প্রথমটা সে বিশ্বাসই করতে চায়নি। মুরুব্বিকে বলেছে বারবার চিঠিটা পড়তে। কিন্তু তাতে খবরটা পালটায়নি। মুন্নার চিকিৎসার জন্য এখুনি বেশ কিছু টাকা পাঠানো দরকার।
এতগুলো বছর দেশছাড়া হয়ে থাকতে ভীষণ কষ্ট হয়েছে বুধনের। মাঝে-মাঝেই ইচ্ছে হয়েছে। দেশে পাড়ি জমাতে। কিন্তু অনেকগুলো টাকা গাড়িভাড়ার কথা ভেবে সে নিজেকে সামলে নিয়েছে। মুন্নার ভালোর জন্যেই তো সে বিদেশ-বিভুঁইয়ে এসে জান দিয়ে খেটে চলেছে!
বুধন একবার ভাবল, দেশোয়ালি ভাইদের কাছে হাত পাতে। কিন্তু তাদের অবস্থাও তো বুধনের চেয়ে কিছু ভালো নয়। তারা বড় জোর দু-পাঁচ টাকা দিয়ে তাকে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু তাতে তো মুন্নার চিকিৎসার কোনও সুরাহা হবে না। সুতরাং আনমনাভাবে একটা দিন কাটিয়ে দিয়েছে বুধন। সেদিন সে আর পাখি নিয়ে টহলে বেরোয়নি। তখন কি জানত সে, পরদিনই নেহাত কপালজোরে তার সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
রোজকার মতো সেদিনও খুব ভোরে ঘুম ভেঙেছে বুধনের। ঘুম না ভেঙে উপায় নেই। কারণ, ভোরের আলো ফুটে ওঠামাত্রই কাপড়ে ঢাকা খাঁচার পাখিগুলো কিচিরমিচির শব্দে কলরোল জুড়ে দেয়। যেন বলতে চায়, ওঠো, বুধনভাই, আমাদের খেতে দাও। জল দাও। তারপর কাঁধে করে বেড়াতে নিয়ে চলো।
সুতরাং বুধন উঠে পড়ে। একটা ছোট্ট ঘরে তারা দুজন শোয়। সে এবং তার এক সঙ্গী শিবুয়া। শিবুয়া ফুচকা বিক্রি করে। ফলে তার ভোরে ওঠার দরকার হয় না। সে বেরোয় বিকেলে। সারাদিন ঘরে থেকে সেই দুজনের খানা পাকায়। বদলে বুধনের কাছ থেকে টুকিটাকি জিনিস উপহার পায়–তেল, সাবান ইত্যাদি।
ঘুম থেকে উঠে গায়ের ছেঁড়া কম্বলটা চাদরের মতো শরীরে জড়িয়ে নেয় বুধন। তারপর চটের বিছানাটা গোল করে গুটিয়ে তুলে রাখে ঘরের কোণে। শিবুয়া গুটিসুটি মেরে এখনও ঘুমে অচেতন। নিমের দাঁতন আর অ্যালুমিনিয়ামের ঘটি নিয়ে ঘর ছেড়ে বাইরে আসে বুধন। এখানে ওখানে উনুনে আঁচ ধরানো হয়েছে। ঘন ধোঁয়া এঁকেবেঁকে উঠে যাচ্ছে আকাশে। কাছেই মিউনিসিপ্যালিটির কলে জল পড়ছে। সেখানে বস্তির অন্যান্য বাসিন্দার ভিড়। তারা হাত-মুখ ধুয়ে নিচ্ছে। কেউ বা স্নান সারতে এসেছে। কারও মুখে শোনা যায় ভোজপুরী গানের কলি। দাঁতন করতে করতে সেদিকে এগোয় বুধন।
হাত-মুখ ধুয়ে এসে বুধন পাখির খাঁচার ঢাকনা খুলল। পাখিরা ছটফট করতে লাগল চঞ্চল হয়ে। ওরা জানে, এখন খেতে দেওয়া হবে।
ছোলা, কাঙনিদানা, ছাতুর ডেলা, গুঁড়ো আটা, যার যা বরাদ্দ সবাইকে সেইমতো খেতে দিল বুধন। বাখারি দিয়ে খাঁচার তারে আটকানো ভাড়ে জলও ঢেলে দিল প্রয়োজন মতো। তারপর গতকালের একজোড়া বাসি রুটি দিয়ে নিজেও খাওয়া সেরে নিল। আর একজোড়া রুটি কোমরে গুঁজে নিল বেলায় খাবে বলে।
গায়ের কম্বল নামিয়ে রেখে দড়িতে ঝোলানো কালো রঙের ময়লা সোয়েটারটা টেনে নিল সে। গেঞ্জির ওপরে পরে নিল। তারপর একটা পাতলা লিনেনের চাদর তার ওপরে জড়িয়ে নিয়ে ঘরের কোণে দাঁড় করানো তামাটে রঙের বাঁকটা তুলে নিল। সেটাকে মাটিতে বার-দুয়েক ঠুকে এগিয়ে গেল খাঁচাগুলোর কাছে। পাখিরা তখন খাওয়াদাওয়া সেরে ভোরের গান ধরেছে। যেন সমস্বরে বলছে, বেড়াতে চলো, বুধনভাই, বেড়াতে চলো।
বাইরে এসে হিমে ভেজা পথ-চলতে শুরু করল বুধন। ভোরের কুয়াশার জন্য সূর্যের আলো এখনও তেমন তেজি হয়নি। দূর থেকে ভেসে এল কু-ঝিকঝিক ট্রেনের শব্দ। সঙ্গে তিরবেগে ছুটে চলা লোহার চাকার ঘটাং-ঘটাং আওয়াজ। সেই শব্দের রেশ মিলিয়ে যেতেই বুধন পাখিওলা সুর তুলে প্রথম হাঁক দিল, পাখি চাই বাবু, পাখি রংবেরঙের পাখি।
পাড়া-বেপাড়া ঘুরে এগিয়ে চলে বুধন। আজ একটা সবুজ টিয়া আর একজোড়া মুনিয়া বিক্রি করতে পেরেছে। এখানে বেশি দামের পাখি খুব একটা বিক্রি হতে চায় না। সেগুলো বিক্রি করার জন্য রয়েছে সাহেবপাড়া। ইস্টিশানের কাছে নতুন-নতুন সব বাড়ি উঠছে, কোয়ার্টার তৈরি হচ্ছে। সেখানে এসে বাসা বেঁধেছে বড়-বড় অফিসারের দল। তাদের কয়েকজনের তো আবার মোটরগাড়ি আছে। ময়না কিংবা বদ্রী বেশিরভাগ বিক্রি হয় ওই সাহেবপাড়াতেই। তবে সেখানে ছুটির দিন দেখে যেতে হয়। তখন বাবুরা সব বাড়িতে থাকেন। আজ ছুটির দিন নয়, তাই সাহেবপাড়ার দিকে আর যায়নি বুধন।
সূর্যের তাপ ক্রমে বাড়ছে। শীত কেটে গিয়ে এক অদ্ভুত আমেজ তৈরি হচ্ছে। বাঁক কাঁধে নিয়ে পায়ে-পায়ে প্রাইমারি স্কুলের কাছে পৌঁছে গেল বুধন। এখনও এগারোটা বাজেনি। ফলে ছোট-ছোট ছেলেমেয়েরা বাইরের মাঠে-সড়কে জটলা করছে, ছুটোছুটি করছে। এই সময়টাতে রোজ এখানে চলে আসে বুধন। একটা শিমুল গাছের নীচে বাঁক নামিয়ে রোদে পিঠ দিয়ে বসে। শুকনো রুটি দুটো কোমরের গেঁজে থেকে বের করে ধীরে-ধীরে খেতে থাকে। প্রাণচঞ্চল প্রজাপতির মতো রংবেরঙের শীতের পোশাক পরা ছেলেমেয়েদের দু-চোখ ভরে দ্যাখে। তার মনে পড়ে যায় মুন্নার কথা। আনমনা হয়ে ওদের কলরোল শোনে বুধন। সেই সঙ্গে খাঁচার পাখিদের কলরোলও তার কানে আসে। কয়েক টুকরো রুটি ছিঁড়ে সঙ্গে খাঁচার মধ্যে গুঁজে দেয়। পাখিরা ব্যস্তভাবে ঠোকরায় সেগুলো।
কাছাকাছি টিউবওয়েল থেকে জল খেয়ে ফিরে আসে বুধন। দেখে ইতিমধ্যেই বাচ্চারা তার খাঁচা ঘিরে ভিড় করে ফেলেছে। রোজই ওরা স্কুলের ঘণ্টা বাজার আগে এইভাবে পাখির খাঁচাগুলো ছেকে ধরে। পাখিদের সঙ্গে কথা বলে, খেলা করে, কেউ বা খোঁচায়। বুধন গিয়ে বসে খাঁচার পাশটিতে।
