বিনু সে কথা সরস্বতীকে বলল, ম্যাডাম, নিরুপমবাবু অফিসে বেরিয়ে গেলে আপনার একা একা থাকতে ভয় করে না?
সরস্বতী চোখ কপালে তুলে জবাব দিল, একা কোথায় থাকি? সঙ্গে তিন ডজন গোলাপায়রা আছে না!
একথায় আমরা দলবেঁধে হেসে উঠলাম। সত্যি, নিরুপমদের বাড়িতে কিছু গোলাপায়রা আছে বটে!
এরপর সরস্বতী আমাদের বোঝাতে লাগল, নির্জন বাড়িতে থাকার কী কী সুবিধে। তার মধ্যে একটা হচ্ছে, লাগাতার হানিমুন এনজয় করা যায়। এবং নির্জনতার সুযোগে নিরুপম ওর সঙ্গে কী কী ধরনের কেলেঙ্কারি করে বেড়ায় সেসব রসিয়ে রসিয়ে বলতে লাগল।
নিরুপম একবার মিনমিন করে বলল, মাইরি, আমার বউটার সব ভালো–শুধু একটু নির্লজ্জ টাইপের।
সঙ্গে-সঙ্গে সরস্বতী স্বামীর ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওর পিঠে একটা কিল বসিয়ে দিয়ে বলল, আর নিজে কী!
ওদের সবে তিনবছর বিয়ে হয়েছে। সেই তুলনায় আমি, রণজিৎ আর প্রেমতোষ বেশ পুরোনো।
রণজিৎ হঠাৎ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, তুমি খুব লাকি, নিরুপম, যে একটা নির্লজ্জ বউ পেয়েছ। আমারটা ভাই বড় বেশি লজ্জাবতী।
ব্যস, সঙ্গে-সঙ্গে বর-বউদের হুলুস্থুল লেগে গেল। হইহুল্লোড়ের মধ্যে আড্ডা সরগরম হয়ে উঠল।
সরস্বতী আড্ডার ফাঁকে-ফাঁকে আমাদের সেবা করতে লাগল। ওর সঙ্গে হাত লাগাল রুনি আর মানিনী। কেয়া থাকলে আর-একটু সুবিধে হত।
সরস্বতী স্কুলের মেয়ের মতো টগবগ করে রান্নাঘর আর বসবার ঘরের মধ্যে ছুটে বেড়াচ্ছিল আর একইসঙ্গে নানান কথার খই ফোঁটাচ্ছিল।
প্রেমতোষ বেশ মোটাসোটা গম্ভীর মানুষ। ও হাত মুঠো করে সিগারেট পাকড়ে ধরে তাতে কড়া টান দিচ্ছিল। হঠাৎ ও বলে উঠল, নাও নিরুভাই, আর দেরি কোরো না–দোকান খোলো। একটু পেট্রল না নিলে গাড়ি তো ভাই আর চলছে না!
মানিনী বেশ খাটো চেহারার। ফরসা সুন্দর গোলগাল মুখ। চোখে চশমা। স্বামীর কথায় চোখ ঘুরিয়ে বলল, ওর এই এক বদ নেশা। মদ না পেলে চলে না।
সেইজন্যেই তো আমার ডাকনাম মদ-অন, মানে মদন। আর যারা মদ দেখলেই না, না বলে তাদের ডাকনাম মদ-না। বলে প্রেমতোষ গলা ছেড়ে হেসে উঠল।
হেসে উঠলাম আমরাও।
নিরুপম আর সরস্বতী মিলে টেবিলে পেঁয়াজের পকোড়া, বোতল, গ্লাস, ঠান্ডা জল–সব সাজিয়ে দিতে লাগল।
প্রেমতোষ তখন ধোঁয়া ছাড়ছে আর গুনগুন করে গাইছে, ইয়ে লাল রঙ্গ কব মুঝে ছোড়েগা–।
হঠাৎই ডানা ঝটপটিয়ে একটা গোলাপায়রা ঢুকে পড়ল ঘরের মধ্যে।
রুনি ভয়ে চেঁচিয়ে উঠল। আমি আর রণজিৎ চেয়ার ছেড়ে চট করে উঠে পড়লাম। নিরুপম বোতল আর গ্লাসগুলো সামলাতে লাগল।
পায়রাটা ঘরের মধ্যে ডানা ঝাঁপটে এলোমেলো উড়ে বেড়াচ্ছিল। ওটার ভেজা ডানা থেকে জল ছিটকে পড়ছিল চারিদিকে।
আমরা তাড়াহুড়ো করে ঘরের এক কোণে সরে গেলাম। শুধু বিনু আর নিরুপম জায়গা ছেড়ে উঠল না। রুনি আর মানিনী দূর থেকেই হুস-হুঁস শব্দ করে পায়রাটাকে তাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগল।
কয়েক পাক এলোমেলো ওড়ার পর পায়রাটা রান্নাঘরের কাছে ফ্রিজের ওপরে গিয়ে বসে পড়ল। তখন ভালো করে খেয়াল করলাম, ওটার সারা গা বৃষ্টিতে ভেজা। পালক থেকে জল ঝরছে। বেশ হাঁপাচ্ছে।
চিৎকার চেঁচামেচি শুনে সরস্বতী বেরিয়ে এসেছিল রান্নাঘর থেকে। ও খপ করে পায়রাটাকে ধরে ফেলল। ওটার মাথায় চুমু খেয়ে বলল, বোধহয় বেড়ালে তাড়া করেছে। যাই, ওকে উঠোনের খোপে রেখে আসি।
প্রেমতোষ বলল, ভাগ্যিস শালা টেবিলটার ওপরে এসে পড়েনি! সব ভেঙেচুরে কেলো হয়ে যেত!
মানিনী বলল, হুঃ! যে আছে যার চিন্তায়। ফ্যানে ঠোক্কর খেলে পায়রাটা মরেই যেত।
রণজিৎ ফিরে এসে সোফায় বসতে-বসতে বলল, আসলে টিউব লাইটের আলোর বেচারার চোখ ধাঁধিয়ে গেছে।
ঠিক তখনই বিনু মন্তব্য করল, এক-একরকম আলোর এক একরকম এফেক্ট আছে।
ব্যস, আমি গল্পের গন্ধ পেয়ে গেলাম। সঙ্গে-সঙ্গে চেপে ধরলাম বিনুকে–উসকেও দিলাম।
ততক্ষণে আমাদের পানাহার শুরু হয়ে গেছে। মেয়েরা পেঁয়াজের পকোড়া আর চা। আর আমরা চা-এর বদলে প্রেমতোষের ভাষায় পেট্রল।
প্রেমতোষের একটা অভ্যেস হল, মদ খাওয়া শুরু করলেই ও সবাইকে ব্রাদার বলে ডাকে। সুতরাং আমার ওসকানির পর ও বিনুকে একরকম বায়না করেই চেপে ধরল : আর-একটু খুলে বলুন, ব্রাদার, কেসটা কী। বেশ ধীরে-ধীরে রসিয়ে রসিয়ে খুলুন, ব্রাদার–তা হলে হেভি জমবে।
বিনু গ্লাসে চুমুক দিয়ে আমার দিকে তাকাল। চাপা দুষ্টুমির হাসি হেসে যেন নীরব অনুমতি চাইল। তারপর ওর নিজস্ব ঢঙে বলতে শুরু করল।
ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছিল। উত্তরের একটা আধখোলা জানলার বাইরে একটুকরো কালো আকাশ। সেখানে সাদা আলোর রেখা ঝিকিয়ে উঠল। তারপরই বাজ পড়ল বিকট শব্দে। স্পষ্ট দেখলাম, রুনি চমকে উঠল। মানিনী হাত রাখল প্রেমতোষের উরুতে।
মানে, আমি বলতে চাইছি…নানা রঙের আলোর নানান রকম এফেক্ট। তবে তার মধ্যে নীল আলোটা সবচেয়ে বাজে সবচেয়ে ডেঞ্জারাস। বিনু হাতে হাত ঘষল। একটা পেঁয়াজের পকোড়া মুখে দিল। কিছুক্ষণ চোয়াল নাড়ার পর বলল, অনেকদিন আগের কথা। বাবা মারা যাওয়ার পর তখন বছর ছয়েক কেটে গেছে। আমি তখন হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা দেব। বাড়িতে ছোট্ট একটা ঘরে বসে হেভি পড়াশোনা করছি। পাশের ঘরে আমার রুগ্ণ মা শুয়ে আছে। মা বহুদিনের গ্যাসট্রিকের রুগি। আমার লেখাপড়া নিয়ে সবসময় ভীষণ চিন্তা করে, আর দিন-রাত বলে পড়, ভালো করে পড়। রেজাল্ট ভালো করতে হবে। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে এসব কথা মা এত বেশি বলত যে, আমার ভীষণ বিরক্ত লাগত। অনেক সময় মাকে রুক্ষভাবে জবাবও দিতাম। বলতাম, কী হচ্ছে! এসব কথা দিন-রাত ঘ্যানঘ্যান করলে আর পড়া যায়!
