আমাদের বাড়ির চৌকো উঠোনটার ওপরে–অনেকটা উঁচুতে–জাল লাগানো। সেই জালের ওপর দিন-রাত অসংখ্য গোলাপায়রা ঘুরে বেড়ায়।
এক্সাইটেড হয়ে যজ্ঞের কথা বলতে-বলতে পাইকাকা ওপর দিকে তাকালেন। কয়েকটা গোলাপায়রাকে লক্ষ্য করে পদ্যে বলতে লাগলেন, তব শক্তি মম প্রাণে/নব-নব বিশ্বাস আনে/তব পবিত্র প্রসাদে আমি প্রীত/তব প্রসাদ মম অমৃত।
পাইকাকা যে কথাগুলো ভগবানকে উদ্দেশ করে বলছেন, সেটা বুঝতে আমাদের কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল। তা ছাড়া পাঁচালি আওড়াতে-আওড়াতে তিনি চোখ বুজেও ফেলেছিলেন– তবে মুখ চলছিল। ফলে আচমকা দুর্ঘটনা ঘটে গেল।
একটি দুষ্কৃতী পায়রা নিঃশব্দে প্রসাদ ত্যাগ করল এবং সেটা মাধ্যাকর্ষণের নিয়ম মেনে সরাসরি ঢুকে গেল পাইকাকার মুখে। ফলে পদ্যের শেষ অমৃত শব্দটা অমৃহ-হো-হো-থু-থুঃ হয়ে দাঁড়াল।
মা কাকিমা-জেঠিমা সব জল আনতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। আমরা ভাইবোনেরা অতিকষ্টে দমবন্ধ করে হাসি চেপে আছি। পাইকাকা এতটুকুও বিচলিত না হয়ে বারদুয়েক কুলকুচো করে বললেন, এসব আমার অভ্যেস আছে। তা হলে যজ্ঞ শনিবার দিনই হচ্ছে। আমি ফর্দ লিখে দিচ্ছি।
আমরা বুঝলাম, এইরকম লড়াকু মানুষের হাত থেকে অপদেবতার আর রক্ষে নেই।
পাইকাকার অ্যাকশন শুরু হয়ে গেল বিকেল থেকেই।
সাড়ে তিন কিলোমিটার লম্বা এক ফর্দ তৈরি করে সেটাকে পটপট করে ছিঁড়ে গোটাপাঁচেক ঘুড়ির লেজ তৈরি করে নিলেন। তারপর সেগুলো আমাদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন, শনিবার মর্নিং-এর মধ্যে সব চাই। জোগাড়যন্ত্র শেষ করে সন্ধে থেকে কাজ শুরু হবে।
আমরা গুরুজনদের অনুমতি নিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটলাম দশকর্ম ভাণ্ডারের দিকে।
পরদিন পাইকাকা তার কাঁপালিক নাক দিয়ে অনুসন্ধান শুরু করলেন। থার্টি পারসেন্ট ডোবারম্যান, টুয়েন্টি পারসেন্ট অ্যালসেশিয়ান আর ফিফটি পারসেন্ট নেড়ি কুকুরের দক্ষতার মিশ্রণ ঘটিয়ে আমাদের বাড়ির নানান জায়গার গন্ধ শুঁকতে লাগলেন। আমরা সবাই দলবেঁধে তার পেছু পেছু ঘুরতে লাগলাম।
অবশেষে দোতলার একটা কোনার ঘরে ঢুকে পাইকাকা বললেন, হুম! এই ঘরেই অপদেবতাটি আস্তানা গেড়েছে। মহাযজ্ঞ এই ঘরেই হবে।
বাবা বলল, এ-ঘরে আছে বুঝলে কেমন করে?
কাপালিকের অট্টহাসি হাসলেন পাইকাকা, বললেন, কর্পোরেশনের গন্ধটা এই ঘরেই সবচেয়ে উৎকট অনেকটা পাবলিক টয়লেটের মতো। ওসব আমার ওপরে ছেড়ে দাও, দাদা।
জ্যাঠামশাই তিনবার কপালে প্রণাম ঠুকল।
পাইকাকা জ্যাঠামশাইয়ের দিকে ঘুরে তাকিয়ে বললেন, আমাকে প্রণাম করছ কেন, বড়দা? আমি কারও প্রণাম নিই না। এমনকী গুরুজনের প্রণামও নিই না।
রোগাসোগা জ্যাঠামশাই কেমন যেন ভড়কে গিয়ে বলল, না, না, তোমাকে প্রণাম করছি না।
তা হলে কাকে প্রণাম করছ?
ঠ-ঠিক জানি না। আমার ইয়ে, স্ত্রী, ইশারা করে বলল তিনবার প্রণাম ঠুকতে, তাই ঠুকলাম।
ও, স্ত্রৈণ প্রণাম! ঠিক আছে কাল তা হলে এ-ঘরেই যজ্ঞ হবে।
এ-ঘরটায় কেউ থাকে না। অযত্নে প্রচুর ধুলো-ময়লা জমেছে। ঘরের চটা ওঠা সিলিং-এ ঝুলকালি। কড়িবরগায় উই ধরেছে। একটা জানলার পাল্লা কবজা খুলে হেলে পড়েছে। ঘুলঘুলিতে পাখির বাসা।
পাইকাকার নির্দেশে মা কাকিমা-জেঠিমা ঘরটা সাফ করার কাজে লেগে গেল। আর আমরা ভাইবোনেরা জীবনে প্রথম ভূত দেখব এই আনন্দে টগবগ করতে লাগলাম।
.
পরদিন সন্ধে সাড়ে ছটায় অপদেবতা বিনাশক মহাযজ্ঞ শুরু হল।
হোমাগ্নিতে কী যেন সব ফোড়ন দিলেন পাইকাকা–সে একেবারে শুকনো লঙ্কা তেজপাতা পাঁচফোড়নের বাবা।
ধোঁয়ায় ঘর ভরতি হয়ে গেল। যজ্ঞের আগুন থেকে চড়বড়-চড়বড় শব্দ হতে লাগল। আর আমরা শুরু করে দিলাম হাঁচির লড়াই।
পাইকাকা তখন হুঙ্কার দিয়ে কীসব মন্ত্র পড়ছেন। ভাষা তো আমরা কিছুই বুঝতে পারছি । শুধু বুঝতে পারছি, মন্ত্রের মধ্যে ঘন-ঘন খণ্ড ৩, অনুস্বার, বিসর্গ আর চন্দ্রবিন্দু রয়েছে।
পাইকাকার পরনে ঘোর লাল রঙের চাদর। কপালে লাল টিপ। দাড়ি-গোঁফওয়ালা জঙ্গুলে মুখে কাপালিকের মতো এক্সপ্রেশান–যদিও এক্সপ্রেশানটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।
যজ্ঞের আগুন ঘিরে গুরুজনরা শ্রদ্ধা-ভক্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে। তাঁদের শরীরের ফাঁকফোকর দিয়ে আমরা উঁকি মারছি। ঘরটা ধোঁয়ায় ভরে উঠেছে। চোখ বেশ জ্বালা করছে।
কাকিমা আলতো করে মায়ের কানে কানে বলল, খুব কড়া তিব্বতি মশলা, মেজদি। খানিকটা চেয়ে রেখে দিলে হয়–দারুণ ঝুঁজালো রান্না হবে।
মা বলল, খবরদার না। এটা ভূতের মশলা। এখন ভূতের চচ্চড়ি রান্না হচ্ছে।
জেঠিমা ধোঁয়ার ঝাঁজে নাজেহাল হয়ে চোখের জল মুছে বলল, না ভাই, ভূত বলে অভক্তি কোরো না। ভূত আছে বলেই না তাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছ।
প্রমীলা হঠাৎই ফোড়ন কাটল, ভূত কি পাকা তাল যে, ধোঁয়ার ঠেলায় হঠাৎ করে বোঁটা ছিঁড়ে খসে পড়বে!
প্রমীলার কথা শেষ হতে-না-হতেই চিঁ-চিঁ স্বরে এক মিহি চিৎকার শোনা গেল? খসে পড়েছি, মা জননী, খসে পড়েছি!
কে চিৎকার করল? কাকা ধোঁয়ার মধ্যেই চারপাশে নজর চালাতে চেষ্টা করল।
আমি গো আমি! তোমাদের চামচিকে ভূত।
আর যায় কোথায়! পাইকাকা খলখল করে অট্টহাসি হেসে দু-হাত শূন্যে ছুঁড়ে হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন, নিস্তারং অসম্ভবৎ মম তীব্রং যজ্ঞঃ হতে। বল, কে তুই?
পাইকাকা প্রশ্নটা করলেন বটে, কিন্তু যাকে কোশ্চেন করলেন, তাকে তখনও খুঁজে চলেছেন। আবার হুঙ্কার দিয়ে জানতে চাইলেন, ধূম্রজালং মহামিত্র, কুত্র তুই, কুত্ৰ কুত্র?
