মুখটা কাঁচুমাচু করে হরপার্বতী বলল, জমানো টাকার সামান্য সুদ পাওয়া যেত। আর মাঝেমধ্যে মা-কাকিমা-জেঠিমার সোনাদানা বিক্রি করতে হত। সে খুব করুণ অবস্থা ছিল, ভাই।
ঠাকুরদা দিনরাত পুজো-আচ্চা করতেন আর বলতেন আমাদের বাড়িতে নাকি অভিশাপ লেগেছে। বাবা বলত, কেউ বোধহয় বাণ মেরেছে। কাকা বলত, কুবাতাস লেগেছে। আর জ্যাঠামশাই বলত, সবই নাকি গতজন্মের ফল।
তো আমরা ভাইয়েরা মিলে দিস্তে-দিস্তে চাকরির অ্যাপ্লিকেশান ছাড়ি। জেঠতুতো বোন প্রমীলা আর খুড়তুতো বোন রোমিলা আমাদের সবাইকে উৎসাহ জোগায়। একবার তো বাবা-কাকা-জ্যাঠাকে না জানিয়ে আমরা ভাইবোনের দল অভিশাপ কাটানোর জন্যে ছাদে গোলাপায়রা ধরে বলি দিয়েছিলাম। পায়রাটাকে আচ্ছা করে সিন্টুর মাখানোও হয়েছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনও কাজ হয়নি।
একইভাবে বেকার দিনগুলো কেটে যাচ্ছিল। আমাদের এই সাবেকি বাড়ির আনাচেকানাচে আমরা বেকার পুরুষের দল চুপচাপ ঘুরে-ঘুরে বেড়াই। আর নিজেদের মধ্যে কারও সঙ্গে কারও দেখা হয়ে গেলে ভীষণ লজ্জা করত। মনে হত, দল বেঁধে সবাই সুইসাইড করি।
বোধহয় শেষ পর্যন্ত সেটাই করতাম যদি না এক অ্যাক্সিমেট কাকা তিব্বত থেকে আমাদের বাড়িতে এসে আচমকা হাজির হতেন।
অ্যাপ্রক্সিমেট কাকা মানে? অবাক হয়ে জিগ্যেস করলাম।
চেয়ারে সোজা হয়ে বসল হরপার্বতী। আঙুলের ডগায় আঙুল ঠেকিয়ে ইলিবিলি খেলতে লাগল। তারপর আমার দিকে কৌতুকের চোখে তাকিয়ে বলল, অ্যাক্সিমেট কাকা মানে হল কাকার মতো। আমাদের বাড়ির গুরুজনরা কেউই তাকে চিনতে পারলেন না। অবশ্য চেনার ব্যাপারটাও বেশ কষ্টকর ছিল। ওঁর সারা মুখে এমন দাড়ি-গোঁফের জঙ্গল যে, যেদিক থেকেই দেখি না কেন রবীন্দ্রনাথ-রবীন্দ্রনাথ লাগে। বাবা-কাকা-জ্যাঠা কেউ ওঁকে চিনতে না পারলেও উনি কিন্তু দেশের বাড়ির কথা, বাবা-কাকাদের ছেলেবেলার কথা দিব্যি বলছিলেন।
শেষ পর্যন্ত ওঁকে আমরা কোনওরকম কাকা বলে মেনে নিয়েছিলাম। রোমিলাটা একটু বিজ্ঞানপ্রবণ মেয়ে। ও সেই কাকার নাম দিল পাইকাকা।
পাইকাকা! চায়ের কাপ ঠোঁটের কাছে তুলে আমি শেষ চুমুকটা দিতে যাচ্ছিলাম, ওর পাইকাকা শুনে থমকে গেলাম।
পাইকাকা মানে?
এও জানো না! ব্যঙ্গ করে বলল হরপার্বতী, পাই হল বৃত্তের পরিধি আর ব্যাসের অনুপাত ধ্রুবক। তবে এর সঠিক মান আজও বিজ্ঞানীরা বের করতে পারেনি। পাই-এর যেসব মান আমরা ব্যবহার করি সবই অ্যাক্সিমেট। তাই ওই নাম–পাইকাকা।
হরপার্বতী ওর কাহিনি বলে চলল।
.
ছোটবেলায় পাইকাকা ঘরছাড়া হয়ে বিবাগী হয়ে যান। উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরতে-ঘুরতে একসময় পৌঁছে যান তিব্বতে। সেখানে নেপাল আর তিব্বতের জাংশানে কোন এক গুম্ফা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এক অদ্ভুত বিষয়ে এম. এ., পিএইচ. ডি. করেন। তার আগে কীভাবে কী করেছেন সেটা ঝাপসা। বাবা সে-ব্যাপারে জিগ্যেস করাতে বললেন, সেসব কি আর মনে আছে গো! নতুন নতুন লেখাপড়ার চাপে পুরোনো লেখাপড়ার হিস্ট্রি কি আর মনে থাকে!
আমাদের বাড়িতে একটা দিন কাটাতে-না-কাটাতেই পাইকাকা এক অদ্ভুত কথা বললেন।
বাবা তখন ভেতরের উঠোনে জলচৌকিতে বসে মশা মারার মতো শব্দ করে তেল মাখছে। ছোট্ট চিরুনি দিয়ে দাড়ি আঁচড়াতে-আঁচড়াতে পাইকাকা সেখানে এসে দাঁড়ালেন। গম্ভীর স্বরে বললেন, তোমাদের বাড়ির গন্ধটা বড় উৎকট–অনেকটা কলকাতা কর্পোরেশনের মতো। তোমাদের বাড়িতে নিশ্চয়ই অপদেবতার অভিশাপ আছে।
যেই না একথা বলা, বাবা একেবারে আঁতকে উঠল? তুমি কেমন করে গন্ধ পেলে? কই, আমি তো পাচ্ছি না!
এর জন্যে স্পেশাল নাকের দরকার, বুঝলে!
আমি লক্ষ করে দেখলাম, পাইকাকার নাকটা সত্যিই বেশ প্রকাণ্ড।
পাইকাকা দাড়ি আঁচড়ানো শেষ করে গলাখাঁকারি দিলেন। তারপর অট্টহেসে বললেন, শুধু নাক নয়, প্রশিক্ষণও দরকার। আমি তিব্বতে গিয়ে কাঁপালিকতায় এম. এ. এবং পিএইচ. ডি. করেছি। তার সঙ্গে প্রেত-পিশাচ-অপদেবতা নিয়েও স্টাডি করতে হয়েছে। আমার অনুমান কখনও ভ্রান্ত হতে পারে না। এ-বাড়িতে অপদেবতার উপস্থিতি আছে।
জেঠিমা সেইসময়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দা ধরে হেঁটে যাচ্ছিল। পাইকাকার কথা শুনতে পেয়েই তরকারির বাটি হাতে উঠোনে নেমে এল। তারপর সামনে এসে হাত-পা নেড়ে একেবারে কেঁদে পড়ল। বলল, এ-বাড়ির সব পুরুষগুলো বেকার। ওদের লজ্জাশরম আছে কিনা জানি না, তবে আমাদের তো আছে! তুমি যেভাবেই হোক অপদেবতাটিকে তাড়ানোর ব্যবস্থা করো। তুমি যা চাও তাই দেব।
বলেই তরকারির বাটিসমেত হাতটা বাড়িয়ে দিল পাইকাকার দিকে।
পাইকাকা ভাবলেন জেঠিমা বোধহয় এখনই একবাটি তরকারি দিতে চাইছে। তাড়াতাড়ি পেছিয়ে গিয়ে বললেন, তরকারি-টরকারি লাগবে না–এমনিই অপদেবতা তাড়িয়ে দেব। আপনারা এই বিপদের কথা আমাকে আগে জানাতে পারতেন–আমি সব সাধনা-টাধনা ফেলে ছুটে আসতাম।
না, ঠাকুরপো, অপদেবতা আছে, তা-ই তো আমরা জানতাম না। তা ছাড়া তোমাকে খবর দিয়ে বিব্রত করে সেই তিব্বত থেকে ছুটিয়ে নিয়ে আসা…।
পাইকাকা অট্টহেসে বললেন, না, না, সত্যি কি আর আসতাম–ওটা এমনি কথার কথা বললাম।
এইসব কথাবার্তার মধ্যে উঠোনে ভিড় জমে গেল। মুখরা জেঠিমা সবাইকে সমস্যাটা বোঝাল। জ্যাঠামশাইও জেঠিমার কথায় বাধ্য ছাত্রের মতো ঘাড় নেড়ে গেল। পাইকাকা বললেন, একটাই মোক্ষম উপায় আছে। অপদেবতা বিনাশক যজ্ঞ। পরশুদিন শনিবার, অমাবস্যা। সেদিন সূর্যাস্তের পর যজ্ঞ শুরু হবে।
