আজ সেই ফটোয় ভক্তিসিঞ্চিত প্রণাম আর তার সঙ্গে কিচিরমিচির করে পাঁচালি পাঠ– নাঃ, ব্যাপারটা লিমিটের বাইরে চলে যাচ্ছে।
কটকট করে রেগুলেটর ঘুরিয়ে সাবেক আমলের পাখাটাকে জোর করে দিলাম। তারপর একটা চেয়ারে গা এলিয়ে হরপার্বতীর প্রণাম ইত্যাদি শেষ হওয়ার অপেক্ষায় রইলাম।
ঝাড়া সাতমিনিট পর ও চোখ খুলল এবং আমাকে চেয়ারে বসা অবস্থায় দেখে রীতিমতো চমকে উঠল : কী ব্যাপার, এত সকালে তুমি!
এত সকাল কোথায়! আটটা বেজে গেছে। আর চমকেই বা উঠছ কেন? রেগুলেটর ঘোরানোর শব্দ শোনোনি?
শুনেছি। তবে ভেবেছি আমাদের নিত্যপদ। আমার কষ্ট দেখে ইয়ে…মানে…।
নিত্যপদ ওদের বাড়ির কাজের লোক। তবুও আমি ওর কথায় রাগ করলাম না। বললাম, নিত্যপদকে একটু চায়ের জোগাড় করতে বলো। আর এই চেকটা রাখে–এটা দিতেই সকালবেলা এসেছি। গতকাল দেওয়ার কথা ছিল…আসতে পারিনি।
হরপার্বতী বিব্রত হয়ে বলল, এত তাড়াহুড়োর কী দরকার ছিল…।
চেকটা নিয়ে পাশের একটা টেবিলে রাখল ও। একটা বই চাপা দিল তার ওপরে।
তারপর মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে বলল, বলো, কী খবর–।
আগে তুমি বলো, ওই ফটোর ব্যাপারটা কী। যখনই জিগ্যেস করি তুমি অ্যাভয়েড করো। আজ তোমাকে বলতেই হবে। কী তোমার ওই রেসপেক্টে সিচুয়েশান, আর তুমি সেটাকে গদগদ হয়ে প্রণাম করছই বা কেন?
মাথা নিচু করে হাতের নখ খুঁটতে লাগল হরপার্বতী। যেন বিরাট এক ধন্দে পড়েছে। ভাবছে, বলবে কি বলবে না।
আমি ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে লাগলাম।
বেশ কিছুক্ষণ পর একটা ছোট্ট দীর্ঘশ্বাস ফেলে ও বলল, বেশ..বলছি। আশা করি এতে আমার ওপরে কোনও অভিশাপ নেমে আসবে না।
হরপার্বতী উঠে বাড়ির ভেতরদিকে গেল। নিত্যপদকে চেঁচিয়ে ডেকে বলল দুকাপ চা আর বিস্কুট নিয়ে আসতে। তারপর আবার চেয়ারে এসে বসল। পরপর দুবার হাই তুলল। চোখ বুজে মুখটা সিলিং-এর দিকে তুলে ঠোঁট নেড়ে কীসব বিড়বিড় করতে লাগল।
আমি হরপার্বতীর গোল-গোল নাদুসনুদুস চেহারার দিকে তাকিয়ে রইলাম। গায়ে স্যান্ডো গেঞ্জি, বুকের কাছে একখাবলা চুল, মাথায় চুল দিয়ে ঘেরা ব-দ্বীপ ধাঁচের ইন্দ্রলুপ্ত, চোখে কার্বন ফ্রেমের চশমা।
হঠাৎই শ্বাস টানার শব্দ করে চোখ খুলল হরপার্বতী। বলল, ঘটনাটা আমাদের ফ্যামিলির অভিশপ্ত পিরিয়ডের। তুমি যেন আর কাউকে বোলো না।
আমি এপাশ-ওপাশ মাথা নাড়লাম। না, কাউকে বলব না।
হরপার্বতী বলতে শুরু করল।
বহুবছর আগের কথা। আমি তখন এইটুকু। কথাটা বলে হাতের আঙুলের কায়দায় যে সাইজ হরপার্বতী দেখাল তাতে মনে হল ছোটবেলায় ও হোমিওপ্যাথি ওষুধের শিশি ছিল।
তুমি তো জানো, আমাদের বাড়ির নাম নির্মল নিকেতন। আমার ঠাকুরদার নাম ছিল নির্মলশোভা–তার নামেই বাড়ির নাম।
ওর ঠাকুরদার নামটাও দেখছি উভলিঙ্গ টাইপের!
হরপার্বতী বোধহয় আমার মনের কথাটা বুঝতে পারল। বলল, তুমি ঠিকই ধরেছ, সনাতন, আমার বাবার নামও একই টাইপের ছিল–যামিনীপূর্ণিমা। তো আমাদের বাড়ির নাম নির্মল নিকেতন হলেও পাড়ার লোকে বলত নির্মল বেকারি। প্রথমটায় আড়ালে বলত, পরে রাখঢাক না রেখে সামনেই। কারণ, সেসময়ে আমাদের বাড়ির সব্বাই বেকার ছিল। ঠাকুরদার বয়েস ছিল বাহাত্তর–তার চাকরি বা ব্যাবসা করার কোনও কোশ্চেন ছিল না। তাঁকে বাদ দিয়ে আমার বাবা, কাকা, জ্যাঠা, জেঠতুতো দুই দাদা, খুড়তুতো এক ভাই, আমি, আমার ছোটভাই সব্বাই বিশুদ্ধ বেকার ছিলাম। ফলে এতবড় দু-মহলা বাড়িটা সারাটা দিন বেকারে-বেকারে কিলবিল করত। আমাদের, মানে ভাইদের, বয়েস ছিল আঠেরো থেকে চব্বিশ। আর বাবা-কাকা-জ্যাঠাদের বয়েস কত হবে–এই বিয়াল্লিশ থেকে বাহান্ন।
বেকার হলে তোমাদের চলত কী করে? আমি প্রশ্নটা করতে না করতেই নিত্যপদ চা-বিস্কুট নিয়ে ঘরে ঢুকল।
নিত্যপদর চেহারা সরু, পাকানো–অনেকটা লোহার রডের তৈরি শৌখিন টেক্ল ল্যাম্পের মতো। আর মাথাটা পাঁচশো পাওয়ারের বাব। সেখান থেকে অসংখ্য চুলের গোছা চারিদিকে নেমে এসেছে–মুখটা কোনদিকে ঠিক ঠাহর হচ্ছে না।
আমি হেসে বললাম, নিত্যপদ, তোমার হাতে চায়ের ট্রে না থাকলে বোঝাই মুশকিল হত কোষ্টা তোমার সামনের দিক।
নিত্যপদ চুলের আড়ালে হাসল। তারপর চায়ের ট্রে টেবিলে নামিয়ে রেখে চলে গেল।
চায়ের কাপে সুড়ুৎ করে চুমুক দিয়ে হরপার্বতী বলল, ঠিক বলেছ, সনাতন–সামনের দিক, পেছনের দিক নিয়ে সবসময় দারুণ প্রবলেম। আমাদের বাড়ির একটা বেড়ালের এই প্রবলেম ছিল। বেড়ালটার নাম ছিল কমলকামিনী। ওটা সবসময় পেছনদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনদিকেই হাঁটত। মানে, ও ভাবত ও সামনের দিকেই হাঁটছে। তাই হোল লাইফ ধরে ও সামনে এগোল, না পেছোল, আমরা আজও জানি না। একটা দুঃখের নিশ্বাস ফেলল হরপার্বতী। বলল, আর কোনওদিন জানাও যাবে না।
কেন? বিস্কুটে কামড় দিয়ে প্রশ্ন করি আমি।
বছর চারেক আগে ও সাইকেল ভ্যান চাপা পড়ে মারা গেছে। রাস্তা পার হওয়ার সময় সামনের দিক পেছনের দিক গুলিয়ে ফেলেছিল। ফলে রাস্তা পার হয়ে গিয়েও আবার মাথাটা পেছনদিকে ঘুরিয়ে ব্যাকগিয়ার দিয়ে চলে এসেছে…তারপর যা হওয়ার তাই হয়েছে। নির্মল বেকারিতে আমাদের অবস্থাও তখন দিগভ্রান্ত কমলকামিনীর মতো।
তোমাদের চলত কী করে? চায়ে বড় চুমুক দিয়ে আমি আবার জানতে চাইলাম।
