রাকেশ অবাক হয়ে বাবার কথা শুনছিল। এমনসময় রেডিয়োতে বলল, এ-পর্যন্ত সারা পৃথিবীতে কয়েক লক্ষ দুর্ঘটনা ঘটেছে। হিমালয়ের বরফে ঢাকা চুড়ো আকাশের নীল রঙের সঙ্গে মিশে যাওয়ায় মোট সাতাশটি এরোপ্লেন এভারেস্ট ও কাঞ্চনজঙ্ঘায় আছড়ে পড়েছে। ভারতবর্ষে এ-পর্যন্ত তিনজন পুরুষ ও একজন মহিলা এই রং বদলের ঘটনায় সম্পূর্ণ পাগল হয়ে গেছেন।
এরকম চমকে দেওয়া আরও কতসব দুর্ঘটনা।
রাকেশের খুব মন খারাপ লাগছিল। ও পায়ে-পায়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। সন্ধে ঘন হয়ে আঁধার নেমে এসেছে। কিন্তু আকাশে উঁদ-তারা কই? গাঢ় পিচ রং আকাশে ঘোর নীল রঙের চাঁদ। ভালো করে ঠাহর করা যায় না। আর তারা? চোখে প্রায় পড়ে না বললেই চলে। ইস, এরকমভাবেই কাটবে প্রতিটি দিন, প্রতিটি রাত!
রাকেশ ঘরে ফিরে এল। ঘরে নীল আলো জ্বলছে। টিউব লাইট আর বাব। দুটোর অবস্থাই একরকম। বাবা-মা চুপচাপ বসে। মায়ের মুখে সকালের ঠাট্টার লেশমাত্র নেই এখন। বাবাও যেন বেশ দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। মুখ গম্ভীর। রেডিয়ো সামনে নিয়ে বসে আছেন। রেডিয়ো ছাড়া আর উপায় কী! গল্পের বই পড়া বন্ধ। খবরের কাগজ পড়া বন্ধ। টিভি দেখা বন্ধ। ঘরে বসে-বসে সকলেই বোধহয় এইরকম হাঁফিয়ে উঠেছে।
রেডিয়োতে গানের অনুষ্ঠান শুনছিলেন বাবা। হঠাৎই রাকেশের দিকে ফিরে বললেন, রাকা, খেয়াল করছিস, যারা খবর পড়ে শোনাচ্ছে তাদের মাঝে-মধ্যে কীরকম আটকে যাচ্ছে! নীল কাগজে কালো লেখা পড়তে গিয়ে খবর-পড়ুয়ারা একেবারে হিমসিম খেয়ে যাচ্ছে।
রাকেশ সামান্য হাসল।
মা বললেন, তবু রেডিয়ো ছাড়া আর উপায় কী বলো—
রাকেশ জিগ্যেস করল, খবরে কিছু বলেছে, বাবা?
হ্যাঁ, বলেছে। মার্কিন বিজ্ঞানীরা অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানিয়েছেন, সূর্যের মধ্যে কোনও একটা গোলমালের জন্যেই এরকম বিচিত্র ঘটনা ঘটেছে। চব্বিশ ঘণ্টা না কাটলে তারা নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারছেন না।
মিনু রাকেশের পায়ে-পায়ে ঘুরছিল। রাকেশ ওকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করতে লাগল। তারপর একটা কালো বল নিয়ে ওর সঙ্গে খেলতে শুরু করল। সময় যেন আর কাটতেই চাইছে না।
এমনি করেই একসময় রাত দশটা বাজল। কোনওরকমে খাওয়াদাওয়া সেরে রাকেশ মায়ের পাশে শুয়ে পড়ল। মিনুও শুয়ে পড়ল ওর কোল ঘেঁষে। বাবা পাশের ঘরে যাওয়ার সময় বলে গেলেন, রাকা, মন খারাপ করিস না। কাল সকালে উঠেই দেখবি সব ঠিক হয়ে গেছে।
বাবার কথাটা যে এরকম হাতেনাতে ফলে যাবে সেটা রাকেশ কল্পনাও করতে পারেনি।
ভোরবেলা ঘুম ভাঙতেই ও অবাক। ধবধবে সাদা মিনু মিঁউ-মিউ করছে কালকের মতোই। চোখের ভুল নয়তো! রাকেশ শুয়ে-শুয়েই দেখল চারপাশ। ঘরের দেওয়াল আবার সাদা হয়ে গেছে, ফরসা হয়ে গেছে ওর গায়ের রং, জানলা দিয়ে ঠিকরে পড়েছে সোনা রঙের ঝকঝকে রোদ। পাশে তাকিয়ে দেখল, মা নেই। আগেই উঠে পড়েছেন।
রাকেশ লাফিয়ে উঠে বসল। মনটা দারুণ খুশি হয়ে উঠল ওর। যাক, সবকিছু আবার তা হলে আগের মতোই স্বাভাবিক হয়ে গেছে! কিন্তু হল কেমন করে?
রাকেশ বিছানা ছেড়ে ছুটল রান্নাঘরের দিকে মায়ের সন্ধানে।
সেখানে পৌঁছে দ্যাখে বাবা হাত-পা নেড়ে মাকে কীসব যেন বোঝাতে চেষ্টা করছেন। একহাতে বাজারের দুটো থলে। থলে দুটো উঁচু করে বাবা মাকে বলছেন, এই দ্যাখো, ধরো এটা হল সূর্য। সূর্য থেকেই তো সাদা আলো আসছে আমাদের পৃথিবীতে।
মা বাধা দিলেন, সাদা আলো কোথায়! ও তো হলদে আলো।
বাবা একটা অদ্ভুত শব্দ করে ধৈর্য হারালেন। তারপর বললেন, দুর ছাই! তোমাকে বলে লাভ নেই। তারচেয়ে বরং রাকাকে বলি।
রাকেশ খুশি-খুশি মেজাজে বলে উঠল, সব রং আবার ঠিকঠাক হয়ে গেছে, বাবা। কিন্তু ওরকম ওলটপালট হয়েছিল কেমন করে? রেডিয়োতে কিছু বলেছে?
আরে সেটাই তো তোর মাকে বোঝাতে চেষ্টা করছিলাম। রেডিয়োতে সংক্ষেপে যা বলল, তা হল এই : গত পরশু রাতে অর্থাৎ, ধরে নে, তিরিশ ঘণ্টা আগে, সূর্যে একটা বিস্ফোরণ ঘটেছিল। কী কারণে এই বিস্ফোরণ, তা এখনও বিজ্ঞানীরা বুঝে উঠতে পারেননি। তবে বলেছেন, সেই বিস্ফোরণের ফলে সূর্যকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল বিচিত্র এক তেজস্ক্রিয় বিকিরণ। সেই বিকিরণ সূর্যের সাদা আলো থেকে ছ-ছটা রং একেবারে শুষে নিয়েছিল। তারা শুধু গেট-পাস দিয়েছিল নীল রংটাকে। ফলে সব জিনিসকেই নীল রঙের দেখাচ্ছিল। তা ছাড়া, ওই বিকিরণের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিল সূর্যের কাছের তিনটে গ্রহে বুধ, শুক্র আর পৃথিবীতে। সেইজন্যে আমাদের এখানকার কৃত্রিম আলোগুলোও–মানে, টিউব লাইট, বা সব–নীল রঙের আলো ছড়াচ্ছিল…।
কিন্তু কালো রংটা? ভাতের হাঁড়িতে হাত নাড়তে নাড়তে মা প্রশ্ন করলেন।
তার জবাব দিল রাকেশ, কালোটা কোনও রং নয়, মা। বরং কোনও রং না থাকলে সেই জিনিসটাকে আমরা কালো দেখি।
মায়ের মুখের চেহারা দেখে বোঝা গেল রাকেশের ব্যাখ্যা তাঁর মনঃপূত হয়নি।
সেটা অনুমান করে বাবা বললেন, যাই হোক, ভারতীয় সময় অনুযায়ী গতকাল রাত সাড়ে তিনটে নাগাদ সূর্যকে ঘিরে-থাকা ওই বিচিত্র বিকিরণ মিলিয়ে গেছে মহাশূন্যে। ফলে বর্ণালির বাকি ছটা রং আজ সকাল থেকেই আবার ফিরে পাওয়া গেছে। আর পৃথিবীর ওপর থেকেও কেটে গেছে ওই বিকিরণের প্রভাব। সুতরাং রাতের আলোতেও আর কোনও গোলমাল থাকবে না। সিনেমা টিভিও দেখা যাবে আগের মতোই।
