বাইরে আমাকে দেখতে যা-ই হোক আসলে ভেতরে-ভেতরে আমি তো একটা মেয়ে। তখন রোজ ভাবতাম, বিউটি ইজ ওনলি স্কিন ডিপ। চামড়া ডিঙোলেই সৌন্দর্য শেষ। তা হলে কেন? কেন এরকম হবে? তোরা–মানে, পুরুষরা–শুধু বাইরেটাই দেখবি? ভেতরের সুন্দরকে দেখবি না! তুই তো তখন জানতিস না ভেতরে-ভেতরে আমি কী আশ্চর্য রূপসি।
আমি মনে-মনে ভাবতাম, বরফে ঢাকা পাহাড়চূড়ায় ভোরের আলো এসে পড়লে যেমন অপরূপ দেখায়, আমি সেইরকম। শীতের পর বসন্ত এলে মরাগাছের ডালে যখন ঝকঝকে সবুজ নতুন পাতা ফোটে–ওদের দিকে অপলকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। আমি ওদের মতন। কৃষ্ণচূড়া আর পলাশ যেমন ডালে-ডালে ফুলের আগুন জ্বালিয়ে রূপসজ্জায় সবাইকে মাতিয়ে দেয়, আমি সেইরকম।
তো এইসব ভাবতাম আর বিছানায় অসহায়ভাবে শুয়ে শব্দ না করে কাঁদতাম। নইলে পাশের ঘরে শুয়ে থাকা বাপি আর মামণি শুনতে পাবে যে!
আমার কল্পনা আমার ছিল। আমার স্বপ্ন আমার। হঠাৎ কী যে হয়ে গেল! একটা কাগজের গোল বল সব তালগোল পাকিয়ে দিল।
মনে আছে নিশ্চয়ই তোর, সেদিন আমরা সবাই মিলে টিএসপি-র ক্লাস করছিলাম। উনি জের্যান্টোলজির মেন্টাল এজিং নিয়ে কীসব বকবক করছিলেন। আমি মন দিয়ে শুনতে পারছিলাম না। কারণ, গতকাল ক্যান্টিনে বন্যা একটা কমেন্ট করেছিল। হয়তো ঠাট্টা করেই কিন্তু সেটা আমাকে খুব বিধেছিল।
আমি তখন গৌরদার ক্যান্টিনে সেকেন্ড দরজা দিয়ে ঢুকছি। তোরা লম্বা বেঞ্চটায় বসে কী নিয়ে যেন হাসাহাসি ঢলাঢলি করছিলি। আমাকে দেখেই বন্যা হাত তুলে চেঁচিয়ে বলল, অ্যাই, আলো জ্বেলে দে–মিস ডার্কনেস এসে গেছে!
তখন ঘোর দুপুর। আলো জ্বালার কোনও প্রশ্নই নেই। সুতরাং, বুঝতেই পারছিস আমি এসেছি বলে কেন আলো জ্বালতে হবে।
তাই ক্লাসে বেশ অন্যমনস্ক ছিলাম। তাকিয়েছিলাম টিএসপি-র দিকে, কিন্তু শুনছিলাম না কিছুই। হঠাৎই কী একটা যেন গায়ে এসে লাগল। মাথা ঘুরিয়ে মেঝের দিকে তাকিয়ে দেখি একটা কাগজের বল। ক্লাসে যেমন ছোঁড়াছুড়ি হয় আর কী! কিন্তু আমার গায়ে কেউ কখনও ছোড়েনি।
অপরাধীর খোঁজে তাকাতেই তোকে দেখলাম। তুই একটু-একটু হাসছিলি। আমি ভাবলাম, ব্যাপারটা তোর কাজ। কিন্তু তুই হঠাৎ আমার গায়ে কেন কাগজের বল ছুড়বি এর উত্তরটা কোনও যুক্তিতেই মাথায় আসছিল না। কিন্তু তুই হাসছিলি। আর আমি তোর দিকে তাকাতেই চোখের ইশারায় বললি, পরে কথা হবে।
চাপতে চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু তা সত্ত্বেও বুকের ভেতরে পাগল করা একটা ঢেউ উঠল। আমাকে ভিজিয়ে দিল, ভাসিয়ে দিল। মনে হল, একটা অলৌকিক স্বপ্ন যেন কোন ম্যাজিকে জ্যান্ত হয়ে হঠাৎ করে ক্লাসরুমে নেমে এসেছে।
পরে তোর সঙ্গে কথা হল। প্রথমে ক্যান্টিনে–তারপর রাস্তায়। ক্যান্টিনে আরও অনেকে। ছিল…কিন্তু রাস্তায় আর-কেউ ছিল না। শুধু তুই, আর আমি। আমাদের পাড়ার কোন একটা দোকানের ঠিকানা খোঁজ করার ছুতোয় তুই আমার হেল্প চেয়েছিলি। এই ছুতোটা হয়তো শুধু আমার জন্যে নয়–বন্যা, তিতি, সুজাতাদের জন্যেও। বেশ মনে আছে, ওরা বেশ অবাক চোখে তোর দিকে তাকিয়েছিল।
রাস্তায় আমাকে একা পেয়ে তুই যে কত কথা বলেছিলি! খইয়ের বস্তার মুখ আচমকা ছিঁড়ে হাট হয়ে গেলে যেভাবে খই ছড়িয়ে পড়ে ঠিক সেভাবে তোর কথাগুলো শব্দের বন্যা হয়ে আমাকে ডুবিয়ে দিয়েছিল।
মনে আছে, অনেক কথার মাঝে তুই আমাকে ফস করে বলেছিলি, তুই সবসময় পাঁচিল দিয়ে নিজেকে আড়াল করে রাখিস কেন? কারও সঙ্গে কথা বলিস নাসরে-সরে থাকিস…।
কী মারাত্মক কথা! তুই কী করে এটা বুঝলি কে জানে! সত্যিই তো, আমি সবসময় নিজেকে আড়াল করে রাখি। ছেলেদের সঙ্গে মিশি না। অথচ মিশতে ইচ্ছে করে। কিন্তু ওরা যদি আমার এই হতচ্ছাড়া চেহারা নিয়ে ব্যঙ্গ করে! ঠাট্টার খোঁচা কখনও দিয়ে ফ্যালে আমায়! অথচ দ্যাখ, বাইরের চেহারার ওপর কারও কি কোনও হাত থাকে? ওটা তো আকাশ থেকে আসে। তাই আমি যে কত যত্ন নিয়ে আমার ভেতরটা সাজিয়েছি–রোজ সাজাই–তার খবর কে রাখে!
তুই আবার বললি, অনেক চেষ্টা করে তারপর তোর ভেতরটা আমি দেখতে পেয়েছি। তোর ভেতরে-ভেতরে এত!
কী সর্বনেশে কথা! আমি আর কোনও কথা বলতে পারিনি।
প্রথমদিনের পর তোর আর আমার দেখা হওয়াটা অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গেল। এতে আশপাশে যে ফিশফাশ হচ্ছে সেটা টের পাইনি এমন বোকা আমি নই। একদিন বন্যা যে চাপা গলায় অনিতাকে বলেছিল, শালা ব্যাপক কম্বিনেশান!–সেটাও আমার কানে এসেছিল। কিন্তু আমি তখন অন্ধ। নিঃশব্দ চরণে যে এসেছে তাকে আমি পাগলের মতো আঁকড়ে ধরেছিলাম। মনে-মনে বলেছিলাম, যে তোমায় ছাড়ে ছাড়ুক, আমি তোমায় ছাড়ব না।
কবিতা লেখার অসুখ ছিল আমার। কিন্তু লুকিয়ে-লুকিয়ে। ভাবতাম কালো কুৎসিত মেয়ের আবার কবিতা! একটা কাল্পনিক লজ্জা, একটা কাল্পনিক অপমানের ভয়, একটা কাল্পনিক সংকোচ আমাকে সেই বালিকা বয়েস থেকেই শামুকের মতো গুটিয়ে দিয়েছিল। একদিন, দু-দিন, তিনদিনে তুই সেই খোলসটাকে চুরমার করে দিলি। লুকোনো কবিতা সামনে এসে গেল। তোর সামনে।
অবিশ্বাস্য হলেও তোর সঙ্গে আমার কী করে যেন কী হয়ে গেল। অনেকটা কেমিক্যাল রিঅ্যাকশনের মতন।
শ্রাবণ গড়িয়ে ভাদ্র এল। আমি তোর নেশায় পাগল। আমার ছিন্নছেঁড়া জীবনটা তখন যেন একটু-একটু করে মানে খুঁজে পাচ্ছে। তুই আসা-যাওয়া করছিস আমাদের বাড়িতে। বাড়ির আবহাওয়াটা বদলাচ্ছে। মামণি আর বাপির চোখেমুখে চাপা স্বস্তির ভাব টের পাচ্ছি। হা-হুঁতাশ আঁধারের মধ্যে ওরা যেন একটু আলো দেখতে পেয়েছে।
