রুক্ষ। চাষবাস খুব মেহনতের ব্যাপার। স্রেফ বেঁচে থাকতে গেলেই ওখানে দিনরাত খাটতে হয়।
সইসাবুদ করে যখন ওখানে রওনা হন তখন এসব জানতেন?
মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল চন্দন : হ্যাঁ, জানতাম। আমি সবচেয়ে খারাপ গ্রহের খারাপ কলোনিতে যেতে চেয়েছিলাম।
সেখানে কত লোক আছে?
প্রায় বিশ হাজার। বুঝতেই পারছেন, সহজে কেউ নভোনি-নাইন-এ যেতে চায় না।
মিস্টার দাশগুপ্ত, কলোনিতে যাওয়ার চুক্তির মধ্যে একটা শর্ত আছে যে, ওখানে গিয়ে বিয়ে করতে হবে। আপনি কি বিয়ে করেছেন?
বিষণ্ণভাবে হাসল চন্দন : ওখানে পৌঁছোনোর এক সপ্তাহ পরেই বিয়ে করেছিলাম আমি। সেই ২৩১৯ সালেই। কিন্তু সে-বছরের শীতেই আমার স্ত্রী মারা যায়। কোনও ছেলেমেয়ে হয়নি আমাদের। পরে আর বিয়েও করিনি।
কবে আপনি ঠিক করলেন যে চুক্তিপণ দিয়ে পৃথিবীতে আবার ফিরে আসবেন? নভোটুনি-নাইন-এ যাওয়ার প্রায় আড়াই বছর পরে।
তার মানে প্রায় পনেরো-সাড়ে পনেরো বছর ধরে আপনি পৃথিবীতে ফিরে আসার জন্য পরিশ্রম করেছেন!
ব্যাপারটা আমারও বিশ্বাস হতে চায় না কিন্তু সত্যি।
ট্রান্সওয়ার্ল্ড নিউজ-এর এক তরুণ রিপোর্টার শেষ পর্যন্ত লাখ টাকার প্রশ্নের দিকে ঝুঁপ দিল ও কিন্তু আপনি কলোনি ছেড়ে ফিরে আসার ডিসিশন নিলেন কেন? স্পেসপোর্টে আপনি বলছিলেন, সুন্দরী এক তরুণীর জন্যে আপনি ফিরে এসেছেন ।
চন্দন হাসল, তবে সে-হাসিতে খুশি নেই। বলল। হ্যাঁ, তাই। আসলে যখন আমি পৃথিবী ছেড়ে চলে যাই তখন আমার বয়েস কম ছিল মাত্র পঁচিশ। তখন একটি মেয়েকে আমি ভালোবাসতাম। কিন্তু সে অন্য আর একজনকে বিয়ে করে। তখন ব্যর্থ প্রেমিক হয়ে রোমান্টিক জেদের বশে আমি নভোটনি-নাইন-এ যাবার জন্যে সই করে দিই। আড়াই বছর পর পৃথিবী থেকে পাওয়া টেলি-নিউজে জানতে পারি ওর ডিভোর্স হয়ে গেছে–অর্থাৎ ২৩২২ সালে। তখনই ঠিক করি, পৃথিবীতে আমি ফিরে আসব, ওকে বিয়ে করব–যে করে থোক, ওকে রাজি করাবই।
আর একজন সাংবাদিক বলল, তার মানে পুরোনো প্রেম জোড়া দেবার জন্যে আপনি পনেরো বছর ধরে লড়াই করে গেছেন। এর মধ্যে এই ভদ্রমহিলা যে আবার বিয়ে করেননি সেটা কী করে জানলেন?
