তোর নিশ্চয়ই সেদিনটার কথা মনে আছে? মানে, সেই রাতটার কথা। বাড়িতে সেদিন কেউ ছিল না। আমাদের ফাটল-ধরা ছাদে দুজনে বসেছিলাম। তুই হঠাৎ বললি, চাঁদের আলোয় তোকে অনেক বেশি সুন্দর দেখাচ্ছে।
কী করে আমাকে বেশি সুন্দর দেখাচ্ছিল জানি না। চাঁদের আলো কি অন্তর পর্যন্ত যায়? তাতে কি ভেতরের সৌন্দর্যটা ধরা পড়ে? তবে সেদিনটা বোধহয় নষ্টচন্দ্রের রাত ছিল। ভাদ্রমাসের শুক্লচতুর্থীর রাত। শুনেছি এই চাঁদ দেখলে কলঙ্ক হয়। হলও। যে-কলঙ্কের আকাঙ্ক্ষায় আমার শরীর আর মন বহুবছর ধরে অপেক্ষা করেছে তুই আমার সেই আশ মেটালি।
প্রথমে হাতে হাত। তারপর ঠোঁটে ঠোঁট। আর সবশেষে শরীরে শরীর। সে রাতে আমি পূর্ণ হলাম। তৃপ্তি আর বিস্ময়ে সারাটা রাত ঘুমোতে পারিনি। পরদিন সায়েন্স কলেজে, সুযোগ পেতেই, তোর হাতে একটা আবছা নীল কাগজ ধরিয়ে দিলাম। তাতে একটা কবিতা লেখা ছিল। শুধু তোর জন্যে। তোকে লেখা আমার প্রথম চিঠি। তার চারটে লাইন এই মুহূর্তেও আমার মনে পড়ছে?
ওষ্ঠাধরে কোমল নিপীড়ন,
সয়েছিলাম মধুর যন্ত্রণাতে–
স্পর্শকাতর আমার স্পষ্ট হাত,
রেখেছিলাম তোমার নষ্ট হাতে।
তুই আমাকে বলেছিলি, তোর নৌকোয় কোনও মাঝি ছিল না। অথচ ভাসতে-ভাসতে সেই দিশাহীন নৌকোটা কী করে যেন হঠাৎ তীর খুঁজে পেল। সত্যিই জীবন বড় আশ্চর্য!
তোর কথাটা আমার ভীষণ ভালো লেগেছিল। এ যেন আমারই মনের কথা–তোর মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছে। বিশ্বাস কর, আমি তখন মনে-মনে তোর সঙ্গে থাকতে শুরু করেছিলাম।
কিন্তু একদিন…।
জানি, এইখান থেকে চিঠিটা লিখতে আমার বেশ কষ্ট হবে। কিন্তু লিখতে তো আমাকে হবেই।
সেদিন জেসিএম-এর পিরিয়ডটা অফ ছিল। তো আমি লাইব্রেরিতে একটা বই চেঞ্জ করতে গিয়েছিলাম। ফিরে এসে ক্লাসে ঢুকতে যাব–হঠাৎ শুনি তোর গলায় আমার নাম। ক্লাসের বাইরেই দাঁড়িয়ে পড়লাম। তুই কী বলছিস আমার নামে? কাকেই-বা বলছিস? আমাদের দুজনের যা একান্ত গোপন কথা, যা শুধু আমরা দুজনই জানি–সেসব বলবি না তো?
শুনলাম তুই আমার নাম করে বলছিস, জানিস, ওকে সেদিন নামিয়ে দিয়েছি।
কে একজন জিগ্যেস করল, বস, নামিয়ে দিয়েছ মানে?
সালা ন্যাকা! কিছু বোঝে না!–তুই বললি, নামিয়ে দিয়েছি মানে ওর কেস কমপ্লিট। ছাদে চাঁদের আলোয় বোল্ড করে দিয়েছি।
তা হলে তো তুমি বস ম্যান অফ দ্য ম্যাচ প্রাইজ পাবে। ওরকম বিশখোবড়া থোড়া তুমি ট্যাক্স করলে কী করে?
তোর হাসির শব্দ পেলাম। তারপর তুই বললি, মুখে রুমাল চাপা দিয়ে নিয়েছিলাম।
আমার মাথা ঘুরতে শুরু করল। ক্লাসরুমের কাছ থেকে ছুটে চলে যেতে চাইলাম। কিন্তু দোতলার সিঁড়ির কাছে এসে মাথাটা সাংঘাতিক টলে উঠল। কোনওরকমে রেলিং ধরে সামলে নিলাম। বসে পড়লাম সিঁড়ির ধাপে।
ও মিথ্যে কথা বলছে। আমার মুখে ও মোটেই রুমাল চাপা দেয়নি। বরং আকাঙ্ক্ষার চরম মুহূর্তে ও আমার দিকেই তাকিয়েছিল। কিন্তু কে এখন বিশ্বাস করবে এ-কথা! কেউ না!
আমার চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসতে চাইছিল। সেই মুহূর্তেই মরে যেতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু…কিন্তু তখন যদি আমি সুইসাইড করতাম তা হলে তোর মিথ্যেটাই যে চিরস্থায়ী হয়ে যেত। সে আমি হতে দিই কেমন করে!
সেদিনটা কাটল কোনওরকমে। তার পরের দিন। তারও পরের দিন। তুই আমাকে এড়িয়ে এড়িয়ে চলতে লাগলি। কিছুটা আমিও। পরপর কয়েকটা দিন চোখ-কান খোলা রেখে আরও কিছু খবর পেলাম। জানলাম যে, চারপাশে আড়াল তোলা কুৎসিত এই মেয়েটাকে বোল্ড আউট করবি বলে তুই জয়জিতের সঙ্গে বিরিয়ানি বাজি রেখেছিলি। না, এই খবরটা নতুন করে কোনও ব্যথা দেয়নি আমাকে। এমনকী খবরটা সত্যি না মিথ্যে সেটা জানার জন্যেও কোনও আগ্রহ জাগেনি। শুধু ওই রুমালের মিথ্যেটা বুকের ভেতরে নিষ্ঠুর অপমানের ছুরি চালিয়েছিল।
তুই ভালো করেই জানতিস, নিজের ইনফিরিয়ারিটি কমপ্লেক্স আড়াল করার জন্যে আমি সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্সের পাঁচিল তুলে দিয়েছিলাম আমার চারপাশে। আকাঙ্ক্ষায় কাতর এই অরূপ মেয়েটাকে সবাই ভাবত পুরুষবিদ্বেষী, অহঙ্কারী। আজ আর ভালো করে ঠাহর করতে পারি না, আমি তোর প্রেম স্টোর্সে ঢুকে পড়েছিলাম, নাকি তুই আমার পাঁচিলটাকে তোড়ফোড় করে আমার অন্তরে অনুপ্রবেশ করেছিলি। স্রেফ একপ্লেট বিরিয়ানি খাওয়ার জন্যে।
এই মুহূর্তে সব আমার গুলিয়ে গেছে। শুধু ওই নৃশংস মিথ্যেটুকু সত্যি হয়ে আমার কুৎসিত মুখের দিকে তাকিয়ে হা-হা করে হাসছে। কদিন ধরেই শুনছি এই হাসিটা। আর হৃৎপিণ্ডের গা থেকে নখ দিয়ে খুঁটে ক্রমাগত নুনছাল তুলছে কেউ। জ্বালা–অসহ্য জ্বালা!
তাই আর সইতে না পেরে টেলিফোনে কান্নাকাটি করে তোকে একবারের জন্যে ডেকেছিলাম। বলেছিলাম, শেষবারের জন্যে। আর কোনওদিনও তোকে আসতে বলব না। এই একটিবার অন্তত আয়। ফর ওল্ড টাইমস সেক।
তুই এলি। সঙ্গে তোর রূপ, অহংকার আর মেয়েভোলানো আত্মবিশ্বাস।
সবকিছুই ছিল ঠিক সেদিনের মতো।
আকাশে নির্লজ্জ শুক্লচতুর্থীর চাঁদ। চারপাশে বৃষ্টিভেজা বাতাস। আর নির্জন ছাদের রহস্যময় অন্ধকার।
তুই সেদিনের মতো আবার বললি, চাঁদের আলোয় তোকে অনেক বেশি সুন্দর দেখাচ্ছে।
আমি বললাম, জানি।
তারপর তুই আমায় জাপটে ধরলি। এবার কপালে বিরিয়ানি জুটুক-না-জুটুক, পড়ে পাওয়া চোদ্দোআনা হাতছাড়া করার কোনও মানে হয় না। তাই আবার তুই আমার কেস কমপ্লিট করলি। ছাদে চাঁদের আলোয় আমাকে দ্বিতীয়বার বোল্ড আউট করলি তুই।
