তারপর?
তারপর আমার পালা।
মাংসকাটার ছুরিটা কোথায় লুকোনো ছিল তুই দেখতে পাসনি। কী করেই বা দেখবি! ওটার রং তো আমার গায়ের রঙের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। তা ছাড়া ওই রহস্যময় অন্ধকার।
তোর গলার নলি ফাঁক হয়ে গেল। রক্তে ভেসে গেল আমার শরীর। তুই ছাদের ফাটল ধরা রুক্ষ মেঝেতে ছটফট করতে লাগলি। শেষবারের মতো চিৎকার করতে চেয়েছিলি বোধহয়– কিন্তু চিৎকারের কঙ্কালটা ঘড়ঘড় শব্দে গলার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এল।
আমি এবারে চাদরের নীচে লুকোনো ছোট্ট টেপরেকর্ডারটা চালিয়ে দিলাম।
শোনা গেল তোর গাঢ় গলা ও চাঁদের আলোয় তোকে অনেক বেশি সুন্দর দেখাচ্ছে।
তোর বলা কথাগুলো মণিমুক্তো হয়ে ধরা রইল চিরকালের জন্যে। এই সত্যিটা এবার চিরস্থায়ী হল।
কিন্তু এখনও যে আমার আর-একটা কাজ বাকি!
তাই তোর স্থির-হয়ে-আসা শরীরের পোশাক হাতড়ে তোর রুমালটা বের করলাম। তুই তখন হাঁ করে আকাশের চাঁদের দিকে তাকিয়ে। চাঁদও ভ্যাবাচ্যাকা মুখে তোকে দেখছে।
তোর মুখটা রুমালে ঢেকে দিলাম আমি। সুন্দর যেমন কুৎসিতকে ঘৃণা করে, কুৎসিতও তেমন ঘৃণা করতে পারে সুন্দরকে। এই যেমন আমি এখন তোকে।
এইবার…এইবার আমার দ্বিতীয় সত্যিটা চিরস্থায়ী হল। কেউ আর একে পালটাতে পারবে না। তুইও না। তোর খোঁজে সবাই যখন আসবে, তখন দেখবে–আমার নয়, তোর মুখই রুমালে ঢাকা। আর তোর শরীরের পাশে রাখা টেপরেকর্ডারে শুনবে তোর শেষকথা। তোর শেষ সত্যি কথাটা।
এখন নীচের ঘরে এসে এই চিঠি লিখছি। খারাপ লাগছে চিঠিটা তুই পড়তে পারবি না বলে। কিন্তু এখন তো আর কিছু করার নেই।
এবার আমি ছাদে যাব আবার। অন্ধকারে তোর পাশে শুয়ে পড়ব। তারপর রক্তাক্ত ছুরিটা আরও একটা গলার নলি ফাঁক করবে। বেশ হবে, তাই না? আমি আর তুই পাশাপাশি শুয়ে থাকব। আর আমি অপলকে নষ্ট চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকব…তাকিয়ে থাকব…
না ভেবে খুন কোরো না…
অনাদি সামন্ত আগে কখনও খুন করেনি। কিন্তু প্রত্যেক জিনিসেরই শুভ উদ্বোধন বলে একটা কথা আছে, সুতরাং অনাদি সামন্তর জীবনেও সেই শুভ উদ্বোধন এল। শুভ ১লা বৈশাখের পুণ্য লগ্নে সে তার জটিলা এবং কুটিলা স্ত্রী নিরুপমা সামন্তকে খুন করল।
খুনটা সে করেছিল নেহাতই গলা টিপে। নিরুপমার দেহটা যখন অসাড় হয়ে বিছানায় এলিয়ে পড়ল তখন রাত নটা।
অনাদির বাড়ি বউবাজার অঞ্চলে। ফ্ল্যাট ভাড়া করে স্বামী-স্ত্রীতে মিলে থাকত। খুন করার আগে অতশত সে ভাবেনি। তাকে যদি কেউ প্রশ্ন করত, বউয়ের এই পঁয়ষট্টি কেজি লাশ তুমি গায়েব করবে কী করে, সে সোজা উত্তর দিত, অতশত এখনও ভেবে দেখিনি। সুতরাং, নিরুপমা মৃতসমা হওয়ার পরই সে একটু চিন্তায় পড়ল। লাশটা নিয়ে কী করা যায়?
প্রথমে ভাবল ঘরের ভেতরেই ওটা জ্বালিয়ে দেবে কি না। পরে চিন্তা করে দেখল, তাতে পাড়াপড়শি ও বাড়িওয়ালার দুর্গন্ধে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা। দ্বিতীয় কোনও পন্থা ভেবে বের করার আগে সে রহস্য-রোমাঞ্চ বইয়ে পড়া লাশ গায়েবের উপায়গুলো স্মৃতির পাতা হাতড়ে খতিয়ে দেখতে শুরু করল।
নিরুপমাকে টুকরো-টুকরো করে আচার দিয়ে খেয়ে ফেলবে? নাকি খণ্ড-খণ্ড করে মৃতদেহের অংশগুলো কাগজে মুড়ে কলকাতার জনবহুল রাস্তায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দেবে? আবার ট্রাঙ্কে ভরে ট্রেনে তুলে দেওয়ার কায়দাটাও হেসে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তার চিন্তাধারা অব্যাহত গতিতে অন্তঃসলিলা ফন্ধুর মতো বয়ে চলল।
নিরুপমা যখন শক্ত-পোক্ত (রাইগ্যর মর্টিস) হল তখন অনাদি সামন্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছল। এতক্ষণ সে ঘরের আলো জ্বেলে নিরুপমার মাথার কাছে বাবু হয়ে বসেছিল। সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরই উঠে রান্নাঘরের দিকে গেল কাটারি আনতে। কাটারি নিয়ে এসে তার চেষ্টাচরিত্র শুরু হল।
প্রথম কোপটা পড়ল নিরুপমার গলায়। যে-নিরুপমা বেঁচে থাকলে তীব্র প্রতিবাদে ছটফট করে উঠত, ডাক ছেড়ে কেঁদে উঠত, সে এখন চুপটি করে রইল। অনাদির অস্বামীসুলভ আক্রমণ নিরুপমার শরীরে অব্যাহত রইল সারাটি রাত। মাঝখানে শুধু একবার হাত-পা ধুয়ে সে খেতে গেল। সামান্য একটু আঁশটে গন্ধ ছাড়া খাওয়াদাওয়া করতে তার কোনও অসুবিধে হয়নি।
সুপ্রভাত হল। ক্লান্ত-শ্রান্ত অনাদি ইতস্তত ছড়িয়ে থাকা নিরুপমার কাছেই শুয়ে। কাটারিটাও অনাদি সামন্তর অদূরে ঘুমিয়ে আছে। কাকের ডাক ও নিরুপমার গন্ধে অনাদির ঘুম ভাঙল। সঙ্গে-সঙ্গেই তার প্যাকিং-পর্ব শুরু হল। বারোটা প্যাকেটে গুছিয়ে ফেলা হল পঁয়ষট্টি কেজির নিরুপমাকে।
অনাদি সামন্ত সেকেন্ডারি বোর্ডের অফিসে কাজ করে। সুতরাং পার্ক স্ট্রিট অঞ্চলটার রাতের নির্জন চরিত্র তার ভালোই জানা। গোটা দিনটা সে অফিস কামাই করে বাড়িতে বসে রইল। নিরুপমা পর্যায়ক্রমে কাঠিন্য, নম্রতা ও গন্ধ বদল করে চলল। অবশেষে রাত সাড়ে নটা নাগাদ নিরুপমার মাথার প্যাকেটটা সঙ্গে নিয়ে অনাদি সামন্ত রাস্তায় পা দিল। রওনা হল পার্ক স্ট্রিটের দিকে।
রাস্তায় বেরোনোর আগে নিরুপমার সুগন্ধির শিশি নিজের গায়ে উজাড় করে দিল অনাদি। হাড়কাটার মোড় থেকে বেলফুলের মালা কিনে হাতে জড়াল। এইভাবে বেলফুল ও সুগন্ধির পরিচিত রাবার স্ট্যাম্প মেরে নিজেকে খারাপ পাড়ার খদ্দের সাজিয়ে ফেলল।
