নিমাইবাবুর বাড়িতে যখন পৌঁছোলাম তখন শরীর ভীষণ ক্লান্ত। একইসঙ্গে ঠান্ডা লেগে গলা ভারী হয়ে উঠেছে।
রূপকের ঘোর তখনও বোধহয় পুরোপুরি কাটেনি। কারণ, ও জুতো খুলে প্রথমেই গেল কলতলার দিকে। মাটি-মাখা হাত-পা ধুয়ে নিল। তারপর হাত-পা মুছে সটান ওর ঘরে গিয়ে ঢুকল। জামাকাপড় ছেড়ে লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল বিছানায়। আমি ঘরের আলো জ্বেলে ওর কিশোর মুখটির দিকে দেখলাম। সরল নিষ্পাপ ঘুমন্ত মুখে বিশ্রী নখের আঁচড়। কয়েক জায়গায় রক্তও ফুটে বেরুচ্ছে। জানি, ওর হাতেও একইরকম চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যাবে।
ফিরে এসে বাড়িটাকে আগের মতোই নিঝুম অবস্থায় পেয়েছি। কারও ঘুম ভাঙেনি, এমনকী অনন্তও রূপকের খাটে একপাশে ঘুমোচ্ছে। দরজা বন্ধ করে ওকে নীচু গলায় ডাকলাম। কিন্তু ওর ঘুম ভাঙল না। তখন আলতো করে বারকয়েক ধাক্কা দিলাম। এবারে অনন্ত ধড়মড়িয়ে চোখ কচলে উঠে বসল। আমার দিকে তাকিয়েই ও বলে উঠল, এ কী, মোহনদা, আপনার শাল কোথায়! আর পোশাকেরই বা এই হাল কেন?
অকুস্থল থেকে শালটা ফেরত আনা হয়নি। তা ছাড়া পাখিগুলোর আঁচড়ে পাঞ্জাবি ছিঁড়ে গেছে। সারা পোশাকে ময়লা মাটির দাগ। হাতের দু-এক জায়গায় ছড়ে গিয়ে জ্বালা করছে। তবে রক্ত বেরোয়নি।
অনন্তকে বললাম রূপকের মুখটা দেখতে। দেখে ও অবাক হয়ে বলল, সে কী, আজ রাতেও ঠেকানো গেল না!
আমি বললাম, না। তবে রহস্যটা কিছুটা ভেদ করেছি। বাকিটা সমাধান করব কাল সকালে। এখন ভীষণ টায়ার্ড লাগছে। তুমি একটু সরে শোও দেখি। এই খাটেই তিনজনে ভাগাভাগি করে ঘুমিয়ে পড়ি।
জামাকাপড় ছেড়ে আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লাম। খুব শীত করছিল। খাটের পায়ের কাছে বাড়তি কম্বল ছিল। সেটা টেনে নিয়ে গায়ে মুড়ি দিলাম।
যতদূর মনে পড়ে, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আমি ঘুমিয়ে পড়েছি।
.
গভীর সম্মোহনে রূপককে ঘুম পাড়িয়ে ঘরের দরজা খুলে দিলাম। বাইরে অনন্ত অপেক্ষা করছিল। ওকে বললাম, বাড়ির সবাইকে আসতে বলল। রহস্যের বাকি সমাধানটুকু সকলের সামনেই হোক।
অনন্ত চটপট চলে গেল সবাইকে ডেকে আনতে। আমি জানি কী ভীষণ উৎকণ্ঠা নিয়ে নিমাইবাবু, কমলাদেবী আর বিনোদ অপেক্ষা করছে। খুব ভোরে নিমাইবাবু আমাদের ঘরের দরজায় ধাক্কা দিয়ে ঘুম ভাঙিয়েছেন। তারপর রূপকের অবস্থা দেখে হতাশায় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছেন, ছেলেটাকে তা হলে আর বাঁচাতে পারলাম না, মোহনবাবু!
আমি তাঁকে ভরসা দিয়ে বলেছি, আমি কিন্তু এখনও আশা ছাড়িনি। রূপক ঘুম থেকে উঠুক। কিছু খেয়েদেয়ে নিক। তারপর ওকে আমি কিছুক্ষণের জন্যে হিপনোটাইজ করব। আমার ধারণা, সম্মোহিত অবস্থায় প্রশ্ন করলেই রূপকের কাছ থেকে সব রহস্যের উত্তর আমরা পেয়ে যাব। আপনাকে শুধু এটুকু জানিয়ে রাখি, ওর গায়ে-মুখে যে-আঁচড়ের দাগ গত পনেরো দিন ধরে দেখেছেন সেগুলো শকুনের নখের আঁচড়।
–শকুনের নখ!
–হ্যাঁ।–গত রাতের সব ঘটনা তখন তাকে খুলে বলেছি।
তারপর প্রাতরাশের পালা শেষ করে আমি রূপককে নিয়ে তৈরি হয়েছি। অনন্তকে বলেছি ঘরের বাইরে অপেক্ষা করতে। গভীর সম্মোহনের সময়ে তৃতীয় কেউ সামনে থাকলে আমার অসুবিধে হয়।
রূপককে গভীর সম্মোহনে ডুবিয়ে দিতে বিশেষ বেগ পেতে হল না। এমনিতেই ওর ঘুমের ঘোরে কথা বলার অভ্যাস, তা ছাড়া কিছুটা ভুললামনও বটে। এই ধরনের মানুষদের সচেতন জগৎ থেকে অবচেতন জগতে ঠেলে দেওয়া বেশ সহজ। এরাই সম্মোহনের আদর্শ পাত্র।
একটু পরেই সবাইকে সঙ্গে করে অনন্ত এসে ঘরে ঢুকল।
রূপক চোখ বুজে টান টান হয়ে বিছানায় শুয়ে। নিমাইবাবু, তার স্ত্রী ও বিনোদ রূপকের মাথার দিকে গিয়ে দাঁড়াল। অনন্ত রইল আমার পাশে।
আমি নিমাইবাবুকে লক্ষ করে বললাম, সম্মোহনের ঘোরে রূপক এখন ঘুমিয়ে। কিন্তু আমি ওকে যেসব প্রশ্ন করব ও ঘুমন্ত অবস্থাতেই তার ঠিক-ঠিক উত্তর দিয়ে যাবে। আপনার যা জিগ্যেস করার আমাকে জিগ্যেস করবেন। কারণ আমি ছাড়া আর কারও কথাই রূপক এখন শুনতে পাবে না।
সকলে নীরবে ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল। তখন রূপকের শরীরে ঝুঁকে পড়ে আমি আরও বারকয়েক সম্মোহনের ভঙ্গিতে ওর দেহের ওপরে হাত চালালাম। তারপর শুরু হল প্রশ্ন-উত্তরের পালা।
–রূপক, আমার কথা শুনতে পাচ্ছ?
ক্লান্ত স্বরে ঘুমন্ত রূপক উত্তর দিল, হ্যাঁ, শুনতে পাচ্ছি।
–আমি যা জিগ্যেস করব তুমি তার ঠিক-ঠিক জবাব দেবে। আমি ছাড়া আর কারও আদেশ তুমি এখন মানবে না।
না, মানব না।
–তা হলে বলো, পোড়া জমিদারবাড়ির পাশের জোড়া বটতলায় তুমি রোজ কী করতে যাও?
সকালে বিনোদের কাছেই জেনেছি পাঁচিল-ঘেরা পুরোনো বাড়িটা এককালে জমিদারবাড়ি ছিল।
রূপক বলল, মেসমারের পুঁথি খুঁজতে।
মেসমারের পুঁথি! আমি অবাক হয়ে গেলাম। মেসমার সম্পর্কে এই বালক কতটুকু জানে? ঘরের আর সবাই আমার স্তম্ভিত মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। আমি স্পষ্ট স্বরে ঘুমন্ত রূপককে প্রশ্ন করলাম, তুমি ঠিক বলছ, মেসমারের পুঁথি? তুমি জানো মেসমার কে?
সঙ্গে-সঙ্গেই উত্তর পাওয়া গেল, হা, জানি। অস্ট্রিয়ান ডাক্তার ফ্রানৎস্ আন্তন মেসমার। ১৭৩৪ সালে জার্মানিতে জন্ম, মারা গেছেন ১৮১৫ সালে জার্মানিতেই। রুগিদের দেহের ওপরে চুম্বক চালিয়ে রোগ সারাতেন। পরে চুম্বক ছেড়ে শুধু হাত চালিয়েই রোগ সারাতে শুরু করেন। তিনি এটাকে বলতেন অ্যানিম্যাল ম্যাগনেটিজম। কিন্তু কয়েকজন রুগির রোগ সারাতে গোলমাল হওয়ায় পুলিশের নজরে পড়েন। তখন দেশছাড়া হয়ে চলে যান প্যারিসে। পরে একই কারণে তাকে প্যারিস ছাড়তে হয়। সকলে মেসমারকে প্রতারক, ভণ্ড বলে অভিযুক্ত করে। তার রোগ সারানোর পদ্ধতি নাকি পুরোপুরি ফঁকিবাজি ছিল। কিন্তু মেসমার যে ভণ্ড ছিলেন না তার দু-দুটো উজ্জ্বল প্রমাণ রয়েছে। প্রথমত, স্কটল্যান্ডের সার্জন জেমস ব্রেইড উনিশ শতকের মাঝামাঝি মেসমারের পদ্ধতিকে উন্নত করে তার নাম দেন হিপনোটিজম গ্রিক শব্দ হিপনোসিস থেকে হিপনোটিজম শব্দটা তিনি তৈরি করেছিলেন। হিপনোসিস-এর অর্থ হল ঘুম। যেমন আমি এখন ঘুমিয়ে রয়েছি। হা, যা বলছিলাম। ফ্রানৎস্ মেসমাসের নাম থেকেই মেসমেরিজম শব্দটা এসেছে যার অর্থ হিপনোটিজম।
