.
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে একটা লম্বা শ্বাস ছাড়ল হরপার্বতী। তারপর বলল, এটা সেই রেসপেক্টেক্ল সিচুয়েশানের ছবি, সনাতন–যদিও প্রচুর ধোঁয়া থাকায় ব্যাপারটা ঠিকমতো বোঝা যাচ্ছে না। আমাদের আজকের রমরমা ব্যবসার গোড়াপত্তন হয়েছিল এইভাবে। তাই এই ছবিকে প্রণাম করে আমি দিন শুরু করি।
ওর ভাবগদগদ মুখের দিকে তাকিয়ে মনে-মনে ঠিক করলাম, আজ থেকে চামচিকেকে আর অবহেলা করব না। কারণ, আমার বেকারির ব্যবসাও বড় করতে হবে।
নীল আলো ভালো নয়
বুঝলে? বলেই সামনে রাখা প্লেটের দিকে হাত বাড়াল বিনু। দুটো পেঁয়াজের পকোড়া টুক করে তুলে মুখের ভেতর ছুঁড়ে দিল।
ওর কথায় আমি অবাক হয়ে গেলাম। এ আবার কোন দেশি কথা? নীল আলো ভালো নয় মানে?
সে-কথাই জিগ্যেস করলাম বিনুকে।
তাতে ও শব্দ করে হাসল। তারপর বড়া চিবোতে-চিবোতে জড়ানো গলায় বলল, এক এক রঙের আলোর এক-একরকম গুণ আছে কিংবা দোষও বলতে পারো। যেমন, নীল আলো। এই আলোটার ইয়ে…মানে, দোষ আছে।
আমি মাথা নেড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। সত্যি, বিনু পারেও বটে! এরকম একটা জমাটি আড্ডার মাঝে সবাইকে চমকে দেওয়ার জন্যে ও দেখছি একটা নতুন ধাঁচের মতলব ফেঁদেছে।
বিনু বিনোদন অধিকারী আমার স্কুলের বন্ধু। স্কুলের পর কলেজ পেরিয়ে ও কলকাতা ছেড়ে উধাও হয়ে গিয়েছিল। ওর কাছেই শুনেছিলাম, ও নাকি ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টে চাকরি নিয়েছে। ভারতের নানান বনাঞ্চলে টইটই করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। একবার হাফলঙে ওর কাছে আমি বেড়াতেও গিয়েছিলাম।
শ্রীবিনোদন অধিকারীর গোটা ব্যাপারটাই আমার কাছে রহস্যময়। ও যে কখন কোথায় ঘুরে বেড়ায়, চাকরি রেখেছে না ছেড়েছে, সত্যি-সত্যি বিয়ে করেছে না করেনি–এসব কিছুই আমি ভালো করে জানি না।
তার কারণ, ও যখন যা বলে সবটাই আমি-আমি করে বলে–যেন সবই ওর জীবনের ঘটনা। তারপর, বলা হয়ে গেলে, আবার বলে, এগুলো আমার লাইফের ঘটনা যদি নাও হয়, অন্য কারও তো হতে পারে! আর সত্যি-সত্যি যদি এগুলো নাও ঘটে থাকে তবু ঘটতে কতক্ষণ!
এই হচ্ছে বিনু। ও কখনও ওর বউ এর গল্প শোনায়, কখনও ওর খুন করার গল্প, কখনও আবার ওর জীবনের অলৌকিক ঘটনার কথা শোনায়। হয়তো আসলে সবগুলোই ওর বানানো ঘটনা। কিন্তু সেসব বোঝার উপায় নেই। গল্প শোনাতে-শোনাতে ও সবকিছু কেমন গুলিয়ে দেয়।
আর ও গল্পও বলে ভারী অদ্ভুত ধরনের। হয়তো বলল, শোন, তোদের আজ একটা বাঘের গল্প শোনাব কিন্তু সে-গল্পে কোনও বাঘ খুঁজে পাওয়া যাবে না। তবে বাঘের হিংস্রতা থাকবে, মানুষখেকো বাঘের চালাকি থাকবে, কিংবা নৃশংস ঘটনা থাকবে।
বিনুর কাছে এরকম সাপের গল্পও আমি শুনেছি। তাতে কিন্তু সাপ ছিল–আর সাপের মতো ছোবল মারার ঘটনা ছিল, বিষও ছিল।
আজ বিনু হঠাৎ বলেছে, তোমাদের আজ আলোর গল্প শোনাব।
ওর গল্প শোনার জন্যে আমি সবসময় মুখিয়ে থাকি। বেশিরভাগ সময় ও অন্ধকারের গল্পই শোনায়। তো আজ হঠাৎ আলো কেন?
বিনু সবসময় উড়ে বেড়ায়, ঘুরে বেড়ায়। আমি ওর বহু পুরোনো বন্ধু হলেও ওর সম্পর্কে সবচেয়ে কম জানি। ও ভারতের যে-প্রান্তেই থাকুক, মাঝে-মাঝে চিঠি দেয় আমাকে। কখনও কখনও ফোনও করে। তখন যেসব জায়গায় নাম চিঠিতে দেখি বা টেলিফোনে শুনি সেগুলো এতই বিচিত্র যে, এ নামে কোনও জায়গা থাকতে পারে কখনও ভাবিনি।
কদিন আগেই বিনু ফোন করেছিল। বলেছিল, শুক্রবার দিন কলকাতা পৌঁছব। পরদিনই ট্রেন ধরে আবার পালাব। রাতটা তোমাদের কাছে থাকব। কোনও অসুবিধে নেই তো?
অসুবিধে! আমার এই পায়ে সরষে এবং হাতে ডানা লাগানো বন্ধুটিকে তো কাছে পাওয়াই ভার! তার ওপর ওর গল্প কিংবা সত্যি ঘটনা শোনার এ-সুযোগ কে হাতছাড়া করতে চায়!
ওকে বললাম, কেয়া বাপের বাড়ি গেছে। বাড়ি ফাঁকা। সুতরাং কোনও প্রবলেম নেই।
তবে একটা অসুবিধে ছিল। শুক্রবার সন্ধেটা আমার নিরুপমদের বাড়ি যাওয়ার কথা। সেদিন ওদের ম্যারেজ অ্যানিভার্সারি। সেখানে আরও দুজন বন্ধু আসবে। আচ্ছা এবং খাওয়াদাওয়া হবে। সন্ধে থেকেই। সুতরাং ফিরতে তো বেশ রাত হয়ে যাবে!
সেটা শুনে বিনুই সমাধান জোগাল। বলল, দ্যাখো, ভাই। পাক্কা একটি বছর পর কলকাতায় ফিরছি। সুতরাং তোমাকে ছাড়ার কোনও ব্যাপার নেই। আমি তোমার গেস্ট হয়ে ওই নিরুপমবাবুদের বাড়ি যাব–তুমি একটু ম্যানেজ করে নিয়ো।
বিনু এইরকমই–স্ট্রেটকাট। সামাজিকতার সংকোচের ধার ধারে না। ফলে আমার সঙ্গে অতিথি হয়ে ও সরাসরি হাজির হয়ে গেছে নিরুপমদের বাড়িতে।
কদিন ধরেই নিম্নচাপের বৃষ্টি চলছিল। ভিজে শাড়ি মেলে দিলে যেমন টপটপ করে জলের ফোঁটা ঝরে পড়ে অনেকটা সেইরকম। আকাশ আর বৃষ্টির হালচাল দেখে মনে হচ্ছিল না দিন সাতেকের আগে থামার কোনও সিন আছে। আজ সকাল থেকে অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। আর এখন, নিরুপমদের বাড়িতে বসে, দিব্যি ঝমঝম শুনতে পাচ্ছি।
নিরুপমের বাড়িতে আমাদের আরও দুজন বন্ধু রণজিৎ আর প্রেমতোষ এসেছে সঙ্গে ওদের বউ রুনি আর মানিনী। বিনুর সঙ্গে সকলের আলাপ করিয়ে দিয়েছি। ও খুব সহজেই আমাদের মধ্যে মিশে গেল। খাওয়াদাওয়া আর জমাটি আড্ডার দিব্যি সময় কাটতে লাগল।
নিরুপমদের বাড়িটা মাপে বড় কিন্তু বয়েসের ভারে কাবু হয়ে পড়েছে। বাড়ির ভেতরে ছড়ানো উঠোন, আর তার সঙ্গে একচিলতে বাগানও রয়েছে। এতবড় বাড়িটায় নিরুপম ওর বউ সরস্বতীকে নিয়ে একা থাকে। আমি হলে বেশ গা-ছমছম করত।
