তা ছাড়া রসালো গুজবও রটেছিল একটা। সবাই বলাবলি করছিল, একটা মেয়ে নাকি জড়িয়ে আছে এর সঙ্গে। যদি তাই হয়, তাহলে এ তো শতাব্দীর সেরা প্রেমকাহিনি। মানুষটাকে নিয়ে মহাকাশযান কলকাতার স্পেসপোর্টে এসে নামার আগেই চন্দন দাশগুপ্ত বিখ্যাত হয়ে গেছে। কী করে যেন খবরটা রটে গেছে আগেভাগেই। শুধু খবর নয়, তার সঙ্গে গুজব, কিংবদন্তি, রূপকথার আরব্যরজনী।
ছায়াপথের একপ্রান্ত থেকে দুস্তর মহাকাশ পাড়ি দিয়ে ভেসে আসছিল নক্ষত্রযান রাকেশ। নক্ষত্রযানে এই প্রথম ছিল এক পৃথিবীযাত্রী–চন্দন। সুতরাং স্পেসপোর্টে যে সাংবাদিকদের আগাম ভিড় হবে সে আর আশ্চর্য কী!
আকাশমুখী তাকিয়ে নাক উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা নক্ষত্রযানের ল্যান্ডিং এলিভেটর যখন সেই মানুষটিকে নিয়ে জমির দিকে নেমে আসতে লাগল তখনই শুরু হয়ে গেল গুঞ্জন।
চন্দন দাশগুপ্তের চেহারা রূপকথার নায়কের মতোই বটে। লম্বা, ছিপছিপে, শক্তিমান। শান্ত মুখ, ঠোঁট পাতলা বিবর্ণ, এই মাঝ-চল্লিশ বয়েসেই মাথার নব্বইভাগ চুল সাদা। তবে চোয়ালের রেখা শক্ত, চোখের নজর স্বপ্নমাখা এবং গভীর। কিংবদন্তির সঙ্গে সবকিছুই যেন মিলে যাচ্ছে? চেহারা, মুখ, চোখ। হ্যাঁ, এই মানুষটাই পারে ভালোবাসায় ব্যর্থ হয়ে অভিমানে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে, তারপর নিছক সেই অপূর্ণ ভালোবাসায় শক্তিতে পরিশ্রম করে যেতে পারে আঠারো বছর!
ক্যামেরা চলছে। চলছে টিভি আর ভিডিয়ো ক্যামেরা। এপাশে-ওপাশে ফ্ল্যাশগানের ঝিলিক। প্রায় পাঁচশো সাংবাদিক আর ফটোগ্রাফারের জিভ শুকিয়ে এল, গলায় রবারের বল। একটু পরেই জানা যাবে শতাব্দীর সেরা খবর, রোমাঞ্চকর সত্যকাহিনি।
চন্দন ঠান্ডাভাবে হাসল, খবরের কাগজের লোকজনদের দিকে হাত নাড়ল। ওর চোখের পাতা পড়ল না। হাত দিয়ে ফ্ল্যাশগানের চড়া ঝিলিক আড়াল করল না। মুখও ফেরাল না ক্যামেরার দিক থেকে। অদ্ভুত এক শান্তভাব ওর চোখেমুখে, অস্বাভাবিক এক নিয়ন্ত্রণ কাজ করছে যেন সেখানে। সবাই ভেবেছিল, আঠারো বছর পর জন্মভূমিতে পা রেখে মানুষটা বাচ্চা ছেলের মতো অঝোরে কাঁদবে। হাঁটুগেড়ে বসে চুমু খাবে মাটিতে। কিন্তু ও কিছুই করল না। শুধু ঠোঁটে হাসল আর হাত নাড়ল।
গ্লোবাল নিউজ কাগজের রিপোর্টার সামনে এগিয়ে এল। ইন্টারভিউ নেওয়ার লটারিতে সে-ই জিতেছে। সুতরাং প্রথম ইন্টারভিউর সুযোগ তার।
পৃথিবীতে স্বাগত জানাই, মিস্টার দাশগুপ্ত। ফিরে এসে কেমন লাগছে?
খুব ভালো লাগছে। মাপা ভারী গলায় উত্তর দিল চন্দন। ওর সবকিছুর মধ্যেই যেন নিয়ন্ত্রণ কাজ করছে।
খবরের কাগজের এত লোক দেখে আপনি নিশ্চয়ই ঘাবড়ে যাননি?
একসঙ্গে এত লোক আমি আঠারো বছর ধরে দেখিনি। তবে তার জন্যে ঘাবড়ে যাওয়ার কী আছে!
মিস্টার দাশগুপ্ত, আপনি সবাইকে অবাক করে দিয়েছেন। চুক্তিপত্র সই করে বহু মানুষ পৃথিবী ছেড়ে পাড়ি দিয়েছে, কিন্তু ফিরে কেউই আসেনি–মানে, আপনি ছাড়া।
তাই? জানতাম না তো! হাসিটা সামান্য চওড়া করে সহজ গলায় জবাব দিল চন্দন।
আপনি না জানলে কী হবে, দুনিয়ার আর সবাই জানে। আমাদের দেশের কোটি কোটি মানুষ আপনার কথা শোনার জন্যে অপেক্ষা করছে। আপনার এই চলে যাওয়া-আর দেড়যুগ পরে ফিরে আসা–এর নেপথ্য কাহিনি জানার জন্যে ছটফট করছে সবাই। প্রথমত, আপনি পৃথিবী ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন কেন, মিস্টার দাশগুপ্ত? আবার নভোনি-নাইন থেকে ফিরেই বা এলেন কেন?
বিষণ্ণভাবে হাসল চন্দন। বলল, একটা মেয়ের জন্যে। সুন্দরী এক তরুণীর জন্যে। সে এখন খুব বিখ্যাত। ও আমাকে ভালোবাসত। আমিও ওকে ভালোবাসতাম। কিন্তু যখন ও আমাকে মানে, যেদিন থেকে ও আমাকে ফিরিয়ে দিল, সেদিনই আমি ঠিক করি, পৃথিবী ছেড়ে চলে যাব। এতদিন পর আমার মনে হয়েছে, ওর ভালোবাসা আবার ফিরে পাব আমি–তাই ফিরে এসেছি। একটু থেমে কপালে হাত বুলিয়ে নিল চন্দন, বলল, আমি খুব টায়ার্ড। যদি আমাকে এখন ছেড়ে দেন…পরে কথা বলব।
মিস্টার দাশগুপ্ত, প্লিজ, যদি ব্যাপারটা আর একটু খুলে বলেন–
লম্বা জার্নি করে এসেছি–একটু বিশ্রাম না নিতে পারলে মরে যাব। কাল বিকেলের প্রেস কনফারেন্সে আপনাদের সব প্রশ্নের জবাব দেব।
একথা বলেই ও ভিড় ঠেলে একটা গাড়িতে গিয়ে উঠল। স্পেশাল সিকিওরিটি গার্ডের দল ওকে নিরাপদে একটা ম্যাগনেটিক মোবাইলে তুলে দিল। স্পেসপোর্ট ছেড়ে দুরন্ত গতিতে ছুটে চলল ম্যাগ-মোবাইল।
.
নিউজ মিডিয়ার সঙ্গে জড়িত প্রায় প্রত্যেকেই এই সংক্ষিপ্ত ইন্টারভিউ দেখেছে অথবা তার খবর শুনেছে। এর ফল হয়েছে মারাত্মক। চন্দন দাশগুপ্তের ফিরে আসার খবর ছবি-টবিসমেত ছড়িয়ে পড়ছে গোটা দেশে। আগে চন্দনকে ঘিরে জনতার কৌতূহল ছিল, এখন সেটা দাঁড়িয়ে গেল প্রায় মনের অসুখে। ভালোবাসায় ব্যথা পেয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়া, তারপর দ্বিতীয় সুযোগের জন্য আঠারো বছর হাড়ভাঙা পরিশ্রম করা–এ যেন সেই আদ্যিকালের রূপকথার গল্প হাই-টেক চব্বিশ শতকের মাঝামাঝি আবার জীবন্ত হয়ে ফিরে এসেছে।
তা ছাড়া, ভিনগ্রহের কলোনিতে নাম লিখিয়ে, পরে চুক্তিমাফিক দাম মিটিয়ে কলোনি ছেড়ে পৃথিবীতে ফিরে আসা তো নেহাত সহজ কাজ নয়! সোলার ফেডারেশন নামের আন্তর্জাতিক একটি সংস্থা প্রায় একশো বছর আগে একটি প্রকল্প চালু করে ৪ ডিসট্যান্ট প্ল্যানেট কোলোনাইজেশন। ভিনগ্রহে কলোনি স্থাপন করে মানবসভ্যতা ছড়িয়ে দেওয়াই ছিল তাদের লক্ষ্য। ভিনগ্রহে গিয়ে বসতি স্থাপন করে সেখানকার পাকাপাকি বাসিন্দা হতে চায় এমন মানুষদের আহ্বান জানিয়েছিল তারা। শর্ত ছিল, বিনা খরচে সেইসব মানুষকে পৌঁছে দেওয়া হবে অন্য নক্ষত্ৰজগতের কোনও গ্রহে। তাদের যন্ত্রপাতি দেওয়া হবে, জমি দেওয়া হবে। বিনিময়ে তাদের শপথ করতে হবে যে, তারা সেখানেই বসবাস করবে চিরকালের জন্য বিয়ে করবে, মানুষের সংখ্যা বাড়িয়ে তুলবে মানবসভ্যতার স্বার্থে। গত একশো বছরে এই প্রকল্প মানবসভ্যতাকে ছড়িয়ে দিয়েছে ছায়াপথের নানা গ্রহে। মহাকাশে প্রায় পাঁচশো আলোকবর্ষ ব্যাসার্ধ জুড়ে এখন খুঁজে পাওয়া যাবে এরকমই নানা কলোনি। তবে সেইসব মানুষের কেউ ফিরে আসেনি–একমাত্র চন্দন ছাড়া।
