এই তো! যজ্ঞের বাউন্ডারি ওয়ালের পাশে।
একটা তালপাতার পাখা নিয়ে পাইকাকা জোরে-জোরে বাতাস করতেই ধোঁয়া খানিকটা ফিকে হল। কয়েকটা থানইট দিয়ে হোমের আগুনটা ঘেরা ছিল। ভালো করে চেয়ে দেখি তার ঠিক পাশে পাইকাকার ডানদিকে–একটা চারইঞ্চি লম্বা চামচিকে চিত হয়ে পড়ে আছে। তার কালো বডি ঘিরে ধোঁয়ার রেখা ঘুরপাক খাচ্ছে। আর মুখ থেকেও ধোঁয়া বেরোচ্ছে।
তাই দেখে পাইকাকা বেজায় রেগে গিয়ে বললেন, তুই সিগারেট খাচ্ছিলি? এখনও মুখ দিয়ে ধোঁয়া বেরোচ্ছে! এত বড় আস্পর্ধা!
না, না–সিগারেটের ধোঁয়া নয়। কাতর গলায় চামচিকেটা বলল, ওটা আমার প্রাণবায়ু ধীরে-ধীরে বেরিয়ে যাচ্ছে। পুরোপুরি বেরিয়ে যাওয়ার আগে কয়েকটা কথা বলতে চাই।
আমরা সবাই আশ্চর্য হয়ে নিজেদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু করে দিলাম। চামচিকে ভূত দেখা তো দূর অস্ত্র আমরা কখনও গল্পেও পড়িনি।
পাইকাকা যজ্ঞের আগুনে আর-একদফা তিব্বতি ফোড়ন ছুঁড়ে দিয়ে বললেন, বল, কে তুই?
আ-আমি বাস্তুভূত।
বাস্তুভূত মানে?
আমি বহুবছর ধরে এ-বাড়িতে আছি–মানে, ছিলাম। বেশ কয়েকবার আমাকে বডি পালটাতে হয়েছে। এর আগে ছিলাম তোমাদের বেড়াল কমলকামিনীর বডিতে। তাই ওর কিছু কিছু ব্যাপার বেড়াল-বেড়াল ছিল না। ও সাইকেল ভ্যানের তলায় ইহলীলা সাঙ্গ করতেই আমি ফ্রি হয়ে যাই। তারপর একটা চঞ্চল চামচিকের খোলে শেলটার নিয়ে ওপরের ওই ঘুলঘুলিতে আস্তানা গেড়েছিলাম। ওই এক স্কোয়ারফুট ফ্ল্যাটে আমি দিব্যি ছিলাম। তারপর ওই তিব্বতি মশলার ঝুঁজে খসে পড়লাম।
তোর অভিশাপে এ-বাড়ির সব কটা পুরুষ বেকার। তোকে এ-বাড়ি ছেড়ে বিদায় নিতে হবে।
চিঁ-চিঁ করে জবাব ভেসে এল । আমার অভিশাপে নয়, তোমাদের এক ফোরফাদারের অভিশাপে। সেই ফোরফাদারের সঙ্গে আমার এক ফোরফাদারের ফ্রেন্ডশিপ ছিল। তাই আমি চলে যাওয়ার আগে সে-অভিশাপ খণ্ডন করে যাব।
তুই তো আবার কার-না-কার দেহে আশ্রয় নিবি–তখন? এ চলে যাওয়ার মানে কী?
না, না–আর কোথাও আমি শেলটার নেব না। ভূতের লাইফে আমার আর ইন্টারেস্ট নেই। চার-চারবার আমি বডি পালটেছি। ফলে ভূত থেকে ভূতের বর্গমূল, ঘনমূল হয়ে আমি এখন চৌকোমূল।
আমার খুড়তুতো ভাই ছোটন আমাকে জিগ্যেস করল, অ্যাই দাদাভাই, চৌকোমূল মানে কি ফোর্থ রুট?
হতে পারে। এখন অঙ্কের কথা তুলে বিরক্ত করিস না। যা হচ্ছে দেখে যা।
পাইকাকা এক জটিল ভাষায় হিংস্র চিৎকার করে আবার খানিকটা তিব্বতি মশলা ছুঁড়ে দিলেন হোমের আগুনে।
চামচিকে ভূত প্রাণান্তকর চিৎকার করে উঠল। তারপর ব্যস্তভাবে বলে উঠল, বলছি, বলছি– সব বলছি। বারবার এইরকম ভূতের ভূত, তার ভূত হতে আমার ইচ্ছে করে না। একদিন হয়তো আমার আর মনেই পড়বে না ওরিজিন্যালি আমি কী টাইপের ভূত ছিলাম। যাক, তোমাদের সমস্যার সমাধানের কথা বলি। তোমাদের বাড়িটাকে পাড়ার লোক যে নামে ডাকে সবাই বিশুদ্ধ বেকার বলে নির্মল বেকারি –সেই নামের মধ্যেই তোমাদের প্রবলেমের সলিউশান লুকিয়ে আছে। তোমরা বেকারি খোলো। কেক-পাঁউরুটি তৈরি করো–দেখবে তোমাদের লাউডগার মতো নেতিয়ে পড়া ফ্যামিলি লাউডগা সাপের মতো তেজীয়ান হয়ে উঠবে।
আমরা সবাই অবাক হয়ে গেলাম। এই সহজ ব্যাপারটা এতদিন আমাদের মাথায় আসেনি! শেষকালে এই বুদ্ধি নিতে হল একটা চামচিকের কাছে!
আমার কাজ শেষ। সময়ও হাতে বেশি নেই। তোমরা আমাকে একটা পটল এনে দিতে পারো? চামচিকেটা অনুরোধ করল।
পটল! আমরা ঠিক শুনছি তো?
এই রিকোয়েস্টে পাইকাকাও কেমন ভেবড়ে গেলেন। কোনওরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, ওর শেষ ইচ্ছে বাধা দিয়ো না। বড়বউদি, মেজবউদি–তোমরা একটা পটল এনে দাও।
তখন এ ওকে ফরমাশ করে, আর ও তাকে। এই জমজমাট সিন ছেড়ে কেউই নড়তে চায় না। শেষ পর্যন্ত বয়েসে ছোট হওয়ায় দায় বর্তাল রোমিলার ঘাড়ে। ও আদেশ পেয়েই ছুট লাগাল রান্নাঘরের দিকে।
রোমিলা পটল নিয়ে আসতে-না-আসতেই পাইকাকা বাবাকে লক্ষ করে বললেন, মেজদা, একটা ক্যামেরা নিয়ে এসো। লাস্ট মোমেন্টটার ছবি তুলে রাখবে।
বাবা আমাকে বলল, আগফা কোম্পানির বক্স ক্যামেরাটা নিয়ে আসতে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আমি ক্যামেরাটা নিয়ে ফিরে এলাম।
চামচিকেটা বেশ ক্ষীণ গলায় বলল, পটলটা আমার পাশে রাখো।
পাইকাকা পটলটা রোমিলার হাত থেকে নিয়ে চামচিকেটার পাশে রাখলেন। লক্ষ করে দেখি ওটার মুখ দিয়ে বেশ ভালোমতন ধোঁয়া বেরোচ্ছে।
যজ্ঞের আগুনে মশলাপাতি ছুঁড়ে দিয়ে পাইকাকা হুঙ্কার দিয়ে মন্ত্র আওড়াতে লাগলেন। ঘরের ধোঁয়া বাড়তে লাগল।
হঠাৎ তিনি আমার দিকে মুখ ঘুরিয়ে বললেন, তোল!
সঙ্গে-সঙ্গে চামচিকেটার দিকে ক্যামেরা তাক করে আমি শাটার টিপলাম। আর সেই মুহূর্তে চামচিকেটাও অদ্ভুত কায়দায় ওর পাশে রাখা পটলটা বুকে তুলে নিয়ে কোলবালিশের মতো আঁকড়ে রইল।
জেঠিমা তিব্বতি ঝাঁজে সজল হয়ে ওঠা চোখ মুছে বলল, এতক্ষণে বেচারা পটল তুলল। ওইজন্যেই ও পটলটা চেয়েছিল। দ্যাখো, ওর মুখ দিয়ে আর ধোঁয়া বেরোচ্ছে না।
পুঁচকে প্রাণীটার নড়াচড়া স্থির হয়ে গিয়েছিল। অপদেবতার বিনাশে কোথায় আমরা খুশি হব, তার বদলে কেমন যেন মুষড়ে পড়লাম।
আরও মিনিট দশেক পর পাইকাকার যজ্ঞ শেষ হল। সে-রাত্তিরটা আমাদের বাড়িতে থেকে পরদিনই তিনি আবার নিরুদ্দেশের পথে রওনা হয়ে গেলেন। হয়তো তিব্বতের দিকেই চলে গেলেন…কে জানে!
