মানিনী সামনের প্লেট থেকে তিনটে পকোড়া মুঠো করে তুলে নিল। তার একটা মুখে পুরে চিবোতে চিবোতে জিগ্যেস করল, কী হল তারপর?
রুনি সিরিয়াস গলায় বলে উঠল, কাকাও কি আপনার মায়ের মতো চলে গেলেন?
দীর্ঘশ্বাস ফেলল বিনু! বলল, হ্যাঁ–তবে একটু অন্যরকমভাবে। ব্যাপারটা বলছি।
আমি বাড়ির দিকে এগোচ্ছি, কাকা হঠাৎই দোতলা থেকে আমাকে দেখতে পেলেন। দেখেই হাসলেন সামান্য। আর তখনই সার্চলাইটের মতো একটা তীব্র নীল আলো কাকার গায়ে ঠিকরে এসে পড়ল। দিনেদুপুরে কাকা শ্রীকৃষ্ণের মতো নীলে নীল হয়ে গেলেন। কিন্তু সে কয়েক সেকেন্ডের জন্যে। তারপরই আলোটা ফস করে মিলিয়ে গেল।
আমি বাড়িতে ঢুকে হাত-মুখ ধুয়ে সবে খেতে বসব, ঠিক তখনই ধড়াম শব্দটা শুনতে পেলাম। সে এমন বিকট শব্দ যেন ভূমিকম্পে কোনও টাওয়ার ভেঙে পড়েছে।
একছুটে বাইরে বেরিয়ে দেখি, আমাদের ঝুলবারান্দাটা গলিতে ভেঙে পড়েছে। আর সেই ধ্বংসস্তূপের মধ্যে কাকার রক্তাক্ত দেহটা লুটোপুটি খাচ্ছে সারা গা সিমেন্ট-বালি আর ধুলোয় মাখামাখি। দেখেই বোঝা যাচ্ছিল কাকা আর নেই।
থামল বিনু। হাতের গ্লাসটা শব্দ করে টেবিলে রেখে সকলের মুখের ওপরে চোখ বুলিয়ে নিল। তারপর ও এটাকে আপনারা কী বলবেন?
সরস্বতী সঙ্গে-সঙ্গে জবাব দিল, কেন, কাকতালীয়। এ ছাড়া আর কী!
নিরুপম তেমন তুখোড় নাবিক নয়। তাই জলপথ ছেড়ে স্থলপথে এল। একটা সিগারেট ধরিয়ে বলল, কিছু মনে করবেন না, বিনুবাবু–ওই নীল আলোটা আপনার দেখার ভুল। আর অ্যাক্সিডেন্টটা সিপ্ল কোইনসিডেন্স। এরকম কেসের কথা অনেক শুনেছি।
বিনু হাসল। বলল, আপনি আপনার মত জাহির করতেই পারেন। কিন্তু ব্যাপারটা একবার ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখুন। সেদিন দুপুরে আমার শ্যামবাজারে আসা, পেট-চোঁ-ঠোকরা খিদে পাওয়া, বাড়িতে আচমকা ভাত খেতে যাওয়া, কাকার সঙ্গে শেষ দেখা–এবং তারপরই ওই অ্যাক্সিডেন্ট। এতগুলো কাকতালীয় এমনি-এমনি হতে পারে না, নিরুপমবাবু। আসলে কাকা আমাকে টানছিলেন। একবার শেষ দেখা দেখতে চাইছিলেন। ছোটবেলায় বাবা মারা যাওয়ার পর অনেক আদর-যত্নে আমাকে মানুষ করেছিলেন। আমার জন্যে কাকার ভীষণ টান ছিল…।
রুনি হঠাৎ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। রণজিৎ তাড়াতাড়ি চেয়ার ছেড়ে উঠে চলে এল বউয়ের কাছে। ওর গায়ে-মাথায় বারবার হাত বোলাতে লাগল আর জড়ানো গলায় বলতে লাগল, কী হয়েছে? কঁদছ কেন? কী হয়েছে, বলো না।
আমরাও বেশ অপ্রস্তুত হয়ে পড়লাম। নিরুপম সিগারেটে টান দিয়ে বিড়বিড় করে বলে উঠল, মনে হয় ভয় পেয়েছে। তারপর রুনির দিকে তাকিয়ে বলল, ভয়ের কী আছে! আমরা তো আছি!
রুনি চোখ-টোখ মুছে নিজেকে সামলে নিল। শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখটা ভালো করে মুছে বলল, সরি, আপসেট হয়ে পড়েছিলাম।
মানিনী জিগ্যেস করল, কেন বলো তো?
একটু ইতস্তত করে রুনি বলল, আমার মায়ের কথা মনে পড়ছিল। মা গ্রুপ থিয়েটারে অ্যাক্টিং করত। একবার…একবার…জলে ডুবে যাওয়ার একটা সিন দেখানোর সময় মায়ের গায়ে নীল আলো ফেলা হল। সেই নাটকের শো করার সময় মায়ের স্ট্রোক হয়েছিল। তখন…সেই…সেই ডুবে যাওয়ার সিনটা হচ্ছিল। মা স্ট্রোক হয়ে মারা গেল…। আবার ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করল রুনি।
রণজিৎ ব্যস্তভাবে বলল, কীসব আলতুফালতু বকচ্ছ! ওটা সিম্পলি একটা অ্যাক্সিডেন্ট নাথিং এস।
প্রেমতোষ ভারী গলায় মন্তব্য ছুঁড়ে দিল, নীল আলোর একটা দ্রব্যগুণ থাকলেও থাকতে পারে, ব্রাদার। ওই আলোটা দেখলেই আমার গা-টা কেমন কিরকির করে ওঠে।
সরস্বতী বলে উঠল, থামুন তো! যত্তসব গাঁজাখুরি ব্যাপার! ধরেই নিন না যে, বিনুদা গপ্পো শোনাচ্ছেন! কী বিনুদা, ঠিক বলিনি?
শেষ প্রশ্নটা বিনুকে লক্ষ করে।
উত্তরে বিনু অদ্ভুত হেসে বলল, যদি গপ্পো হয়, ম্যাডাম, তা হলে আমার গপ্পো এখনও শেষ হয়নি।
আমার হঠাৎই মনে হল, এই বর্ষা-ঝমঝম রাতে বিনু আমাদের স্রেফ ভয় দেখানোর জন্যে এসব গল্প বানিয়ে বানিয়ে শোনাচ্ছে না তো! কিন্তু ওর গল্পের ওই এক মুশকিল সত্যি, না মিথ্যে, কিছুতেই বোঝা যায় না।
রণজিৎ মজা করার ঢঙে বলল, বিনুবাবু, আর কী গল্প বাকি আছে তাড়াতাড়ি বলে ফেলুন। আমার খিদেটা বেশ চাগিয়ে উঠেছে। আর রান্নাঘর থেকে যা মাংসের গন্ধ আসছে–আর বেশিক্ষণ তর সইছে না।
বিনু গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলল, আর খুব বেশি বলার নেই। শুধু ছোট্ট দুটো ঘটনা বলব।
একদিন বিকেলে শোভাবাজার এলাকা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি, একটা বাড়ির রোয়াকের দিকে নজর গেল। বাড়িটায় বড় মাপের সদর দরজার দুপাশে পুরোনো দিনের উঁচু লাল রোয়াক। একটা বছর আষ্টেকের ফ্রক-পরা বাচ্চা মেয়ে রোয়াকের একপাশ থেকে লাফিয়ে আর একপাশে যাচ্ছে। আবার লাফিয়ে ফিরে আসছে।
হঠাৎই মেয়েটার হলদে ফ্রকের ওপরে নীল আলো ঢেউ খেলে গেল। হলদে ফ্রকটা ঘোর সবুজ রঙের হয়ে গেল। সঙ্গে-সঙ্গে আমার মনে হল, এক্ষুনি মেয়েটা মুখ থুবড়ে পড়বে। আর হলও ঠিক তাই। একপাশ থেকে লাফিয়ে আর-এক পাশে যেতে গিয়ে মেয়েটা মাপে ভুল করল এবং ওর থুতনিটা রোয়াকের কোনায় আছড়ে পড়ল। সে একেবারে রক্তারক্তি কাণ্ড! তবে আমার মা কিংবা কাকার মতো মেয়েটার মারাত্মক কিছু হয়নি।
আর শেষ ঘটনাটা গত সপ্তাহের। আমি দানাপুরে ছিলাম। হঠাৎ দেখি আমার চেনা একজন ভদ্রলোক এক নামকরা ডাক্তারের বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে ডাক্তারবাবুকে খুব ডাকাডাকি করছেন। আমি জিগ্যেস করলাম, কী ব্যাপার? উনি বললেন যে, ওঁর স্ত্রী হঠাৎ একটু অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।
