রাকেশ অতি সাবধানে দুধের গ্লাসে একটা চুমুক দিল। মাগো! কীরকম গা গুলোচ্ছে। কিন্তু দুধের স্বাদটা একইরকম আছে। শুধু রং পালটে গেলেই খাওয়ার ইচ্ছেটা পালটে যায় কেন কে জানে! নইলে রাকেশ তো দুধ খেতে ভালোই বাসে।
মিনু কখন যেন বিছানা ছেড়ে নেমে এসে পায়ের কাছে ঘুরঘুর করছিল আর ডাকছিল মিউ মিউ করে। বোধহয় দুধের গন্ধ পেয়েছে। ওকে খানিকটা দুধ দিয়েই দেখা যাক তো, খায় কি না। গ্লাস থেকে কিছুটা দুধ মেঝেতে ঢেলে দিল রাকেশ। ঠিক মিনুর সামনে। কিন্তু দেখল, বেড়ালটা প্রথমে কেমন যেন হকচকিয়ে গেল।
বাবার কাছেই রাকেশ শুনেছে কুকুর, বেড়াল, গরু, মানুষের মতো বর্ণালির সাত রং দেখতে পায় না। এমনকী লাল কাপড়ের টুকরো দেখিয়ে স্পেনে যে ষাঁড়ের লড়াই হয়, সেখানে ষাঁড় মোটেই লাল কাপড় দেখে খেপে ওঠে না। সে বেচারা কাপড়টাকে দেখে গাঢ় ছাই রঙের। আসলে কাপড়ের টুকরোটার দ্রুত নড়াচড়াতেই সে খেপে উঠে ওটাকে তাড়া করে।
সুতরাং হিসেবমতো মিনুও নিশ্চয়ই দুধটাকে এখন কালো রঙের দেখছে। কারণ, ওর পক্ষে তো আর নীল রং দেখা সম্ভব নয়। হয়তো সেইজন্যেই ও দুধটার দিকে সন্দেহের চোখে তাকাচ্ছে।
অবশেষে ঘ্রাণশক্তিরই জিত হল। গন্ধে-গন্ধে জিভ বাড়িয়ে মেঝেতে পড়ে থাকা দুধের স্বাদ নিল মিনু। তারপর চক-চক শব্দে গোটা দুধটাই চেটেপুটে সাফ।
মিনুর দেখাদেখি চোখ বুজে অতিকষ্টে গ্লাসের দুধ শেষ করল রাকেশ। তারপর একটু জল খেয়ে গ্লাস মায়ের কাছে রেখে এসে পড়ার বই নিয়ে বসল।
ইতিহাস বই খুলেই রাকেশ বুঝল, পড়াশোনা করা মোটেই সম্ভব নয়। কারণ বইয়ের গাঢ় নীল রঙের পৃষ্ঠায় খুদে-খুদে কালো অক্ষরগুলো ভালো করে দেখতে পাওয়াই মুশকিল।
রাকেশ মনমরা হয়ে প্রত্যেকটা বই আর খাতার পৃষ্ঠা উলটে-উলটে দেখতে লাগল। দূর ছাই, স্কুলে গিয়ে তা হলে আর কী হবে! বই ছেড়ে উঠে বাবার টেবিল থেকে ট্রানজিস্টার রেডিয়োটা নিয়ে এল ও। সুইচ অন করে নব ঘুরিয়ে কান পাতল। সঙ্গে-সঙ্গেই শুনতে পেল বিশেষ ঘোষণা ও …সেই কারণেই সবকিছু বিবেচনা করে রঙের অবস্থা স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত স্কুল-কলেজ, সরকারি-বেসরকারি সমস্ত প্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে। সরকারিভাবে জানানো হয়েছে, বিজ্ঞানীরা এই আশ্চর্য ঘটনা নিয়ে দ্রুত গবেষণা করছেন এবং স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করছেন। জনসাধারণের নিরাপত্তার কথা ভেবে সবরকম যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখার জন্যে সরকার অনুরোধ জানিয়েছেন…।
সুইচ টিপে রেডিয়ো অফ করে দিল রাকেশ। রঙের সামান্য রকমফেরের জন্যে এ কী কাণ্ড হল!
এমনসময় সে করে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বাবা এসে ঘরে ঢুকলেন। রাকেশকে বললেন, রাকা, তোমার ইস্কুল ছুটি।
রাকেশ দেখল, বাবার পরনে নীল আদ্দির কাপড়ের পাঞ্জাবি, নীল ধুতি। গায়ের রং কালচে নীল।
পাঞ্জাবি খুলে হ্যাঁঙারে টাঙিয়ে রাখতে রাখতে বাবা আবার বললেন, বাজারে তো একেবারে হুলস্থুল কাণ্ড। অদ্ভুত-অদ্ভুত রঙের সব জিনিস বিক্রি হচ্ছে : নীল ফুলকপি, নীল রজনীগন্ধা, আর মাছের বাজারে কালো কালো পোনা মাছের টুকরো।
কেন, কালো রঙের কেন? রাকেশ জানতে চাইল।
বাবা হেসে বললেন, হবে না! রক্তের রঙই যে কুচকুচে কালো হয়ে গেছে। এ ছাড়া বাজারে শুনলাম, গাড়ি-ঘোড়া, স্কুল-কলেজ, অফিস-কাছারি সব নাকি অনির্দিষ্টকালের জন্যে বন্ধ থাকবে।
হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছ। এইমাত্র রেডিয়োতে বলেছে।
কই, দেখি, রেডিয়োটা দে তো।
রাকেশ রেডিয়োটা বাবাকে দিল। তারপর বইপত্র গুছিয়ে রেখে আবার ঝুলবারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল।
উলটোদিকের বাড়ির ছাদে তিনটে গাঢ় নীল রঙের পায়রা বসেছিল। ও-বাড়ির তপনদা পায়রা পোষে। সেদিকে তাকিয়ে থেকে রাকেশ ভাবছিল ও সত্যি, কী অদ্ভুত ব্যাপার! সূর্যের সাত রঙের ছ-ছটা রং উধাও হয়ে যাওয়ার জন্যে কী বিপত্তি! সারা পৃথিবীর জীবনযাত্রা একেবারে অচল। রাস্তাঘাটে গাড়ি চালানোও বিপজ্জনক। চারদিকে শুধু নীল রং অথবা কালো রং। আর তা নইলে তাদের কমবেশি মিশেল দিয়ে তৈরি কোনও নীলচে রং। এই ধরনের পরিবেশে গাড়ি চালাতে গিয়ে অভ্যেস না থাকায় ড্রাইভাররা হয়তো অ্যাকসিডেন্টই করে বসবে। সেইজন্যেই রেডিয়োতে যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখার অনুরোধ জানিয়েছে।
সিনেমা হলগুলোও বন্ধ থাকবে নিশ্চয়ই। নীল ছাড়া বাকি সব রং উধাও হয়ে গেলে রঙিন ছবির আর বাকি থাকল কী! আবার সাদা-কালো সিনেমাতেও একই বিপদ! সাদা রং বলে কিছু থাকবে না। তার বদলে শুধু নীল আর নীল! ঠিক টিভির মতোই দশা!
যতদিন রংগুলো ছিল ততদিন বোঝা যায়নি সেগুলো কত জরুরি। বোঝা যায়নি, সেগুলো না থাকলে লাগাতার বন্ধ শুরু হয়ে যাবে মানুষের জীবনে। এখন দিনগুলো কাটবে কেমন করে সেই নিয়েই রাকেশের চিন্তা।
বিকেলবেলায় বাবার কাছে শুনল, কলকাতার সমস্ত রং কোম্পানি নতুন কোনও ব্যবসা খোলার কথা ভাবছে। নানান দোকানে তাদের যত রং ছিল সব ভোল পালটে নীল অথবা কালো হয়ে গেছে। এদিকে বুড়ো মানুষদের চুলদাড়ি সব নীল হয়ে গিয়ে তাদের ভারী চমৎকার লাগছে। সেই দেখে কালো চুল যাতে তাড়াতাড়ি পেকে গিয়ে নীল হয়ে যায় তার জন্য মানুষ কৃত্রিম উপায়ে চেষ্টা করছে। বিভিন্ন সেলুনে কালো চুল নীল করার জন্যে হুড়োহুড়ি পড়ে গেছে।
