রোজকার মতো ওদের খাঁচা বাঁকে ঝুলিয়ে বেরিয়ে পড়ল বুধন। ভগবান যেন তার বেশ কয়েকটা পাখি আজ বিক্রি করিয়ে দেন। কিন্তু রাজা পাখিকে যদি কেউ কিনতে চায়? কত দাম চাইবে বুধন? দশ-কুড়ি, না পঞ্চাশ টাকা?
বেলায় যখন স্কুলের সামনে সে হাজির হল তখন সত্যিই সাড়া পড়ে গেল রাজা পাখিকে ঘিরে।
ছেলেমেয়েরা মুখ দিয়ে নানান শব্দ করছে, আর পাখিগুলোও যেন সাড়া দিচ্ছে সেই তালে। টুই-টুই ডাকে মধু ছড়িয়ে রাজা পাখি নাচছে তারের দোলনায়।
এই নতুন পাখিটার নাম কী গো পাখিওলা? গোলগাল মিষ্টি ছেলেটি খাঁচার ওপর ঝুঁকে পড়ে জানতে চাইল।
আসল নাম তো জানি না, খোকাবাবু। তবে আমি ওর নাম দিয়েছি রাজা পাখি।
ব্যস, নাম শুনেই ওদের মধ্যে হুল্লোড় পড়ে গেল।
কী মজা, পাখির রাজা! কী মজা, পাখির রাজা! ওরা সমস্বরে ছড়া কেটে বলতে লাগল। কেউ-কেউ আবার হাততালিও দিচ্ছে।
বাচ্ছা ছেলেটি বুধনকে লক্ষ করে বলল, তোমার রাজা পাখি কী সুন্দর!
এ খুব মাহাঙ্গী পাখি, খুকি। অনেক দাম এর।
একসময় স্কুলের ঘণ্টা পড়ে। ছেলেমেয়েদের ভিড় কঁকা হয়ে যায়। বুধন আবার পথ চলতে শুরু করে।
আজও যখন পাখি নিয়ে ইস্কুলে সে পৌঁছোল তখন গতকালের মতোই হল্লোড় পড়ে গেল রাজা পাখিকে নিয়ে। কত আবদার, কত প্রশ্ন, কত খেলা! বুধনের খুব ভালো লাগে ওদের এই চপলতা। যেন এক ঝাঁক রং-বেরঙের পাখি।
আবার রাতে ঘরে ফিরেও সেই একই ব্যাপার। মাঝরাতে রাজা পাখির সুরেলা শিস, আর তাকে অনুসরণ করে অন্য পাখিগুলোর মিষ্টি গান। আবার ভোরবেলা শুরু হয় ওদের সূর্যস্তবের মন্ত্র। বুধন যেন স্পষ্ট বুঝতে পারে ওদের আশ্চর্য ভাষা।
এইভাবে দিন কাটছিল বুধন পাখিওলার। কিন্তু একদিন বিক্রি হয়ে গেল রাজা পাখি।
দিনটা ছিল রবিবার। ছুটির দিন। তাই পাখি নিয়ে সাহেবপাড়ায় টহল দিতে বেরিয়েছিল বুধন। তখন সবে সকালের শুরু।
কোয়ার্টারগুলোর পাশ দিয়ে হাঁক পেড়ে সে এগিয়ে চলেছে, পাখি চাই, বাবু, পাখি–লাল নীল হরেক রঙের পাখি।
হঠাৎই একটা বাড়ির দোতলার বারান্দা থেকে একটা ছোট মেয়ে ডাকল তাকে, এই পাখিওলা, ওপরে এসো।
সবুজ রঙের ছিটকাপড়ের ফ্রক পরা বছর দশেকের একটি মেয়ে। লাল ফিতে বাঁধা ছোট্ট বিনুনি দুটো কানের পাশ দিয়ে ঝুলে রয়েছে নীচের দিকে। মেয়েটি রেলিং-এ ঝুঁকে পড়ে বুধনকে ডাকছে।
সিঁড়ি বেয়ে দোতলার উঠে গেল বুধন। ওদের দরজার সামনে খাঁচাগুলো নামিয়ে বসল মেঝেতে। একটু পরেই দরজা খুলে গেল। দরজায় ডোরাকাটা স্লিপিং স্যুট পরা এক ভদ্রলোক। চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, কাঁচাপাকা চুল, ফরসা চেহারা। তাঁর হাত ধরে দাঁড়িয়ে বারান্দায় দেখা ছোট্ট মেয়েটি। সে হাত-পা নেড়ে বুধনকে সব পাখির দাম জিগ্যেস করতে লাগল।
মেয়েটির কথার উত্তর দিলেও বুধনের চোখ কিন্তু ভদ্রলোকের দিকে। কারণ তিনি তখন একদৃষ্টে রাজা পাখিকে দেখছেন।
হঠাৎই তিনি বুধনকে জিগ্যেস করলেন, এ-পাখি তুমি কোথায় পেলে?
থতোমতো খেয়ে গেলেও বুধন বলল, ইস্টিশানের কাছে ঝোঁপ থেকে ধরেছি বাবু।
ভদ্রলোক মেয়েটিকে লক্ষ করে বললেন, টুনি, এই পাখিটা নাও। এ-পাখি চট করে পাওয়া যায় না। এগুলো কাশ্মীর আর পশ্চিম হিমালয়ে পাওয়া যায়। শীতকালে যাযাবর পাখি হয়ে নীচে নেমে আসে। খুব মিষ্টি গান গায় এরা।
ভদ্রলোকের কথার প্রমাণ দিতেই যেন রাজা পাখি মিহি সুরেলা কণ্ঠে বারকয়েক ডেকে উঠল।
বুধনের বুকের ভেতরটা ঢিপঢিপ করে চলেছে। ইশ, যদি সত্যি পাখিটা ওরা কিনে নেয়, তা হলে বড় ভালো হয়। কিন্তু কত দাম চাইবে বুধন?
পাখিটার নাম কী, বাবা? মেয়েটি জানতে চাইল কৌতূহলী গলায়।
লালটুটি। কেউ কেউ শুধু টুটিও বলে। তারপর বুধনকে লক্ষ করে ভদ্রলোক প্রশ্ন করলেন, কত দাম পাখিটার?
তিরিশ টাকা বলবে? নাকি চল্লিশ? মুন্নার অসুখের কথাটা মনে পড়তেই বুধনের মুখ ফসকে বেরিয়ে এল, পঞ্চাশ টাকা।
দামটা কি বেশি বলা হয়ে গেল?
কিন্তু বুধনকে অবাক করে দিয়ে ভদ্রলোক বললেন, ঠিক আছে, তবে খাঁচাসমেত দিতে হবে। টুনি, যাও, মায়ের কাছ থেকে পঞ্চাশটা টাকা চেয়ে নিয়ে এসো।
মেয়েটি চলে গেল। তবে একটু পরেই ফিরে এল। হাতে চকচকে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট। সেটা দেখে খুশিতে বুধনের বুকের ভেতরটা যেন নাচছে।
রাজা পাখিকে খাঁচাসমেত ভদ্রলোকের হাতে তুলে দিল বুধন। তারপর পঞ্চাশ টাকার নোটটা নিয়ে কোমরে গুঁজল। সেলাম জানিয়ে অন্য খাঁচাগুলো বাঁকে ঝুলিয়ে সে নামতে লাগল নীচে। তার পা দুটো যেন তাড়াতাড়ি চলার জন্য ছটফট করছে। কতক্ষণে টাকাটা সে মানি-অর্ডার করবে দেশে। তা ছাড়া দেরি করলে যদি সাহেব-বাবুর মত পালটে যায়? যদি পাখি ফেরত দিয়ে ফেরত চান টাকাটা? সুতরাং, রাস্তায় এসে বেশ তাড়াতাড়ি বাড়ির দিকে হাঁটা দিল বুধন। আজ আর টহল দেওয়ার দরকার নেই। রাজা পাখি বেচে সে রাজা-টাকা পেয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি করার জন্য হয়তো খেয়াল করল না, খাঁচার অন্য পাখিগুলো হঠাৎই যেন একেবারে চুপচাপ হয়ে গেছে।
সেদিন রাতে ঘুম ভেঙে অন্ধকারে চোখ মেলে উত্তর্ণ হয়ে রয়েছে সে। আশ্চর্য! চারদিকে নিঝুম। থমথমে। একটা পাখিও ডাকছে না। কোথায় গেল ওদের কিচিরমিচির কলতান! অপেক্ষা করে করে হতাশ হয়ে এক সময় সে আবার ঘুমিয়ে পড়ল।
