বাবা বাজারের থলে দুটো বগলদাবা করে রাকেশকে লক্ষ্য করে গলা নামিয়ে বললেন, রাকা, এবারে রঙের ব্যাপারটা ছোট্ট করে তোর মাকে বুঝিয়ে দিই, কী বলিস?
রাকেশ মজা পেয়ে ঘাড় কাত করল। মা রান্নায় মগ্ন হলেও এদিকে যে কান পেতে আছেন তা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
গলাখাঁকারি দিয়ে বাবা বলতে শুরু করলেন, শোনো, সূর্যের যে সাদা আলোমানে, তোমার মতে হলদে, কিন্তু বিজ্ঞানীদের মতে ওটাই সাদা আলো–ওই সাদা আলো ভাঙলে দেখা যাবে ওর ভেতরে সাতটা রং মিশে আছে। আকাশে রামধনু উঠলে বর্ণালির সেই সাতটা রং আমরা আলাদা করে দেখতে পাই। দিনেরবেলা সব জিনিসের ওপরেই সাদা আলো পড়ে, কিন্তু তবুও বিভিন্ন জিনিসকে আমরা বিভিন্ন রঙের দেখি। এরকমটা কেন হয়? ধরো, এই যে তুমি লাল রঙের শাড়ি পরে আছ, এই শাড়িটাকে লাল দেখানোর কারণ এটা বর্ণালির লাল রং ছাড়া আর সব কটা রংই শুষে নিয়েছে। শুধু গেট-পাস দিয়েছে লাল রংটাকে। যেমন ওই বিকিরণ নীল রংটাকে ছেড়ে দিয়েছিল। যে-জিনিস সব রং শুষে নেয় তাকে আমরা কালো দেখি। আর যে-জিনিস বর্ণালির সব কটা রংকেই ফিরিয়ে দেয়–মানে, ছেড়ে দেয়–তাকে আমরা দেখি সাদা রঙের। যেমন আমার এই ধুতি-পাঞ্জাবি, হাঁড়ির ওই ভাত। এবার তো বুঝলে?
মা হাতা নাড়তে নাড়তে বললেন, ঢের বুঝেছি। এখন চটপট বাজারটা করে আনো দেখি। কাল তো নীল ভাত খেতেই পারোনি, আজ ভালো করে দুটো সাদা ভাত খেয়ে অফিসে যেয়ো।
বাবা চলে গেলেন। যেতে-যেতে বললেন, কাল খবরের কাগজ পড়তে পারিনি। আজ দেখি কোনও টেলিগ্রাম বেরোল কি না–।
মা রাকেশকে বললেন, কী হল, রাকা, যাও, পড়তে বোসো গিয়ে–।
রাকেশ পড়ার টেবিলে ফিরে এল। মিনু টেবিলের নীচে চুপটি করে বসে। জানলা দিয়ে বাইরের রোদ দেখতে রাকেশের খুব ভালো লাগছিল। ও উঠে গিয়ে গরাদে মুখ ঠেকিয়ে চোখ তুলে তাকাল সূর্যের দিকে। আজ সূর্যটাকে কী দারুণ দেখাচ্ছে! কই, এতদিন তো এরকম মনে হয়নি! বরং সূর্যটা যেন সকলের কাছে বেশ পুরোনো হয়ে গিয়েছিল। অথচ আজ একেবারে ঝকঝকে নতুন!
পাখির রাজা
লাল, নীল, হলদে, সবুজ, গোলাপি। নানারকম রঙের খেলা। রামধনুর সাত রঙের ছোট বড় টুকরোগুলো লাফালাফি করে বেড়াচ্ছে খাঁচাগুলোর ভেতরে। সেই খাঁচা বাঁকে বেঁধে কাঁধে করে বয়ে নিয়ে চলেছে বুধন পাখিওলা। মুখে তার দেহাতি স্বরে সুরেলা ডাক, টিয়া, ময়না, বুলবুলি, বদ্রী, মুনিয়া পাখি চাই বাবু, পাখি রং-বেরঙের পাখি–
সকালের রোদ্দুর সবে দেখা দিয়েছে। শীতের কুয়াশা ভয়েভয়ে সরে পড়েছে চোখের আড়ালে। মফস্সল শহরে নতুন একটা দিনের শুরু হয়েছে। আর সেই সঙ্গে শুরু হয়েছে বুধন পাখিওলার নতুন একটা দিন। কাঁচাপাকা এবড়োখেবড়ো নানান সড়ক ধরে শুরু হয়েছে তার পথ চলা।
অন্যদিন বাঁক কাঁধে নিয়ে চাদর মুড়ি দিয়ে বুধন যখন পথে নামে, তখন মনে থাকে অনেক চিন্তা। কটা পাখি বিক্রি হবে আজ। কটাকাতেই বা বিক্রি হবে। তারপর সেই টাকা কীভাবে খরচ করবে সে। দেশে মানি-অর্ডার করে তা কতটুকু বুধন পাঠাবে।
কিন্তু আজ তার মনে এসব চিন্তা নেই। বরং সে ভীষণ খুশি। কারণ গত পরশু ঠিক সন্ধের মুখে একটা দারুণ জিনিস পেয়ে গেছেন বুধন। কোনওদিন সে স্বপ্নেও ভাবেনি, এরকমভাবে তার কপাল খুলে যাবে।
এই শহরে সাত-সাতটা লম্বা বছর কেটে গেছে বুধনের। সেই কোন যুগে দেশ ছেড়ে এখানে পাড়ি জমিয়েছিল সে। প্রথমে মোট বওয়া শুরু করেছিল হাট-বাজারের এলাকায়। পরে তার পাখির নেশা লাগে। ঝোপে-জঙ্গলে ঘুরে-ঘুরে একটা-দুটো করে পাখি ধরতে শুরু করে সে। তারপর দেখতে দেখতে একদিন তার নাম হয়ে গেল বুধন পাখিওলা। সেই যে খাঁচাসমেত বাঁক একবার কাঁধে তুলে নিয়েছে, আর নামানোর ফুরসত পায়নি।
পাখিদের সঙ্গে থাকতে-থাকতে তাদের হাবভাব, চালচলন, কথাবার্তা, সবই যেন বুঝতে পারে বুধন। কখন ওদের খিদে পায়, কখন তেষ্টা পায়, কখন ঘুম পায়, সবকিছু বুধন পাখিওলার নখদর্পণে। সে থাকে আধা-শহরের এক প্রান্তে, দেহাতি মানুষদের বস্তিতে।
প্রায় পঞ্চাশ-ষাট জন লোক থাকে এই বস্তিতে। যেন একটা একান্নবর্তী পরিবার। প্রত্যেকেই ওরা দেশছাড়া। এখানে খাটে, খায়, দেশে টাকা পাঠায়, আর মাঝে-মাঝে অক্ষর-পরিচয় আছে এমন কোন মুরুব্বিকে ধরে চিঠি লিখিয়ে নেয়। দেশ থেকে কোনও চিঠি এলে সেই এক ব্যাপার। মুরুব্বি এসে পড়ে দেয়। শেষ যে-চিঠিটা বুধন দেশ থেকে পেয়েছে, সেটা এসেছে তিনদিন আগে। আর বেশ খারাপ খবরই বয়ে নিয়ে এসেছে সেই চিঠি। তার একমাত্র ছেলে মুন্নার খুব অসুখ।
মুন্নার কথা খুব আবছাভাবে মনে পড়ে বুধন পাখিওলার।
সাত বছর আগে যখন সে মুলুক ছেড়ে আসে, তখন মুন্নার বয়েস মাত্র দেড় বছর। হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে সে তিন মাস পরপর টাকা পাঠায় বউয়ের কাছে, আর মুন্নার খবর নেয় চিঠিতে। উত্তরও আসে ঠিকমতো। বছরে-বছরে একটু-একটু করে বড় হচ্ছে মুন্না। বুধন কল্পনাতে দ্যাখে, ছোট্ট মুন্না হাঁটতে শিখেছে, দৌড়োতে শিখেছে। সে ছুটে-খেলে বেড়াচ্ছে ভুট্টা-জওয়ার-এর খেতে।
এই বছরেরই গোড়ার দিকে ইস্কুলে ভরতি হয়েছে মুন্না। খবরটা পেয়ে বুধনের খুব আনন্দ হয়েছিল। কিন্তু তিনদিন আগে পাওয়া চিঠিটায় খারাপ খবরটুকু পেয়ে সে ভীষণ মুষড়ে পড়েছে।
