ও পাখিওলা, পাখিওলা, এই পাখিটার নাম কী?
ছেলেটির মুখের দিকে তাকায় বুধন। মাজা রং, গোলগাল চেহারা, মুখটা ভারি মিষ্টি। বয়েস কতই বা হবে! আট কি নয়। গায়ে লাল কালো উলের সোয়েটার। মাথার চুল কপালে নেমে এসেছে।
মুন্নার কথা আবার মনে পড়ে বুধনের। এখন দেখতে কীরকম হয়েছে ও? এইরকম কি?
বুধন ছেলেটিকে জিগ্যেস করে, কোন পাখিটা, খোকাবাবু?
এই যে, এইটা। ঘাড় গুঁজে বসে আছে। একদম খাচ্ছে না। আঙুল দিয়ে একটা ফুলটুসি পাখিকে দেখায় ছেলেটি। বুধন সেটার নাম দিয়েছে বড়াসাব। কারণ, পাখিটা সারাদিন আপনমনে বসে থাকে। শুধু খাওয়ার সময় নড়াচড়া করে জায়গা ছেড়ে।
এটা খুব রাশভারী পাখি, খোকাবাবু। কারও সঙ্গে কথা বলে না। চুপচাপ থাকে। ওর নাম বড়াসাব।
বুধনের কথায় খিলখিল করে হেসে ওঠে ছেলেমেয়ের দল। ঈশ্বর যেন জলতরঙ্গ বাজাচ্ছেন। বুধন মুগ্ধ হয়ে শোনে। একটি মেয়ে বলে ওঠে, তোমার সব পাখির নাম আছে?
হ্যাঁ, দিদিমণি, ঠিক তোমাদের মতো। এটার নাম ঘুরঘুটিয়া, এটার নাম খিলাড়ি, এই পাখিটার নাম শরবতী– একে-একে পাখিগুলোর দিকে আঙুল তুলে দেখায় বুধন। তার কথায় হইহই করে হাসির রোল পড়ে যায়। ওরা নামগুলো আওড়ে ডাকাডাকি করতে থাকে পাখিগুলোকে। বুধন লাল সোয়েটার পরা ছেলেটিকে দেখতে থাকে। খুশিতে মুখ-চোখ যেন টগবগ করছে।
এমন সময় স্কুল বসার ঘণ্টা বাজল। ছেলেমেয়েরা সঙ্গে-সঙ্গে ছুটল স্কুলের দিকে। যেন বসন্তের অস্থির বাতাস। ওরা চলে গেলে বুধন পাখিওলা একা পড়ে রইল। তার পাখি তখন অল্প-স্বল্প ডাকছে।
ফাঁকা জায়গাটার চারপাশে এক পলক চোখ বুলিয়ে নিল বুধন। বুক ঠেলে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। ক্লান্ত ভঙ্গিতে বাঁক কাঁধে তুলে আবার সে রওনা হল। মুন্নার অসুখ সারবে কী করে সে-কথাই শুধু ভাবতে লাগল।
বিকেল-বিকেল সময়েই ঘটনাটা ঘটল।
কোনও চিঠিপত্র এসেছে কি না সে-খোঁজ নিতে পোস্ট অফিসের দিকে গিয়েছিল বুধন।, নতুন কোনও চিঠি আসেনি। তাই স্টেশনের লাগোয়া সরু পথ ধরে তখনই সে ফিরে আসছিল।
কাঁচা সড়ক। দু-পাশে আকন্দ, ধুতরো আর ভেরেণ্ডা গাছের ঝোঁপ।
হঠাৎই আনমনা বুধনের কানে এল একটা মিষ্টি টুই-টুই শব্দ।
পাখির ডাক! ভীষণ সুরেলা এবং মিষ্টি।
কী পাখি এটা! থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল বুধন। অতি সাবধানে চারপাশে তাকাল। পাখি ধরা তার অনেকদিনের অভ্যেসলাঠির মাথায় শিরীষের আঠা মাখিয়ে বা অন্যভাবে ফাঁদ পেতে। কিন্তু এখন, সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত অবস্থায়, সে কি পারবে এই লুকোনো পাখিটাকে বন্দি করতে?
তীক্ষ্ণ নজর চালিয়ে পাখিটাকে একসময় আবিষ্কার করল বুধন পাখিওলা।
টুকটুকে গোলাপি তার গায়ের রং। ডানায় ফিকে রঙের দাগ। মাপে চড়ুই পাখির চেয়ে একটু বড়। ছোট্ট কোনাচে ঠোঁট। জলপাই সবুজ ও বাদামি রঙে মেশানো লেজটা দু-ভাগে ভাগ সরেলা শিস সেবটা খুলে ফেলতে সময় নিয়ে নিন করা। ছটফটে পাখিটা একটা বুনো ফুলে মুখ ডুবিয়ে মধু খাচ্ছে। আর থেকে-থেকেই টুই-টুই করে সুরেলা শিস দেওয়ার ভঙ্গিতে ডাকছে। যেন প্রশ্ন করার সুরে বলছে, তুই? তুই?
গায়ের চাদরটা খুলে ফেলল বুধন। তারপর আড়ালে-আড়ালে পা টিপে টিপে বিভোর পাখিটার খুব কাছে পৌঁছে গেল। এক মুহূর্ত সময় নিয়ে নিজেকে তৈরি করে নিল। তারপর চাদর বাগিয়ে ধরেই ঝপাৎ। চাদরের ফঁদে ধরা পড়ল নাম-না-জানা অচিন পাখি। বুধনের বুকটা আনন্দে নেচে উঠল। না জানি কত দামে বিক্রি হবে এই পাখি। সে মনে-মনে বলে উঠেছে, রাজা পাখি, তুই আমার মুন্নাকে বাঁচাবি।
চাদরে বন্দি পাখিটাকে বুকে করে ঘরে নিয়ে এসেছে বুধন। তখন বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নামছে।
এ-সবই গত পরশুর ঘটনা।
তারপর নতুন পাখিটাকে আলাদা একটা খাঁচায় রেখেছে সে। খেতেও দিয়েছে। অন্য পাখিগুলো নতুন পাখিটাকে ঘিরে জটলা করে শুরু করে দিয়েছে কিচিরমিচির। কিন্তু নতুন পাখিটা একেবারে চুপচাপ। মাঝে-মাঝে শুধু ডানা ঝাঁপটে উড়ে বেড়াচ্ছে খাঁচার ভেতরে। এরকম প্রথম-প্রথম হয়। পরে সব ঠিক হয়ে যায়। বুধন তা ভালো করেই জানে।
কিন্তু সেদিন রাতে এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। সেই ঘটনায় রীতিমতো অবাক হয়ে গেল সে। কারণ সাত বছরের পাখি-বেচার জীবনে এরকমটা কখনও বুধন দেখেনি।
রাত তখন কত হবে? বারোটা, একটা, না দুটো, তা বুধন বলতে পারবে না। তবে এটুকু জানে, পাখিদের খেতে দিয়ে, খাঁচা ঢাকা দিয়ে, লণ্ঠন নিভিয়ে সে গভীর ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিল। ঘুম ভাঙল অদ্ভুত সুরেলা শিসের শব্দে। রাজা পাখি রাত্তিরে শিস দিয়ে ডাকছে। কান খাড়া করে শুয়ে রইল বুধন। অদ্ভুত মিষ্টি ডাক।
তার একটু পরেই ঘটে গেল আরও অবাক করা ঘটনা। অন্য পাখিগুলোও একে-একে ডাকতে শুরু করল। রাজা পাখির ডাকের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ওরা ডাকছে। এদের মুখে এত মিষ্টি ডাক বুধন কখনও শোনেনি। সে যেন স্বপ্নের মধ্যে চলে গেছে স্বর্গের কোনও বাগিচায়। সেখানে লাল নীল-হলদে-সবুজ পাখিরা সব ডাকছে। এক অপূর্ব খুশিতে বুধনের মনটা ভরে উঠল। ওদের ডাক শুনতে-শুনতে সে আবার ঘুমিয়ে পড়ল।
সকালেও তার ঘুম ভেঙেছে সেই রাজা পাখির ডাকে।
ওদের খাবার দিতে গিয়ে কেমন একটা খুশি-খুশি ভাব লক্ষ করল বুধন। এই একটা নাম না-জানা পাখি যেন সবাইকে খুশিতে মাতিয়ে দিয়েছে। কিন্তু বুধনের খুশির আকাশে মুন্নার অসুখের খবরটা যেন দুঃখের কালো মেঘের মতো জমাট বেঁধে রয়েছে।
