ট্যাক্সি পাওয়া এখন আর সৌভাগ্য নয়। কিন্তু তবুও পাওয়া গেল না। সুতরাং, নিরুপমার মাথা সঙ্গে নিয়ে ট্রামে চড়ে বসল অনাদি। এই প্রথম নিরুপমা আংশিকভাবে ট্রামে চড়ল।
ওয়েলিংটনে নেমে ট্রাম বদল করল। ট্রাম এখন খালি। নিরুপমাকে ট্রামে ফেলে রেখে নেমে পড়লে কেমন হয়? যথা ভাবনা তথা কাজ। ম্যাজেস্টিক সিনেমা হলের সামনে ট্রাম থেকে নেমে পড়ল অনাদি। হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। ফার্স্ট ক্লাসের গদিমোড়া সিটে মাথা রেখে শুতে নিরুপমার কোনও অসুবিধে হবে না।
কিন্তু তাকে অবাক করে চলন্ত ট্রামটা কয়েক পা এগিয়ে আবার থামল। কন্ডাক্টর গলা বাড়িয়ে চেঁচিয়ে ডাকল অনাদিকে। কষ্টকৃত অন্যমনস্কভাব দেখিয়েও কোনও লাভ হল না। আশেপাশে বিশেষ কোনও লোকজন নেই যে, অনাদি না বোঝার ভান করে ন্যাকামো করবে। সুতরাং ফিরতে হল। কন্ডাক্টরের হাত থেকে নিরুপমাকে ফেরত নিতে হল।
আবার হাঁটতে শুরু করল অনাদি। আস্তে-আস্তে বলল, নিরু, এখনও আমায় ছাড়বি না?
নিরুপমা জবাব দিল না।
পার্ক স্ট্রিটে পৌঁছে খুশি হল অনাদি সামন্ত। নির্জনতা, জনশূন্যতা ইত্যাদি একসঙ্গে পরিবেশে হাজির। ডানদিকে ঘুরে রাস্তা পার হয়ে অ্যালেন গার্ডেনে ঢুকল সে। একটা ঝোঁপের পাশে ঘাসের ওপরে বসল। এবং পরমুহূর্তেই নিরুপমাকে রেখে উঠে পড়ল।
ডাকটা এল পিছন থেকেই। কেউ তাকে ডাকছে।
ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রত্যাশিত ঘটনার মুখোমুখি হল অনাদি। একটি লাল শাড়ি পরা চটকদার সাজগোজ করা দেহাতি মহিলা ঘাসের ওপরে ফেলে যাওয়া প্যাকেটে মোড়া নিরুপমার দিকে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। এখন প্যাকেটটা তুলে না নিলে এই মেয়েটিই পরে অনাদি সামন্তের বিরুদ্ধে খুনের মামলায় সাক্ষী দেবে। অতএব ট্রামের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হল।
এরপর ক্যামাক স্ট্রিট। একটা ডাস্টবিনের কাছে প্যাকেটটা প্রায় ফেলেই দিয়েছিল অনাদি, থমকাল জনৈক রিকশাওয়ালাকে দেখে।
এইভাবে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হতেই লাগল। কখনও নির্জনতা খোঁজা প্রেমিক-প্রেমিকা, কখনও মেয়েছেলের দালাল, কখনও-বা প্রহরারত পুলিশ। ভূমিকা তাদের একই। অনাদি সামন্তর কাছ থেকে নিরুপমা সামন্তর মাথাকে অবিচ্ছিন্ন রাখা।
রাত যখন সাড়ে বারোটা হল, তখনও নিরুপমাকে সঙ্গে নিয়ে রাস্তায়-রাস্তায় পাগলের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে অনাদি। শ্রান্ত, ক্লান্ত, অবসন্ন। কাউকে খুন করে দেহের টুকরোগুলো সবার অলক্ষ্যে কলকাতা শহরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দেওয়াটা মোটেই সহজ কাজ নয়। অন্তত গল্পের বইয়ের মতো।
অনাদি সামন্ত এবার অন্ধকার রাস্তার ধারে বসে পড়ল। প্যাকেটে ভরা নিরুপমাকে দুহাতে ধরে মুখের খুব কাছে এনে ফিশফিশ করে ওর সঙ্গে অনেক কথা বলল। তারপর হাসিমুখে উঠে দাঁড়িয়ে আবার শুরু করল পথ চলা।
.
একজন রোগা ছাপোষা লোককে একটা প্যাকেট নিয়ে রাত একটা নাগাদ থানায় ঢুকতে দেখে সদর দরজার সেপাই অবাক হল।
অনাদি সামন্ত সটান ঢুকে গেল অফিসারের ঘরে। তার টেবিলে প্যাকেটটা নামিয়ে রেখে ক্লান্ত গলায় বলল, ইনস্পেক্টর সাহেব, একজন লোক বিরক্ত হয়ে তার বউকে হঠাৎই একদিন খুন করে ফ্যালে। গল্পের বইয়ে পড়া বিদ্যে থেকে সে ঠিক করে বউকে টুকরো-টুকরো করে লুকিয়ে কলকাতা শহরে ছড়িয়ে দেবে। কিন্তু সে পারল না। দেখল, কলকাতায় কোনও নির্জন জায়গা নেই। এখানে সবজায়গাতেই সাক্ষী হাজির। আজ নয় কাল পুলিশের হাতে ধরা সে পড়বেই। সুতরাং রাস্তার ধারে বসে সে তার বউয়ের সঙ্গে ব্যাপারটা অনেকক্ষণ ধরে আলোচনা করল। তারপর সে চলে এল পার্ক স্ট্রিট থানায়। অফিসার-ইন-চার্জের সামনে সব ঘটনা খুলে বলে হালকা হল…।
কথা বলতে-বলতে টেবিলে ঝুঁকে পড়ল অনাদি সামন্ত। অতি যত্নে প্যাকেটটা খুলতে লাগল। একটু পরে হতভম্ব অফিসারের সামনে কোমল স্ফীত নিরুপমা প্রকাশিত হল।
অনাদি সামন্ত নিরুপমার চুল সরিয়ে দিল কপাল থেকে। নিরুপমা সামনে তাকিয়ে। অনাদি একবার হাসল, তারপর বলল, নিরু, এবার তুই খুশি তো?
নিরুপমা কোনও জবাব দিল না। অনাদি অফিসারের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল, ..সেই লোকটাকে ফাঁসি দিন, স্যার, সেই লোকটাকে ফাঁসি দিন…।
নির্মল বেকারির বাস্তুভূত
আমি ঘরে ঢুকেই দেখি হরপার্বতী একটা ফটোর সামনে দাঁড়িয়ে চোখ বুজে মাথা নেড়ে নেড়ে প্রণাম করছে। আর মুখ দিয়ে চি-চিঁ গোছের পিকিউলিয়ার একটা শব্দ করছে।
হরপার্বতী আমার অনেক বছরের বন্ধু। এ ছাড়া ওর সঙ্গে আমার ব্যবসায়িক লেনদেনও আছে। ওর নাম নিয়ে একদিন প্রশ্ন করায় ও বলেছিল, সনাতন, আমার নামটা উভলিঙ্গ টাইপের। ছেলে হবে না মেয়ে হবে বুঝতে না পারায় বাবা এইরকম নাম রেখেছিলেন। পুরোনো দিনের ধর্মনিষ্ঠ মানুষ…বুঝতেই তো পারছ…।
হরপার্বতীর বসবার ঘরের এই ফটোটা ভারি রহস্যময়। ওটা কীসের যে ফটো সেটা ঠিকঠাক বোঝাই যায় না। নীচের দিকে কালোমতন কী একটা পড়ে আছে–আর বাকিটা আঁকাবাঁকা ধোঁয়ার রেখায় ভরা।
হরপার্বতীকে বহুবার এই ছবিটার কথা জিগ্যেস করেছি, কিন্তু ও খোলসা করে কিছু বলেনি। শুধু বিড়বিড় করে জবাব দিয়েছে, ওটা একটা রেসপেক্টেক্ল সিচুয়েশানের ছবি।
রেসপেক্টেক্ল সিচুয়েশান মানে?
শ্রদ্ধেয় পরিস্থিতি। অবশ্য শ্রদ্ধেয় মুহূর্তও বলতে পারো। এর বেশি কিছু জানতে চেয়ো না।
