শেয়াল মিউমিউ করে ডাকছে! রাকেশ চমকে উঠল। আর তক্ষুনি ওর ঘুম ভেঙে গেল।
ঘুম ভাঙতেই দেখল বিছানায় ওর কোলের কাছে গুটিসুটি মেরে বসে আছে একটা নীল রঙের বিড়াল। মিউমিউ করে ডাকছে। কাচের গুলির মতো নীল চোখজোড়া জুলজুল করে রাকেশেরই দিকে তাকিয়ে। সরু বঁটার কাঠির মতো নীল রঙের গোঁফ। গায়ের রং গাঢ় নীল। শুধু লেজের ডগায় খানিকটা কালো ছোপ।
রাকেশ ভাবল, ওর স্বপ্নের ঘোর বোধহয় এখনও কাটেনি। ভাবল, চিমটি কেটে একবার দেখি তো! যেমন ভাবা তেমনি কাজ। কিন্তু চিমটি কাটতে গিয়েই আবার অবাক। এ কী! ওর ধবধবে ফরসা গায়ের রং এরকম নীল হয়ে গেল কেমন করে! তারপরই বাকি দুর্ঘটনাগুলো একে একে রাকেশের চোখে পড়ল।
ঘরের দেওয়াল, বিছানার চাদর, বালিশের ওয়াড়, টেবিল-চেয়ার, ফ্যান, ঘরের মেঝে– সর্বত্র শুধু নীল আর নীল। কোনওটার রং উজ্জ্বল নীল, কোনওটা ঘোলাটে নীল, কোনওটার রং কালচে নীল, আবার কোনওটা স্রেফ কুচকুচে কালো।
বিছানার বেড়ালটা তখনও মিউমিউ করে ডেকে চলেছে।
রাকেশ ধড়মড় করে উঠে বসল। পাশে মা নেই। অনেকক্ষণ আগেই ঘুম থেকে উঠে পড়েছেন। এখন নিশ্চয়ই রান্নাঘরে। রাকেশের কান্না পেয়ে গেল। কোনওরকমে চিৎকার করে ও ডেকে উঠল, মা, মা!
মা ছুটে এলেন প্রায় সঙ্গে-সঙ্গে।
মা-কে দেখে রাকেশের চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এল কালচে নীল গায়ের রং। চোখের তারাটুকু শুধু কালো, বাকি অংশটা উজ্জ্বল নীল। ঝকঝকে দাঁতেরও একই দশা। অবশ্য মাথার চুলগুলো কুচকুচে কালো–যেমন ছিল তেমনই রয়ে গেছে।
বিছানা থেকে নেমে একছুটে গিয়ে মা-কে জাপটে ধরল রাকেশ। শাড়ির ভাঁজে মুখ লুকিয়ে জড়ানো গলায় বলল, এসব কী কাণ্ড, মা? আমি কি ভুল দেখছি?
মা ওর মাথায় হাত বুলোতে লাগলেন। আশ্বাস দিয়ে বললেন, না রে, তোর চোখের ভুল নয়, আমরা সব্বাই ওই নীল রঙেরই সবকিছু দেখছি। সকালে ঘুম ভেঙেই দেখি এই দশা। তবে ভয়ের কিছু নেই। একটু আগেই রেডিয়োতে আর টিভিতে বলেছে, সারা পৃথিবী জুড়েই নাকি একইরকম কাণ্ড হয়েছে। এতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সব ঠিক হয়ে যাবে।
মায়ের কথায় রাকেশ বিশেষ ভরসা পেল বলে মনে হল না। ও বিছানার বসা বেড়ালটাকে দেখিয়ে বলল, ওই দ্যাখো।
মা হাসলেন, বললেন, ওটা তো তোর মিনু। রং পালটানোর ধাক্কায় ওর রঙও ওরকম নীল হয়ে গেছে। নে, এবার হাত-মুখ ধুয়ে পড়তে বোস দেখি।
মা-কে রোজকার মতো সহজ স্বাভাবিক দেখে রাকেশের বিস্ময় আর আতঙ্ক ধীরে-ধীরে কাটতে লাগল। মা ব্যস্তভাবে রান্নাঘরে চলে যেতেই ও টুথব্রাশে খানিকটা টুথপেস্ট লাগিয়ে নিল। টুথব্রাশের রং এমনিতেই নীল ছিল। অতএব ওটার রঙের তেমন রদবদল হয়নি। কিন্তু সাদা টুথপেস্ট একেবারে গাঢ় নীল রঙের হয়ে গেছে।
মুখ ধুতে বেসিনের কাছে গিয়ে রাকেশ যথারীতি আবিষ্কার করল সাদা ওয়াশ বেসিন ঘন নীল। এতক্ষণে ওর ভয়টা কেটে গিয়ে বেশ একটা মজা টগবগ করে উঠল। হাত-মুখ ধুয়ে ও এদিক ওদিক উঁকিঝুঁকি মেরে দেখতে লাগল।
মা রান্না ছেড়ে টানা বারান্দার রেলিঙে ভর দিয়ে পাশের বাড়ির টুকির মায়ের সঙ্গে গল্প। করছিলেন। হাসাহাসিও করছিলেন দুজনে।
রাকেশ শুনল, পাশের বাড়ির মাসিমা বলছেন, দিদি, ভাতের আজ যা চেহারা হয়েছে, টুকির বাবা ভাত খেয়ে অফিস গেলে হয়!
সত্যিই তো, নীল রঙের ভাত কি আর চাট্টিখানি ব্যাপার! রাকেশ ভাবল।
মা তখন বলছেন, আমারও তো একই অবস্থা, ভাই। ভাত, ডাল, হলুদ, লঙ্কা সব যে একেবারে ভোল পালটে ফেলেছে।
টুকির মা-কে বেশ চিন্তিত মনে হল। উনি বললেন, রাতারাতি এ কেমন ভোজবাজি হল বলুন তো, দিদি! আমার তো ব্যাপার-স্যাপার সুবিধের ঠেকছে না।
মা বললেন, একটু আগেই রেডিয়োতে বলেছে, বিজ্ঞানীরা এটা নিয়ে খুব মাথা ঘামাচ্ছেন। শিগগিরই এর সমাধান করে দিলেন বলে।
রাকেশ আর দাঁড়াল না। ছুট-পায়ে চলে এল রাস্তার দিকের ঝুলবারান্দায়।
ওমা! এ কী! আকাশে যে-সূর্যটা উঠেছে সেটার রংও যে ঘন নীল আকাশের নীল রঙের সঙ্গে ওটা প্রায় মিশে গেছে। আর চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে নীল রোদ্দুর। যে-কটা গাছপালা দেখা গেল সবই কালচে নীল। শুধু কালো রঙের কাকগুলো নীলরঙা টিভি-অ্যানটেনার ওপরে বসে একইরকমভাবে কা-কা করে ডাকছে।
রাকেশ মুগ্ধ চোখে চারদিক দেখতে লাগল।
একটু পরেই মা বারান্দায় এসে হাজির। হাতে একগ্লাস দুধ। ওকে ডেকে বললেন, নে রাকা, চটপট খেয়ে নে দেখি। উনুন জ্বলে যাছে।
রাকেশ ব্যাজার মুখে দুধের গ্লাস হাতে নিল। নীল রঙের দুধ! মায়ের দিকে মুখ তুলে আবদারের গলায় বলল, তুমিই বলো না, এরকম দুধ কেউ খেতে পারে?
মা ব্যস্তভাবে বললেন, পারে পারে, খুব পারে। যদি সবকিছুর রং এরকমটাই থেকে যায়, আর আগের মতো ফিরে না আসে, তা হলে অবস্থাটা কী হবে শুনি! নীল রঙের দুধ, ভাত, সবই তো খাওয়া অভ্যেস করতে হবে, তাই না? মানুষ তো আর না খেয়ে থাকতে পারবে না। নে, তুই চটপট খেয়ে গ্লাসটা বেসিনের কাছে রেখে দিস, আমি যাই।
মা ব্যস্ত পায়ে চলে যাচ্ছিলেন, রাকেশ জিগ্যেস করল, বাবা এখনও আসেনি?
মা বললেন, উঁহু। প্রায় একঘণ্টা তো হয়ে গেল বাজারে গেছে। মনে হয়, বাজারে আজ হইচই পড়ে গেছে। নে, দুধটা জলদি খেয়ে নে।
মা হুউশ করে চলে গেলেন।
