পরদিন ভোর হল রোজকার মতো। সূর্যও উঠল। কিন্তু রোজকার মতো পাখিরা আর ডাকল না। ফলে বেশ বেলাতেই বুধনের ঘুম ভাঙল। পাখিদের সে খেতে দিল, কিন্তু ওদের কাছ থেকে বিশেষ সাড়া পাওয়া গেল না। খাবার নিয়ে রোজকার মতো আর কাড়াকাড়ি করল না ওরা।
বুধন ঠিক করল, পাখি নিয়ে ফেরি করার টহল সেরে দুপুরে টাকাটা পাঠানোর ব্যবস্থা করতে পোস্ট-অফিসে যাবে। শিবুয়াকে সেইরকম বলে বেরিয়ে পড়ল সে।
এপাড়া-ওপাড়া ঘুরে বেলাবেলি আবার সেই প্রাইমারি স্কুলের সামনে। রোজকার মতো হইচই করে ছুটে এল কচি ছেলেমেয়ের দল। কিন্তু খাঁচাগুলোর কাছে এসেই ওরা থমকে দাঁড়াল। যেন একটা ধাক্কা খেয়েছে।
রাজা পাখি কোথায় গেল?
ছোট্ট ছেলেটির প্রশ্ন যেন বুধনের দিকে আঙুল তুলে অভিযোগ করল।
ওদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল, রাজা পাখি নেই, রাজা পাখি নেই। তারপর ওরা একই প্রশ্নে বুধনকে ছেকে ধরল, রাজা পাখি কোথায় গেল?
কেন যেন নিজেকে অপরাধীর মতো মনে হতে লাগল বুধনের। সে ছোট্ট করে জবাব দিল, রাজা পাখি বিক্রি হয়ে গেছে গো। পঞ্চাশ টাকায়।
পঞ্চাশ টাকায় কথাটা যতটা গর্বের সঙ্গে বলা উচিত ছিল ততটা গর্বের সঙ্গে বলতে পারল না বুধন। সে দেখল, লাল কালো সোয়েটার পরা গোলগাল মিষ্টি ছেলেটি মনমরা হয়ে চুপটি করে দাঁড়িয়ে। সে হঠাৎ বুধনকে লক্ষ করে অভিমানী গলায় বলে ওঠে, তুমি বাজে পাখিওলা। রাজা পাখি বিক্রি করে দেয়!
অন্য সবাই যেন মনের কথাটি খুঁজে পেয়ে সুর মেলায়, বাজে পাখিওলা! তোমার সব পাখি বাজে!
তারপর স্কুলের ঘণ্টা না-পড়তেই ওরা সবাই ছুটে চলে যায় বুধনকে ফেলে। রংবেরঙের অন্য পাখিগুলো ওদের যেন ধরে রাখতে পারে না।
ধীরে-ধীরে উঠে পড়ে বুধন। খাঁচাসমেত বাঁক কাঁধে তুলে নেয়। শরীরে এক অদ্ভুত ক্লান্তি। পাখিগুলোও সব চুপচাপ। দু-একবার শিস দিয়ে সে ওদের খুশি করার চেষ্টা করল, কিন্তু কোনও লাভ হল না। কেউ যেন বাণ মেরে ওদের বোবা করে দিয়েছে।
ক্লান্ত পায়ে বুধন ফিরে চলে ঘরের পথে। তার মনে তখনও অভিমানী ছেলেটির মুখ ভাসছে আর স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে তার অভিযোগ, তুমি বাজে পাখিওলা! রাজা পাখি বিক্রি করে দেয়।
নানান দোটানায় বুধন পাখিওলার দুপুরটা কেটে গেল। পঞ্চাশ টাকার নোটটা এখনও তার কোমরে খচখচ করছে। মুন্নার অসুখ কি এখন বেড়েছে না কমেছে?
ডাগদারসাব পারবে তো এ-অসুখ সারিয়ে তুলতে? এত চিন্তা সত্ত্বেও টাকাটা সে মানি-অর্ডার করতে পারেনি। কোথায় যেন একটা বাধা পেয়েছে।
এইরকম ভাবনায়-ভাবনায় বিকেল গড়িয়ে সন্ধে হয়। সন্ধে গড়িয়ে রাত। পাখিগুলোকে খেতে দিয়েছে বুধন, কিন্তু ওরা খায়নি। সেই সকালের খাবারই জমিয়ে রেখেছে। খাঁচার ওপরে কাপড় ঢাকা দিয়ে লণ্ঠন নিভিয়ে দিল বুধন। শুয়ে পড়ল। কিন্তু সহজে তার ঘুম এল না।
সারাটা রাত ছটফট করে জেগে কাটাল বুধন। তারপর ভোরের আলো ফাঁক-ফোকর দিয়ে নজরে পড়তেই সে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল। সোয়েটার পরে চাদর মুড়ি দিয়ে চুপিচুপি বেরিয়ে এল রাস্তায়। তারপর হনহন করে হাঁটা দিল সাহেবপাড়ার দিকে। একবার শুধু কোমরের গেজেটা অনুভব করে দেখল।
সেই বাড়ির দোতলায় উঠে যখন সে কড়া নাড়ল তখন লাল থালার মতো সূর্য উঁকি দিয়েছে। দিগন্তে। ঘুমচোখে দরজা খুল তাকে দেখে ভীষণ অবাক হয়ে গেলেন কাঁচাপাকা চুলওলা সেই ফরসা ভদ্রলোক। এখন তার চোখে চশমা নেই। তার ঠিক পিছনেই এসে দাঁড়িয়েছেন ফরসা মোটাসোটা এক মহিলা। সম্ভবত ভদ্রলোকের স্ত্রী। বাচ্চা মেয়েটি নিশ্চয়ই এখনও ঘুম থেকে ওঠেনি।
কী ব্যাপার, কী চাই?
রুক্ষ প্রশ্নটা শুনেই বুধন বুঝল, ভদ্রলোক তাকে চিনতে পারেননি। সে তাড়াতাড়ি বলল, আমি সেই পাখিওলা, বাবু।
ভদ্রলোক এবার চিনতে পারলেন বুধনকে। বললেন, তা এই সাত-সক্কালে কী চাই তোমার?
কোমর হাতড়ে লুঙির ভাঁজ খুলে পঞ্চাশ টাকার নোটটা বের করল বুধন। ভদ্রলোকের দিকে সেটা এগিয়ে দিয়ে কঁপা গলায় বলে উঠল, আমার রাজা পাখিকে ফিরিয়ে দিন আমার রাজা পাখিকে ফিরিয়ে দিন, বাবু।
টাকাটা হাতে নিয়ে ভদ্রলোক কিছুক্ষণ ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রইলেন বুধনের দিকে। যেন এই আকুলভাবে চেয়ে থাকা দেহাতি পাখিওলাটাকে বুঝতে চেষ্টা করলেন। তারপর পিছন ফিরে স্ত্রীকে বললেন, পাখিটা এনে দাও।
একটু পরেই খাঁচাসমেত রাজা পাখিকে হাতে পেল বুধন। তাকে দেখে রাজা পাখি শিস দিচ্ছে, টুই-টুই।
ভদ্রলোক ও তাঁর স্ত্রীকে অনর্থক বারবার সেলাম করল বুধন। তারা তখনও অবুঝ চোখে বুধনের দিকে তাকিয়ে।
খুশিতে ডগমগ পায়ে সিঁড়ি ভেঙে রাস্তায় নেমে এল বুধন পাখিওলা। রাজা পাখি এখনও সুরেলা গান গেয়ে চলেছে। সকালের সোনালি রোদে কেটে যাচ্ছে ভোরের কুয়াশা। বুধন যেন স্পষ্ট দেখতে পেল, তার সাধের মুন্না সোনালি ধানখেতে ছুটোছুটি করে খেলে বেড়াচ্ছে। ওর অসুখ আর নেই। একেবারে সেরে গেছে।
ফিরে আসা
ওকে নিয়ে হইচই কম হল না। হওয়াটাই স্বাভাবিক। কারণ, এই প্রথম একটা মানুষ চুক্তিমাফিক দাম দিয়ে ফিরে এল ভিনগ্রহের কলোনি থেকে।
আঠারো বছর ধরে মানুষটা দেশছাড়া। রুক্ষ বেজান নভোনি-নাইন গ্রহে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ক্রীতদাসের মতো খেটেছে, আর তিল তিল করে সঞ্চয় করেছে ঘরে ফেরার গাড়িভাড়া। হবেই তো–মহাকাশ-পাড়ির খরচ তো আর কম নয়!
