পড়া মুখস্থ বলার মতো কথা শেষ করে রূপক থামল। শেষের দিকে ওর কণ্ঠস্বর কিছুটা ক্ষীণ হয়ে এসেছিল।
ও থামতেই নিমাইবাবু আমাকে জিগ্যেস করলেন, মোহনবাবু, ও যা যা বলল, সব সত্যি?
আমি মাথা নেড়ে জানালাম, সব সত্যি।
তখন আত্মগতভাবে নিমাই সরকার বললেন, কৃষ্ণনগরের সাইকিয়াট্রিস্ট ভদ্রলোক বলেছিলেন, সামবুলিজম, হিপনোটিজম, মেসমেরিজম…।
তারপর আমার চোখে চোখ রেখে তিনি প্রশ্ন করলেন, আচ্ছা, মোহনবাবু, সন্নামবুলিজম মানে কী? ওটাও কী হিপনোটিজম?
আমি একটু কেশে বললাম, না। ওর মানে হল, ঘুমিয়ে-চলা। যেমন রোজ রাতে রূপক ঘোরের মধ্যে চলাফেরা করে, জোড়া বটতলায় গিয়ে মাটি খোঁড়ে। আপনার কাছে সব শুনে আমার মনে হয়েছিল রূপক ঘরের মধ্যে আক্রান্ত হতে পারে না। তা হলে কি রাতে ও বাইরে বেরোয়? বেরিয়ে কোনও পশু বা পাখির নখের আঁচড়ে আহত হয়? দেখলাম, আমার সন্দেহই সত্যি হল। সম্মোহনের ঘোরে রূপক রোজ রাতে বেরিয়ে পড়ত বাইরে–ঠিক ঘুমিয়ে-চলা মানুষের মতো।
কমলাদেবী হঠাৎ মুখে আঁচল গুঁজে ফুঁপিয়ে উঠলেন। বিনোদ মা-কে শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগল।
আমি রূপককে আবার প্রশ্ন করলাম, মেসমারের পুঁথিতে কী আছে?
রূপক বলল, তাতে হিপনোটিজম-এর অনেক বিচিত্র পদ্ধতির কথা লেখা আছে। মেসমারের নিজের হাতে লেখা–জার্মান ভাষায়। মেসমারের সময়ে টাইপরাইটার আবিষ্কার হয়নি, তাই হাতে লেখা। পুঁথিটা খুব দামি। এটার কথা পৃথিবীর মানুষ এখনও জানে না।
–পুঁথিটা জোড়া বটতলায় কোথায় আছে তুমি জানো?
না। জানি না বলেই তো রোজ রাতে খুঁজতে যাই। তবে ওখানে কোথাও আছে নিশ্চয়ই।
রূপকের দৃঢ় বিশ্বাসের কারণ বুঝতে পারলাম না। কেউ কি ওর মনে এই বিশ্বাস বদ্ধমূল করে দিয়েছে?
–পুর্থিটা কার?–পরের প্রশ্ন করলাম ওকে লক্ষ্য করে।
আগ্রহে, কৌতূহলে অনন্ত আমার কাছে এগিয়ে এল।
রূপক বলল, ওটা উলফগ্যাং মুলার-এর কাছে ছিল। উনি কোত্থেকে পেয়েছিলেন জানি না। পরে তার কাছ থেকে কিনেছিলেন হরিশ চক্রবর্তী।
–উলফগ্যাং মুলার কে?
সম্মোহন-বিশারদ। জার্মানি থেকে পালিয়ে ভারতে চলে এসেছিলেন। মুলার মেসমারের পুঁথির পাঠোদ্ধার করতে পারেননি। তাই হরিশ চক্রবর্তীকে তিরিশ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেন।
–আর হরিশ চক্রবর্তী।
তিনিও সম্মোহনশাস্ত্রে পণ্ডিত। মেসমারের পুঁথিটা কেনার পর তার পাঠোদ্ধার করার আগেই সেটা তাঁর বাড়ি থেকে চুরি হয়ে যায়।
–কে চুরি করেছিল?
বুড়ো পতিতপাবন। সে হরিশ চক্রবর্তীর বাড়িতে কাজ করত। তাকে অন্য কেউ বোধহয় অনেক টাকার লোভ দেখিয়েছিল। তাই সে কিছু না বুঝেই পুঁথিটা চুরি করে। হরিশ চক্রবর্তী পতিতপাবনকে সন্দেহ করে জেরা করেন। তারপর তাকে সম্মোহন করে অনেক প্রশ্ন করেন। তাতেই জানা যায় পতিতপাবন পুঁথিটা জোড়া বটতলায় লুকিয়ে রেখেছে।
রূপক সামান্য উশখুশ করছিল দেখে আমি আরও কয়েকবার গভীর মনোযোগে ওর শরীরের ওপরে হাত চালালাম। ও আবার শান্ত হল।
আমি জিগ্যেস করলাম, জোড়া বটতলার কোথায় লুকিয়ে রেখেছে সেটা পতিতপাবন বলেনি?
–না। তার আগেই সম্মোহিত অবস্থায় সে হার্ট অ্যাটাকে মারা যায়। তার অনেক বয়েস হয়েছিল।
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে খাটের কাছ থেকে সরে এলাম। একটা চেয়ার টেনে নিয়ে তাতে গা ছেড়ে বসে পড়লাম। নিমাইবাবু, কমলাদেবী ও বিনোদ চুপচাপ দাঁড়িয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো রূপকের কথা শুনছিল। আমাকে চেয়ারে বসে পড়তে দেখে উদগ্রীব স্বরে তিনজনেই একসঙ্গে বলে উঠল, কী হল, মোহনবাবু!
আমি হেসে বললাম, কিছু না। একটু বিশ্রাম নিচ্ছি। রূপকের উত্তর শুনে এটা স্পষ্ট বোঝা যায় কেউ ওকে এসব কথা সবিস্তারে বলেছে, ওকে পাখি-পড়া করে শিখিয়েছে। আর যে শিখিয়েছে, সম্ভবত সেই হিপনোটাইজ করে ওকে দিয়ে পুঁথিটা খোঁজাচ্ছে। রহস্যটা এবারে নিশ্চয়ই পরিষ্কার হয়ে গেছে আপনাদের কাছে?
–কিন্তু কে ওকে হিপনোটাইজ করে বারবার রাতের অন্ধকারে মেসমারসাহেবের পুঁথি খুঁজতে পাঠাচ্ছে?–বিনোদ জোরালো গলায় জানতে চাইল। যেন নামটা জানতে পারলেই সে লোকটাকে একহাত দেখে নেবে।
আমি বললাম, সেটা রূপককেই জিগ্যেস করে দেখি।
তারপর চেয়ারে বসেই রূপককে উদ্দেশ করে উঁচু গলায় প্রশ্ন করলাম, তোমাকে কে পুঁথি খুঁজতে পাঠায়?
ও স্পষ্ট গলায় বলল, হরিশ চক্রবর্তী।
আমি ঘরে উপস্থিত সবাইকে জিগ্যেস করলাম এই নামে কাউকে তারা চেনেন কি না। তাতে নিমাইবাবু, কমলাদেবী, বিনোদ সকলেই মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আমি নিমাইবাবুকে বললাম, নিমাইবাবু, রাতের ওই ঘটনা যাতে আর না ঘটে সেজন্য আমি রূপককে সম্মোহিত অবস্থায় কতকগুলো আদেশ দিয়ে যাচ্ছি। তাতে কতটুকু বা কতদিন কাজ হবে বলতে পারছি না। বরং সবচেয়ে ভালো হয়, যদি আপনি এ-অঞ্চল ছেড়ে চলে যেতে পারেন। কারণ, দু-দুটো সম্মোহনের শক্তির লড়াইয়ে রূপকের মনের কোনও ক্ষতি হতে পারে। ওর পড়াশোনাও নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
কমলাদেবী ডুকরে কেঁদে উঠে স্বামীকে বললেন, তুমি কালই এ-পাড়া ছেড়ে চলো।
বিনোদ কিছুক্ষণ গম্ভীর থেকে বলল, সেই ভালো, বাবা।
আমি তখন চেয়ার ছেড়ে খাটের কাছে উঠে এলাম। রূপককে বারবার করে নির্দেশ দিলাম, জোড়া বটতলায় আর কখনও যেন সে না যায়। ওকে বোঝালাম, হরিশ চক্রবর্তীর সমস্ত কাহিনি মিথ্যে, পুঁথির কথা মিথ্যে, পতিতপাবনের কাহিনি মিথ্যে, সব মিথ্যে।
