চকিতে কোথা থেকে ছিটকে এল নীল বিদ্যুৎ। গাঢ় নীল রং ভদ্রলোকের শরীর একেবারে ভাসিয়ে দিল। আমার মুখে প্রায় এসে গিয়েছিল, ডাক্তার ডেকে আর কোনও লাভ নেই। কিন্তু অনেক কষ্টে সেটা থামালাম। ওঁকে শুধু বললাম, আপনি শিগগিরই একবার বাড়ি যান–আপনার স্ত্রীর সঙ্গে শেষবারের মতো দেখা করুন, কথা বলুন।
ভদ্রলোক বাড়ি ফেরার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ওঁর স্ত্রী মারা গিয়েছিলেন। আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল বিনু। সঙ্গে-সঙ্গে কাছেই কোথাও কড়কড় করে বাজ পড়ল। আমরা অনেকেই চমকে উঠলাম।
বিনু নিচু গলায় বলল, ভদ্রলোক, পরে আমাকে কোনও প্রশ্ন করেননি। বরং হাত দুটো ধরে ভেজা চোখে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বারবার বলেছেন, আপনার জন্যেই ওকে শেষ দেখা দেখতে পেলাম, মুখে জল দিতে পারলাম।
বিশ্বাস করুন, এসবের আমি কোনও ব্যাখ্যা পাইনি। তবে ঘটনাগুলো সব সত্যি–গপ্পো নয়।
বিনুর গল্প শেষ হল। আমরা সব চুপচাপ। যেন শ্মশানে মড়া পোড়াতে এসেছি। বৃষ্টির তেজ কিছুটা কমেছে। তবে রিমঝিম শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। আর মাঝে-মাঝে মেঘের ডাক।
রুনি থমথমে মুখে বিনুর কথা শুনছিল। বিনু থামতেই লক্ষ করলাম, রুনির চোখে জল। ও মুখে আঁচল চাপা দিল। তা সত্ত্বেও একটু-আধটু কান্নার গোঙানি শোনা যাচ্ছিল।
রণজিৎ বউকে প্রায় ধমকে উঠল : কী হচ্ছে কী, রুনি! তোমাকে বলছি না, এসব গাঁজাখুরি গপ্পো। তোমাদের ভয় পাওয়ানোর জন্যে বিনুবাবু এসব বানিয়ে বানিয়ে বলছেন–।
নিরুপম হাতের সিগারেটটা টেবিলে রাখা অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিয়ে বলল, আমি তোমাকে সাপোর্ট করছি, রণজিন্দা। অল বোগাস!
প্রেমতোষ মানিনীর কাঁধে হাত রেখে জড়ানো গলায় বলল, শুনলে তো, মানিনী ব্রাদার। তোমাকে কতবার বলেছি, সুপারন্যাচারালে অবিশ্বাস কোরো না।
রুনি তখনও কান্না চাপতে চেষ্টা করছিল।
ওকে ধমক দিতে দিতে রণজিৎ আচমকাই খেপে গেল। বিনুর দিকে ফিরে টেবিলে দড়াম করে এক কিল বসিয়ে দিয়ে ও পাগলের মতো চিৎকার করে বলে উঠল, কাম অন, শ্রীবিনোদন অধিকারী। এবারে সত্যি কথাটা ফস করুন। বলুন, সব আপনার বানানো গাঁজাখুরি ঢপের কীর্তন, বলুনকাম অন!
বুঝতে পারছিলাম, রণজিতের নেশা চড়ে গেছে।
নিরুপম ওকে সামলাতে চেষ্টা করছিল। আমার ভয় হচ্ছিল, আমাদের নেশার টেবিলটাই না উলটে যায়।
হঠাৎই আমাদের অবাক করে দিয়ে বিনু উঠে দাঁড়াল, বলল, ঠিক আছে। আপনারা যখন অবিশ্বাস করছেন তখন দেখাচ্ছি। দেখে বলুন, কীসের কীর্তন। তবে আমাকে যেন দোষ দেবেন না।
বিনুর চোয়াল শক্ত, চোখ ঠান্ডা। অপলকে রণজিৎকে দেখছে।
রণজিৎ হিংস্র চোখে বিনুর দিকে তাকিয়ে ব্যঙ্গের হাসি হাসল। দাঁতে দাঁত ঘষে বলল, শালা, চিট কোথাকার!
রণজিতের হাসিতে নিরুপম আর সরস্বতীও যোগ দিল। কিন্তু ব্যাপারটা আমার মোটেই ভালো লাগছিল না।
বিনু ভারী গলায় বলল, আমাকে কিন্তু কেউ দোষ দেবেন না যেন।
তারপর চটপটে পায়ে এগিয়ে গেল আলোর সুইচের দিকে। এবং আলো নিভিয়ে দিল।
অন্ধকার ঝাঁপিয়ে পড়ল ঘরে। বৃষ্টির শব্দটা যেন আচমকাই জোরালো শোনাল কানে। আমরা টুকরো-টুকরো কথা বলছিলাম। কে যেন বলল–বোধহয় মানিনী–এ কী! আলো নেভালেন কেন?
বিনু সে-প্রশ্নের কোনও উত্তর না দিয়ে বলল, সাবধান!
সঙ্গে-সঙ্গে ঘরের নীল রঙের নাইটল্যাম্পটা জ্বেলে দিল বিনু।
অন্ধকার ঘরে নীল আলোর তরঙ্গ পলকে মায়া ছড়িয়ে দিল। আর আমরা সবাই হুড়োহুড়ি করে আড়াল খুঁজতে লাগলাম–নীল আলো যেন কিছুতেই আমাদের গায়ে না পড়ে।
আবছা আলোর সবাইকে ছায়া-ছায়া দেখাচ্ছিল। দেখলাম, কেউ হামাগুড়ি দিয়ে টেবিলের নীচে ঢুকতে চাইছে। কেউ ছুটল ফ্রিজের আড়ালে। কেউ চলে গেল আলনার পাশে। কেউ বা শাড়ির আঁচল মাথায়-মুখে জড়িয়ে নিয়ে নীল আলোর হাত থেকে বাঁচতে চাইল।
ঘরে কোনও শব্দ নেই। শুধু বৃষ্টির ছমছম নুপুর। মাথার ওপরে সিলিং ফ্যানের সামান্য কিচকিচ ম্যারাকাস। আর আমরা সাতজন যে-যার জায়গায় দমবন্ধ করে লুকিয়ে আছি। থরথর করে কঁপছি।
ঠিক তখনই ডানা ঝাঁপটে একটা ভেজা পায়রা ঢুকে পড়ল ঘরে। ওটার ডানার ঝাঁপটের সঙ্গে-সঙ্গে শান্তির জলের মতো জল ছিটকে পড়ছিল আমাদের গায়ে। নীল আলোর অন্ধকার পাখিটা দু-পাক ওড়ার পরই ফ্যানের ব্লেডে ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়ল মেঝেতে। পড়েই নিথর হয়ে গেল।
মেয়েদের মধ্যে কে যেন ভয়ে চিৎকার করে উঠল।
একইসঙ্গে নীল আলোটা নিভে গেল।
নীলবর্ণ বিড়াল
রাকেশ ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে নীলবর্ণ শৃগালের স্বপ্ন দেখছিল।
কাল রাতে সদ্য-সদ্য গল্পটা পড়েছে ও। আচমকা নীলের গামলায় পড়ে গিয়ে নীল রঙের চেহারা হয়ে গিয়েছিল বেচারা শেয়ালটির। তারপর যখন সে জঙ্গলে ফিরে গেল তখন সমস্ত পশু পাখি তাকে জঙ্গলের রাজা বলে মেনে নিল। কারণ, নীল রঙের শেয়াল তো তারা জীবনে কখনও দেখেনি! অতএব সেই অদ্ভুত রঙের প্রাণীটিকেই তারা সকলে মেনে নিয়েছিল বনের রাজা বলে।
রাকেশ দেখছিল, একটা নীল রঙের শেয়াল ওকে এসে ডাকছে, রাকেশবাবু, আমি কিন্তু গল্পের শেয়াল নই। সত্যিকারের নীল রঙের শেয়াল।
রাকেশ অবাক হয়ে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থেকে জিগ্যেস করল, সত্যি?
শেয়ালটা বলল, সত্যি।
আর তারপরই রাকেশকে হতভম্ব করে দিয়ে মিউমিউ করে ডেকে উঠল।
