রূপক সম্মোহনের ঘোরেই বলল, সব মিথ্যে, সব মিথ্যে, সব মিথ্যে। আমি আর জোড়া বটতলায় যাব না, কিছুতেই যাব না।
অনুভব করলাম, হঠাৎই ঘরের মধ্যে বাতাসের চাপ বাড়ছে। রূপকও একটু যেন ছটফট করছে। নাকে আসছে হালকা বুনো গন্ধ। আর কাল রাতের মতোই শুরু হয়ে গেছে দু-দুটো ইচ্ছাশক্তির টানাপোড়েন।
আমি সমস্ত মনোযোগ এক করে রূপককে নির্দেশ দিয়ে চললাম। ওর শরীরের ওপর হাত চালাতে লাগলাম বারবার। নিজের কানেই আমার গলার স্বর কেমন হিসহিসে ভয়ংকর শোনাচ্ছে।
একটু পরেই রূপক ভীষণ ঝিমিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ল। ওর কথাগুলো কেমন অস্ফুট শব্দে থেমে-থেমে বেরিয়ে আসছে ঠোঁট চিরে। ঘরের বাতাসের চাপ ধীরে-ধীরে যেন কমে গেল। বুনো গন্ধটা মিলিয়ে গেল। ইচ্ছাশক্তির টানাপোড়েনও আলগা হল। পকেট থেকে রুমাল বের করে কপালে বুলিয়ে নিলাম। এই শীতেও আমি ঘেমে উঠেছি। মনে-মনে খুব আনন্দ হল। হরিশ চক্রবর্তীর সম্মোহনের জাদুকে হারিয়ে দিতে পেরেছে জাদুকর মোহনকুমার।
কিন্তু একটা কথা ভেবে বেশ খটকা লাগল। হরিশ চক্রবর্তী এখন কোথায় জানি না। তবে দূরে থেকেও সে কিন্তু রূপককে সম্মোহন করতে পেরেছে। এই দূরসম্মোহনবিদ্যা আমার জানা নেই। কখনও এ-বিষয়ে শুনিওনি কিছু। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, হরিশ চক্রবর্তী সম্মোহনবিদ্যায় অত্যন্ত দক্ষ। কারণ, দূরত্বের ব্যবধান পেরিয়ে তার সম্মোহন অচেতন করে দিতে পারে কোনও সচেতন মানুষকে। এমনকী আমার মনের ওপরেও চাপ সৃষ্টি করেছিল দূর থেকে। কিন্তু এখন কোথায় সে? কত দূরে আছে?
সেকথাই জিগ্যেস করলাম রূপককে। ও ক্লান্ত স্বরে জবাব দিল, জানি না। অনেক দূরে…।
একটু থেমে আবার বলল, আগে তো এই ঘরেই থাকতেন। রোজ রাতে বেরিয়ে জোড়া বটতলায় যেতেন পুঁথি খুঁজতে। একদিন…এক ঝড়বৃষ্টির রাতে বটতলা থেকে হাতে-পায়ে কাদামাটি মেখে বাড়ি ফেরার সময়ে তার মাথায় বাজ পড়ে। তারপর থেকে উনি কোথায় গেছেন জানি না। অনেক দূরে…জানি না…সে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগের কথা…জানি না…অনেক দূরে…।
শীতের বাতাস ঘুরপাক খেয়ে গেল ঘরের ভেতরে। কমলাদেবী ভয়ে চিৎকার করে উঠলেন। বিনোদ হাঁ করে ছোটভাইকে দেখছিল। আর নিমাইবাবু পাথর।
রূপকের শেষ কথাগুলো ফিশফিশে প্রতিধ্বনি হয়ে ঘরের মধ্যে ভাসছিল। জানলার বাইরে দিনের আলো যেন কমজোরি হয়ে গেল সহসা। একটা শকুনের আর্ত চিৎকার শোনা গেল দূর থেকে।
আমি অনন্তর দিকে ফিরে বললাম, অনন্ত, কাজ শেষ। এবারে তৈরি হয়ে নাও। রূপকের ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েই আমরা কৃষ্ণনগরে রওনা হব।
আমি নিমাইবাবুকে বললাম, এ-বাড়িতে একটা দিনও থাকবেন না। প্রেতের সম্মোহনের সঙ্গে লড়াই করার শক্তি আমার নেই। আজ না হয় কাল আমাকে হারতেই হবে। শেষ পর্যন্ত অলৌকিক সম্মোহন জিতবেই।
ওরা ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে আমি ধীরে-ধীরে রূপকের ঘুম ভাঙালাম। সম্মোহিত অবস্থায় সব কথা যেন ও ভুলে যায় সেরকমই নির্দেশ দিয়েছিলাম। ফলে ঘুম ভেঙে আমাকে দেখেই রূপক বলল, কী মোহনদা, ম্যাজিক হয়ে গেল! কই, দেখাও! আর সেই পয়সার ম্যাজিকটা শিখিয়ে দেবে বলেছিলে–।
আমি ওকে শুয়ে থাকতে বলে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলাম।
টাকা নিতে রাজি না হওয়ায় নিমাইবাবু শেষ পর্যন্ত আমাকে পাজামা-পাঞ্জাবি ও একটা কাশ্মীরী শাল উপহার দিয়েছিলেন। কৃষ্ণনগরের ট্রেনে তুলে দিতে এসে দু-হাত ধরে বারবার কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন।
ওই ঘটনার পর বহুদিন কেটে গেছে, কিন্তু আজও আমি হরিশ চক্রবর্তীর কথা ভুলিনি। ভুলিনি মেসমারের পুঁথির কথা। বিশ্বাস হতে চায় না, আবার অবিশ্বাস করি এমন মনের জোরও আমার নেই।
নষ্ট চাঁদ, কষ্ট চাঁদ
গল্পের নামটা ভালো হল না–তাই না রে? আসলে কবিতা কবিতা করতে চেয়েছিলাম–কেমন যেন গদ্যের আঁশটে গন্ধ ঢুকে পড়ল। যাকগে। আসলে এটা তো আর গল্প নয়–তোকে লেখা শেষ চিঠি। কিন্তু তুই কি আর চিঠিটা পড়বিমানে, পড়তে পারবি?
মনে পড়ে, সেটা ছিল শ্রাবণ মাস। তোর ভালোবাসার দোকানে আমি কী করে যেন ঢুকে পড়েছিলাম। হা–দোকানই তো! যেখানে সবসময় তোর ভালোবাসা চাওয়ার এত ভিড়। সুজাতা, বন্যা, তিতি, অনিতা–আরও কারা কারা যে তোর সঙ্গে ঘুরতে চাইত, থাকতে চাইত কে জানে!
না, আমি চাইনি। কারণটা তো তুই জানিস। আমার গায়ের রং কালো, রূপও কালো। কখনও কেউ ঘুরে তাকাবে না–এমন মেয়ে আমি। তুই যেমন এটা জানিস আমিও তো জানি। জানব না আর! রোজ হতচ্ছাড়া আয়নাটা যে আমাকে জানিয়ে দেয়!
যখন ছোট ছিলাম তখন ভাবতাম, যখন বড় হব–আরও বড় হব–তখন এই আজেবাজে চেহারাটা একটু-একটু বদলে গিয়ে কমবাজে হয়ে যাবে। সেই আগুলি ডাকলিং-এর মতো। তখন কেউ না কেউ নিশ্চয়ই তাকাবে। আমার বাপি, মামণি আর কাকিমা-জেঠিমারা আমার বিয়ে হবে কি-হবে না সেই নিয়ে কী চিন্তাই না করত! অবশ্য আমার সামনে কিছু বলত না। কিন্তু আড়াল থেকে আমি শুনতাম। আর আমার কান্না পেত। ওঃ, একটা মেয়ের জীবনে পুরুষ এত জরুরি। কেন, কেন?
পড়াশোনায় খারাপ ছিলাম না–ভালোই ছিলাম। নইলে তোর সঙ্গে সায়েন্স কলেজে দেখা হল কী করে! তুই লেখাপড়ায় আমার চেয়ে অনেক বেশি ভালো। আর দেখতে? তুই যে কেন সিনেমায় কিংবা টিভি সিরিয়ালে গেলি না কে জানে! সুজাতা, বন্যারা তোকে বারবার সে কথা বলত। অবশ্য তুই আমাকে পরে বলেছিলি ওগুলো তোকে খুশি করার জন্যে।
