সে যা হোক–সেদিন রাতে রাত তখন বারোটা তো হবেইমা পাশের ঘরে শুয়ে-শুয়ে প্র্যাকটিক্যালি প্রলাপ বকছিল। ঘুম আসছে না বলে আপনমনেই বকবক করছিল আর মাঝে-মাঝে আমাকে ভালো করে পড়ার কথা বলছিল। এতে আমার পড়ার ভীষণ ডিসটার্ব হচ্ছিল। কয়েকবার চেঁচিয়ে বললাম, কী হচ্ছে, চুপ করো না! কিন্তু তাতে কাজ হল না। তাই একসময় আর থাকতে না পেরে উঠে গেলাম মায়ের ঘরের দরজায়।
নাটকের আচমকা সিন চেঞ্জ হলে যেমনটা হয়, আমার মনে হল, সেরকমই কিছু একটা হল। একটা ছায়া যেন সড়াৎ করে সরে গেল, আর নীল রঙের একটা আলো মায়ের ঘরটা ভরিয়ে দিল। অথচ চারদিকে তাকিয়েও আমি আলোটা কোথাও খুঁজে পেলাম না। স্টেজের আলো যেমন আড়ালে লুকিয়ে থাকে বোধহয় সেরকমই কিছু একটা হবে।
বিছানার দিকে তাকিয়ে দেখি, বিছানায় মা নিশ্চল হয়ে শুয়ে আছে। আর একটা অদ্ভুত ব্যাপার দেখে আমি একেবারে পাথর হয়ে গেলাম। মায়ের শরীরটা ভীষণ ছোট হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে, আড়াই ফুট কি তিন ফুট মাপের একটা পুতুল।
আমি মা! মা! করে কয়েকবার ডাকলাম। সুইমিং পুলের জলে ঢিল পড়লে পাশের দেওয়ালে জলের ছায়া যেমন কাপে, নীল আলোটা সেরকমই কঁপতে লাগল। আর আমি হঠাৎই খুব ভয় পেয়ে গেলাম। তবে কেন, তা জানি না।
বিনু একটু থামল। সকলের চোখের দিকে তাকাল। তারপর গ্লাস তুলে হুইস্কিতে আলতো করে চুমুক দিল।
রুনি জিগ্যেস করল, তারপর কী হল?
লক্ষ করলাম, ওর মুখ বেশ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। চোখে যেন অল্পস্বল্প আতঙ্কের ছায়া।
বিনু একটু বিষণ্ণ হাসল : তারপর? তারপর নীল আলোটা হঠাৎ সরে গেল। সবকিছু আবার ঠিকঠাক হয়ে গেল–শুধু আমার মা ছাড়া। বারবার ডেকেও আমার প্রলাপ-বকা মায়ের কোনও সাড়া পেলাম না। তখন কাছে গিয়ে গায়ে হাত দিয়ে বুঝলাম, মা চলে গেছে।
বিনু থামল। কিছুক্ষণ আমরা সবাই চুপচাপ। শুধু বৃষ্টির শব্দ শোনা যাচ্ছে। বেশ বুঝতে পারছিলাম, ঘরের আবহাওয়াটা কেমন যেন বদলে যাচ্ছে।
হঠাৎই স্তব্ধতা ভাঙল প্রেমতোষ। বলল, ধুস! ওসব আপনার মনের ভুল–মানে দেখার ভুল। মাঝে-মাঝে অনেকেরই ওরকম হয়, ব্রাদার। ইংরেজিতে এটাকে বলে হ্যাঁলু কী যেন হাঁ– হ্যালুসিনেশান–। তবে সুপারন্যাচারাল বলে সত্যি-সত্যি একটা মাল আছে।
বিনু ঠোঁটে হাসল : হ্যালুসিনেশান? কে জানে! হতেও পারে। তবে আমি যা দেখেছি সেটাই বললাম।
রুনি কেমন যেন চাপা গলায় বিনুকে জিগ্যেস করল, তখনও আপনার মা কি মাপে ওরকম ছোটই ছিল?
না। গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলল বিনু, সাইজটা তখন আবার নরমাল হয়ে গিয়েছিল।
লক্ষ করলাম, রণজিৎ কেমন যেন উদাসীন হয়ে গেছে। স্থির চোখে ও তাকিয়ে আছে বিনুর মুখের দিকে।
সরস্বতী হঠাৎই সপ্রতিভ হওয়ার চেষ্টা করে বলল, যতই বলুন বিনুদা, এ থেকে আপনি কখনওই কনফার্ড হতে পারেন না যে, নীল আলো মানেই একটা ইয়ে মানে, অ্যাবনরমাল ব্যাপার।
বিনু আবার হাসল ও অ্যাবনরমাল নয়, বরং প্যারানরমাল বলুন। তা ছাড়া ম্যাডাম, ওই একবার তো নয়…আমার কাকার বেলায়…।
কী হয়েছিল তোমার কাকার বেলায়? আমি জিগ্যেস করলাম।
সঙ্গে-সঙ্গে বিনু আবার বলতে শুরু করল।
কাকার ঘটনাটা ঘটেছিল মা মারা যাওয়ার বছর ছয়েক পর। আমি তখন কিছুদিনের জন্যে সেসে ঢুকেছিলাম। বাড়ি-বাড়ি ঘুরে কাপড় কাঁচার গুঁড়ো সাবান বিক্রি করতাম আর কমবয়েসি একদল ছেলেমেয়েকে এইরকম পুশ সেলের কায়দাকানুন শেখাতাম। আমি রোজ সকাল-সকাল বেরোতাম।
তো একদিন সকাল সাড়ে আটটায় বেরিয়ে সাউথ ক্যালকাটা চষতে শুরু করেছি। এইভাবে কাজ করতে করতে দুপুর হলে আমি রাস্তার কোনও পাইস হোটেল-ফোটেলে ভাত খেয়ে নিতাম। এটাই ছিল বলতে গেলে রোজকার রুটিন। তো সেদিনও তাই হওয়ার কথা কিন্তু হল না।
কাজ করতে করতে এ-পাড়া-ও-পাড়া ঘুরতে-ঘুরতে হঠাৎই একসময় খেয়াল করলাম, আমি শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়ে দাঁড়িয়ে আছি।
আপনাদের বলেছি কি না জানি না আমাদের আদিবাড়ি পাইকপাড়ায় টালা পার্কের পেছনটায় একটা গলির ভেতরে। তো শ্যামবাজারের মোড়ে এসে ভাবলাম, এখানে যখন এসেই পড়েছি, তা হলে আমাদের কোম্পানির যে ছোট্ট অফিসটা বৃন্দাবন পাল লেনে আছে, সেখানে একবার দেখা করেই যাই। তারপর আমার সিঁথির মোড়ের দিকে রওনা হওয়ার কথা। কিন্তু খিদেয় পেট এমন চেঁ-চেঁ করে উঠল যে, অফিসে কথা শেষ করার পর হঠাৎ মানে, একেবারে আচমকা– মনে হল, বাড়ির কাছাকাছি যখন চলে এসেছি তখন বাড়িতে গিয়ে কাকিমার হাতের রান্না খেলে কেমন হয়!
আমি যে সেলসের কাজে ঘুরতে-ঘুরতে শ্যামবাজারের দিকে এসে পড়ব এটা আমার আগে জানা ছিল না। তখন যে আমার খিদে পাবে সেটাও জানতাম না। কোম্পানির সেক্স অফিসটায় যেমন আচমকা গিয়ে হাজির হয়েছি ঠিক তেমনই আচমকা আমি বাড়িতে গিয়ে হাজির হলাম।
বাড়ির গলিতে ঢুকতেই দেখি আমার কাকা খালি গায়ে দোতলার ঝুলবারান্দায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন। কাকা আমার বাবার একমাত্র ভাই। বয়েস ছাপ্পান্ন-কি-সাতান্ন হলেও স্বাস্থ্য ভালোই। একটু আধটু ব্লাড সুগারের প্রবলেম ছাড়া আর কোনও প্রবলেম ছিল না। কিন্তু তা সত্ত্বেও।
হঠাৎই চুপ করল বিনু। গভীর মনোযোগে হুইস্কির গ্লাস তুলে নিয়ে তাতে দুবার চুমুক দিল।
